Header Ads

Header ADS

রসাতলে গেলাম

 

রসাতলে



পাঁচজনে মিলিয়া পৃথিবীর মানচিত্রের উপর ঝুকিয়া পড়িল। গভীর মনোযোগ সবার। কারও মাথা উঠিতেছিল না। রাজু হঠাৎ বলিল, কলম্বিয়ার পাশে দেখ। নীরব বলিল কেন, কলম্বিয়ার পাশে কেন রে? রাজুর উত্তর, 'ল' আছেতো দু'টোতেই। জাবেদ ভেংচি কাটিল, 'ল' তো বাংলাদেশের বানানেও আছে। সাথে সাথে মোর্শেদ যোগ করিল, ফিলিপাইন, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া......

 

 
চুপ, চুপ, চুপ খুঁজতে থাক; বলেই ভুল করেছি। রাজু আবার মানচিত্রে মনোযোগ দিল।

 
পাঁচ জনে মিলিয়া যে জায়গাটিকে পৃথিবীর মানচিত্রে খুঁজতেছিল তাহার নাম। 'রসাতল'। ইহার উপর তাহাদের আগ্রহ পূর্বে তেমন ছিলনা। কিন্তু ইদানিং বেশ গাঢ় হইয়াছে। বিগত কয়েকদিন ধরিয়া পাড়ার মুদী দোকানদার হইতে শুরু করিয়া স্কুলের শিক্ষক পর্যন্ত সবাই উহাদের সম্পর্কে একই কথা বলিতেছেন। তাহারা নাকি রসাতলে যাইতেছে গতকাল মোর্শেদের বাবা স্কুলে গিয়াছিলেন। মাস্টার মশাইও তাকে একই কথা বলিলেন। আজ সবাই মিলিয়া এই টার্গেট নেয়া হইয়াছে রসাতলটা কোথায় খুঁজিয়া বাহির করিতেই হইবে।
দুই ঘণ্টা খুঁজিয়াও রসাতল পাওয়া গেল না। রানা বলিল, বাদ দে, অযথাই লোকজন রসাতলে যাচ্ছি বলছে।

 

 যে জায়গায় যাচ্ছি সে জায়গা বুঝি আমরা চিনবো না?
ইহা ঠিক। সকলেই সম্মতি দিল। জাবেদ একটু বলার চেষ্টা করিল, তবে জায়গাটা মনে হয় খারাপ না। নীরব একটা হাই তুলিল, যাকগে, এসব বাদ দে। পিকনিকের কথা বল।
প্রতিবছর পাঁচ জনে পিকনিক হয়। এবার এখনও জায়গা ঠিক হয় নাই। এরই মধ্যে নতুন উপদ্রব হাজির- .....'রসাতল'।

 
পিকনিকের আয়োজন অনেক আগেই শুরু হইয়ছিল। ইহা তাহাদের নিকট অতীব আনন্দের বিষয়। দুই মাস আগে যখন রানা একখানা বিশাল আকার মুরগী কিনিয়া নিয়া যাইতেছিল তাহা দেখিয়া সবাই প্রায় সমস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, মুরগী নিয়া কি করবি? রানা বলিল, পিকনিকে ডিমের কারি হবে না....?
- হবে, তাই বলে মুরগী কেন............?
আরে, নিজেদের পিকনিক।

 মুরগী প্রতি ৪ দিনে একটা করে ডিম দিলে এখনও পিকনিকের ২ মাস বাকী। ততোদিনে মুরগী অনেকগুলো ডিম পাড়বে। পিকনিকের দিন সবার জন্য ডিমের কারির সমস্যা হবে না। আর মুরগীর তখন কোনো দরকার হবে না, সেটা কেটে ফেলে ঝাল ফ্রাই করা যাবে। এক মুরগীতে দুই লাভ। ডিমের কারি আর ঝাল ফ্রাই টু ইন ওয়ান।মুরগী কিভাবে ডিম দেয়, প্রতি ৪ দিনে একটা ডিম দেয় কিনা ইহা কেহই ভাল জানে না। তবে ইহাতে লাভ যে আছে তাহা সকলেই বুঝিতে পারিল।

প্রতি ৪ দিনের ডিম যখন ৪ সপ্তাহে মুরগীটা পাড়িল না, তখন রানার মুখ একটু বিষন্ন দেখাইলো। টু ইন ওয়া তখন ওয়ান ইন ওয়ানে পরিণত হইল। পিকনিকের তখন একমাস বাকী। 

মিটিংবসিল পিকনিক কিভাবে করা হইবে তাহা লইয়া। এরই মধ্যে রানীক্ষেত রোগে রানার মুরগী মারা পড়িল। টু ইন ওয়ান, ওয়ান ইন ওয়ান হইয়া এখন জিরো ইন ওয়ান হইল। বৈঠকের দিন রানা সবার দ্বারা তিরস্কৃত হইল। কিছু দায়িত্ব ভাগ করা হইল। ডিমের কারি বাদ পড়িল। তবে ঝাল ফ্রাই করা হইবে। দায়িত্বে মোর্শেদ। ডালের দায়িত্ব দেওয়া হইল রানাকে। যেহেতু ডাল গাছ কেহ দেখে নাই। ইহা রোপন করিয়া ফল পাইয়া তারপর উহা পিকনিকে ব্যবহারের চিন্তাও সে করিবে না। সুতরাং তাহার কাছে ডাল। দেওয়া নিরাপদ। ভাত রাধিবার দায়িত্ব নীরবের। কারণ ইহা নীরবে ফুটাইলেই হয়। রাজু নিল পরিবহনের দায়িত্ব। রাজুর বাবার একখানা পুরনো পিকআপ আছে কিনা। ঠিক হইল ইহাই ম্যানেজ করিতে হইবে।

বৈঠক প্রায় শেষ হইবার পথে। জাবেদের উপর কাহারও ভরসা নাই। তাই কোনো দায়িত্ব তাহাকে দেওয়া হয় নাই। জাবেদ তখন প্রশ্ন করিল, রসগোল্লা খাওয়া হইবে না? 

 
কথাটা সবারই মনঃপুত হইল। রসগোল্লা হইলে খারাপ হয় না। মোহন ঘোষের রসগোল্লা এই এলাকায় বিখ্যাত। ঠিক হইল জাবেদ ইহা করিবে। জোগাড়
পিকনিকের দিন দেখিতে দেখিতে চলিয়া আসিল। পিকআপ ড্রাইভার রাজুকে একটু বলার চেষ্টা করিল, বাবু পিকআপের ব্রেকের অবস্থা একটু খারাপ । জাফলংয়ের রাস্তায় যে ঢাল তাহাতে কিছু হয়ে গেলে.....
রাজু কথা শেষ হইতে দিল না। বলিল, আরে রাখ তোমার ব্রেক। ব্রেক খুলে রেখে এসো। ব্রেক ছাড়া গাড়িতে পিকনিকে এ্যাডভেঞ্চার। যাব। এটাই তো
ড্রাইভার আর কথা বেশি বাড়াইল না। ওহ তোমদের বলা হয় নাই রসাতলের অস্তিত্ব কোথাও না পাইয়া জাফলং-এ পিকনিকের সিদ্ধান্ত হইয়াছিল। ঠিক হয় 'রসাতল' ভবিষ্যতে খুঁজিয়া পাওয়া গেলে পরের শীতে সেখানে যাওয়া হইবে।
পিকনিকের দিন সবকিছু পিকআপে চাপানো হইল। চুলা, ডেকচি, প্লেট, গ্লাস,কাঁচা মাংস, চাল, ডাল সব। রান্না খাবার
১ বলিতে একটাই। জাবেদের আনা রসগোল্লা । সে রসগোল্লা যতো না আনিয়াছে রস আনিয়াছে তাহা হইতে ঢের বেশি। জিজ্ঞাসা করিলে বলিল, দেখলাম রসগোল্লার ঢের দাম। তাই পাঁচজনের জন্য গুনে গুনে ১০ খানা রসগোল্লা নিয়ে আরো দশ টাকার রস কিনলাম।
জাবেদের এই বুদ্ধি দেখিয়া রানা তাহার মাথায় একখানা গাট্টা বসাইয়া দিল। বলিল, ইস! ১০টা টাকা জলে ফেললি । রস তো এমনিই দেয়। কিনতে গেলি কেন? জাবেদও খেপিয়া উঠিল, ডিমওতো মুরগী এমনি দেয়। তোমার মুরগী দিলনা কেন?

 
ঝগড়া পাকিয়া ওঠার আগেই রাজু থামাইল । এসব এখন রাখ, গাড়িতে ওঠ সবাই গাড়িতে উঠিল। জাফলং এর রাস্তার মনোরম দৃশ্যাবলী অবলোকন করিয়া যাইতেছিল সবাই। রাজু বসিল বিশাল হাড়ির উপর। চুলার উপর রানা । চালের ড্রামের উপর বসিল নীরব আর মোর্শেদ। জাবেদ উঁচু কিছু না পাইয়া বটি দা'র উপরই বসিয়া যাইতেছিল, তখন নীরব আর নীরব না থাকিয়া, হই হই করিয়া উঠায় সে একখানা মোটামুটি সাইজের মিষ্টি কুমড়ার উপর বসিল ।

 

 
একটু পরই মোর্শেদ বলিল, ক্ষুধা লেগেছে। জাফলং যেতে তো আরও ঘণ্টা খানেক লাগবে। সকলেই একথায় সায় দিল। কিন্তু একমাত্র রসগোল্লা ছাড়া আর সবই কাঁচা। রানা সাহস করিয়া বলিয়াই ফেলিল, রসগোল্লাতো দু'টো করে আছে। একটা এখন খেয়ে ফেললে কি হয়। সবারই মৌন সমর্থন ছিল। জাবেদ একটু বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করিল। কেহই পাত্তা দিলনা। ১০টা রসগোল্লা আর এক হাড়ি রস: সবাই হাতে নিয়া খাওয়া শুরু করিয়াছে। একটু গুন গুন করিয়া গানও হইতেছে। এমন সময় ড্রাইভার মাথা বাহির করিয়া রাজুকে বলিল, বাবু ব্রেক মনে হয় ফেল করেছে। গাড়ি থামছে না। রাজু রসগোল্লার হাড়ি হাতে হা করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, মোর্শেদ ভয়ে বুকে থু থু দিয়া ভরাইয়া দিল, রানা কি করিবে বুঝিতে না পারিয়া বড় হাড়ির মধ্যে মুখ লুকাইল, আর জাবেদ হঠাৎ ভ্যা করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। সবার আর্তচিৎকার............., জাবেদের কান্না একখানি ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করিল । রাজুর হাতে তখনও রসের হাড়ি ধরা। গাড়ি টলিয়া টলিয়া খালের পথে যাত্রা করিল এবং এক সময় সমগ্র আর্তচিৎকার সমেত গাড়ির ইঞ্জিনও থামিয়া গেল।

 
প্রথমে ভীরু জাবেদেরই জ্ঞান ফিরিয়া আসিল। একে একে রানা, মোর্শেদ, নীরব ও গাড়ির ড্রাইভার একত্রে জড়ো হইল । কাহারও তেমন বড় কিছু হয় নাই। কিন্তু রাজু কোথায়? ড্রাইভার চিৎকার করিয়া উঠিল, বাবু কোথায় আপনি?

 
হঠাৎ করিয়া একটা ক্ষীণ আওয়াজ শোনা যাইল খালের এক কোণে রসের আকড়ের মধ্যে মিষ্টি ভাসিতেছে। তাহার নীচ হইতে মাথা বাহির করিয়া রাজু ৰলিল এই যে আমি রসাতলে'। সকলে সেই দিকে রওয়ানা করিল। জাবেদ নীরবের হাত ধরিয়া বলিল, কোথায় যাস? নীরব মুচকি হাসিয়া বলিল, রসাতলে................রে.............., রসাতলে....................... যাচ্ছি।



কোন মন্তব্য নেই

  [ছেলোদের পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের ২য় তলায়, তারিখ- ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং মেয়েদের পরীক্ষা মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ এর প...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.