ইসলামে তালাকের বিধান : সচেতনতা প্রয়োজন৷Provisions of Talaq in Islam: Awareness is needed
ইসলামে তালাকের বিধান : সচেতনতা প্রয়োজন
আমরা মুসলমান। সবাই চাই ইসলামের বিধান অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালিত করতে। ইসলামের একটি বিধান হল 'তালাক'। দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিধান। যার সাথে কম-বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু আমাদের মধ্যে এর অপব্যবহারই বেশি। এসম্পর্কে সঠিক ধারনা ও জানা-শোনা না থাকাই এর মূল কারণ।
দাম্পত্য জীবনে কখনো কোনো ক্ষেত্রে যে কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান, তর্ক-বিতর্ক ও মনোমালিন্য হতেই পারে। বরং হওয়াটাই স্বাভাবিক। এক পর্যায়ে যদি ঝগড়ার রূপ ধারণ করে, তাতেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। (যদিও ঝগড়া খুবই নিন্দনীয় কাজ এবং তা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক) কিন্তু তখনই আশ্চর্য হতে হয় যখন এর সমাধান করতে দেখা যায়। তালাকের মাধ্যমে। অথচ তালাক এর সমাধান নয়। তালাক হল বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মাধ্যম। যা এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ফায়সালা। যেমন কারো শরীরের কোন অঙ্গে জটিল রোগ এসে বাসা বাঁধলো। তখন সে তার অঙ্গ রক্ষার জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা করে সর্বাত্বক চেষ্টা চালায়। অবশেষে সব চেষ্টাই যখন ব্যর্থ হয় এবং সকল চিকিৎসা অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তখন সে অপারেশন করে তার অঙ্গ কেটে ফেলতে বাধ্য হয়। তালাকের বিষয়টিও তেমন। এর পূর্বে রয়েছে করণীয় ও পালনীয় অনেক বিধান। সেগুলো না করে যখন আমরা অপারেশনের মতো চূড়ান্ত সমাধানে হাত দিই, কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরাসরি তিন তালাক প্রদান করি, তখন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। আফসোস ও আক্ষেপের কোন সীমা-পরিসীমা থাকে না।
তালাকের পরিচয়
তালাক আরবী শব্দ। যার অর্থ হল, বন্ধন ছিন্ন করা। শরীয়তের পরিভাষায়: তালাক বলে, বিশেষ শব্দাবলী ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক অথবা পরিণামে
বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।
ইসলাম চায় বৈবাহিক সম্পর্কের সদা অটুট থাকে। কখনো কখনো চারদিক চিড় না ধরে। তাই স্বাভাবিক ইসলাম তালাক থেকে শুধু নিরুৎসাহিতই করেনি, নিজেকে নিকৃষ্টম বলেছে বলে মন্তব্য করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওর (রা.) থেকে এক নম্বরে সামনে উপস্থিত নেতা সাল্লাহু হল ওয়াসাল্লাম লেখক, 'আল্লাহর কাজ খুব নিকৃষ্ট তালাক।'
ইসলাম চায় বৈবাহিক সম্পর্ক যেন সদা অটুট থাকে। কখনো যেন তাতে চিড় না ধরে। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় ইসলাম তালাক থেকে শুধু নিরুৎসাহিতই করেনি, বরং নিকৃষ্টতম বৈধ বলে আখ্যায়িত করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট বৈধ কাজ হল তালাক।' (আবু দাউদ শরীফ : হাদীস- ২১৭৮)
ইসলামে তালাকের বিধান রাখা হয়েছে মানুষের প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে। তদুপরি এটা স্বাভাবিক অবস্থার বিধান নয়। বরং কারো ক্ষেত্রে যদি এমন অবস্থা হয় যে, তাদের আর একত্রে অবস্থান কোনভাবেই সম্ভব না, একত্রে থাকার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয় এবং তাদের আলাদা হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা না থাকে, তাহলে এমন সঙ্কট থেকে উত্তরণের পদ্ধতি ইসলাম বলে দিয়েছে। যার নাম 'তালাক'। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পরস্পরে আলাদা হয়ে যাবে এবং তাদের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক অবশিষ্ট থাকবে না।
অন্যান্য ধর্মে তালাক
ইহুদী ধর্মে তালাক দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র পুরুষের জন্যই সংরক্ষিত ছিলো। সে যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারত। মহিলাদের পক্ষে তালাক দেওয়ার অধিকার তাদের ধর্মে ছিলো না বললেই চলে। পরবর্তীতে তারা তার সংশোধন আনতে বাধ্য হয় এবং তালাকের ওপর বিভিন্ন শর্ত আরোপের কারণে তালাকের পথ ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে আসে।
খৃষ্টধর্মে প্রাথমিকভাবে তালাকের কোন সুযোগ ছিল না। না স্বামীর জন্য আর না স্ত্রীর জন্য। এক কথায় তালাক দেওয়া তাদের ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। পরবর্তীতে তাদের জন্য এই বিধান কঠিন মনে হওয়ায় তারা তা সংশোধন করে। আদালতের দারস্থ হয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য তালাক গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে ক্রমান্বয়ে তালাক তাদের মধ্যে এতো
বড় হয় যে, তা খেল-তামাশার দেশে পরিণত হয়। নারী ধর্মেও স্ত্রীকে পরিবর্ধিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু এই মাননা কঠোর পরবর্তী স্বামীর জন্য ধর্মগুরু থেকে তালাক গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তাদের এই সংশোধিত বিনির্মাণে উন্নয়নের উচ্চতা আজ পর্যন্ত তাদের প্রথম বিবর্তন আঁকড়ে ধরে আছে।
ব্যাপক হয় যে, তা খেল-তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়। হিন্দু ধর্মেও স্ত্রীকে পরিত্যাগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু এই বিধান মানা কঠিন হওয়ায় পরবর্তীতে স্বামীর জন্য ধর্মগুরু থেকে তালাক গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তাদের নিম্নশ্রেণীরা এই সংশোধিত বিধান গ্রহণ করলেও তাদের উচ্চ শ্রেণী আজও পর্যন্ত সেই প্রথম বিধান আঁকড়ে ধরে আছে। ( বিস্তারিত দেখুন, তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম ১/১৩০ থেকে ১৩২ পর্যন্ত)
ইসলামে তালাকের বিধান
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে ইসলামের অনুপম আদর্শ, ঠিক তেমনি তালাকের ক্ষেত্রেও আছে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ বিধান। ইসলাম যেমনিভাবে স্ত্রীকে ত্যাগ করার প্রয়োজনকে গলা টিপে হত্যা করেনি, ঠিক তেমনিভাবে তালাকের ব্যাপক অনুমতি দিয়েও একে তামাশার বস্তুতে পরিণত করেনি। বরং এর পূর্বে রেখে দিয়েছে পালনীয় অনেক বিধান। আর তালাককে সাব্যস্ত করেছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট বৈধ কাজ হিসাবে। যেন একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ এর চিন্তাও মাথায় না আনে। আবার নারী যেন পুরুষের হাতে নির্যাতিত, নিগৃহিত না হয়, সেজন্য তালাককে শুধু পুরুষের জন্য বিশেষায়িত করেনি; বরং নারীকেও দিয়েছে এই অধিকার। তাই ইসলামে 'তাফবীযে তালাক' ও 'খোলা'র মতো বিধান রাখা হয়েছে। যেন নারীও প্রয়োজনে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে বিশেষ প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে ইসলামে তালাকের অনুমতি থাকলেও এ থেকে বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে । একদিকে যেমন নারীকে আদেশ দিয়েছে স্বামীর পূর্ণ আনুগত্য ও সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা করার জন্য, অপর দিকে পুরুষকে নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীর ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য। যেন কাউকে তালাকের মতো কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, 'আর নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা
কোন জিনিসকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ নিহিত
রেখেছেন।' (সূরা নিসা : ১৯) অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, 'তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাক।' (সূরা বাকারাহ : ১৮৭) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'কোন মুমিন পুরুষ যেন কোন মুমিন নারীর ওপর রাগান্বিত না হয়। কেননা, তার কোন আচরণে সে অসন্তুষ্ট হলেও অন্য আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।' (মুসলিম শরীফ : হাদীস- ১৪৬৯)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে। সে কখনোই তোমার জন্য সোজা হবে না। যদি তুমি তার দ্বারা উপকৃত হতে চাও, তাহলে তার বক্রতাসহ উপকৃত হবে। আর যদি তাকে সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে। আর ভেঙ্গে ফেলা হল তালাক দেওয়া।' (মুসলিম শরীফ : হাদীস- ১৪৬৮)
বিশিষ্ট সাহাবী জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত এক সুদীর্ঘ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, (তোমরা মহিলাদের বিষয়ে তাদের হক আদায় ও তাদের সাথে সদাচরণের ব্যাপারে) আল্লাহকে ভয় কর। কেননা, তোমরা তাদেরকে গ্রহণ করেছ আল্লাহর নিরাপত্তার মাধ্যমে এবং তাদের লজ্জাস্থান হালাল করেছ আল্লাহর আদেশে। তাদের ওপর তোমাদের হক হল, তারা তোমাদের বিছানায় (ঘরে) এমন কাউকে আসতে দিবে না যাকে (যার আসাকে) তোমরা অপছন্দ কর। কিন্তু যদি তারা তা করে (অর্থাৎ এমন কাউকে আসতে দেয়) তবে তাদেরকে হালকা প্রহার কর। আর তোমাদের ওপর তাদের হক হল, নিয়মানুযায়ী তাদের খোরপোশের ব্যবস্থা করা । (মুসলিম শরীফ : হাদীস- ১২১৮ )
তালাকের পূর্বে করণীয় স্বামী-স্ত্রী একত্রে সংসার করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে স্বামীর দায়িত্ব হল,
তীর ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং তার গুণাবলীর দিকে তাকিয়ে তার ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করা। এভাবে থাকার পরও যদি উভয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক না হয়, তাহলে এ পর্যায়ে শরীয়তের বিধান হল, স্বামী স্ত্রীকে বুঝাবে। উপদেশমূলক কথাবার্তা বলবে এবং নিজের সাধ্যানুযায়ী তাকে নম্রভাবে, সুন্দর ভাষায় বুঝিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে। এতেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্ত্রীকে সতর্কবার্তা পৌঁছানোর জন্য নিজের বিছানা থেকে স্ত্রীর বিছানা আলাদা করে দিবে। যাতে স্ত্রী নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং তারা যেন আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। এই পদ্ধতিতেও যদি কোন সুরাহা না হয় এবং স্ত্রী স্বামীর কোন কথায় কান না দিয়ে স্বামীর অবাধ্য থেকে যায়, তাহলে স্বামী একান্ত বাধ্য হলে স্ত্রীকে চেহারা ব্যতীত অন্যস্থানে সামন্য প্রহার করতে পারবে। তবে প্রহারের মাত্রা সামান্যই হতে হবে। যে প্রহারে স্ত্রীর গায়ে কোন চিহ্ন, দাগ বা ক্ষতের সৃষ্টি হবে না। এই হালকা প্রহারে যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তাহলে ভালো। ঘরের বিবাদ ঘরেই মিটে গেলো। তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলো না। কিন্তু এতেও যদি কাজ না হয় এবং পরস্পর বিবাদের আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে, তাহলে স্বামীর পক্ষের মিমাংসার যোগ্যতাসম্পন্ন একজন ও স্ত্রীর পক্ষের মিমাংসার যোগ্যতাসম্পন্ন একজনকে এনে তাদের সামনে নিজেদের সমস্যা উত্থাপন করবে। তারা যদি উভয়ের মাঝে মিলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছায় নিজেদের মাঝে আলোচনা-পর্যালোচনা করে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তাদের এই ভাঙ্গা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টায় ব্রতী হন, তাহলে আশা করা যায়, তাদের দূরত্ব খুঁচে আসবে এবং পুনরায় তাদের মাঝে প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, 'আর যে সকল স্ত্রীর ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, (প্রথমে) তাদেরকে বুঝাও এবং (তাতে কাজ না হলে)
তাদেরকে শয়ন শয্যায় একা ছেড়ে দাও এবং (তাতেও সংশোধন না হলে) তাদেরকে প্রহার করতে পার। অতঃপর তারা যদি তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণের পথ খুঁজো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি মহান, মর্যাদাশালী। আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ-বিবাদের আশঙ্কা কর, তবে (তাদের মধ্যে মিমাংসা করার জন্য) পুরুষের পরিবার হতে একজন সালিস ও নারীর পরিবার হতে একজন সালিস পাঠিয়ে দিবে। তারা দুজন যদি মিমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্ববিষয়ে জ্ঞাত ও সর্ববিষয়ে অবহিত।' (সূরা নিসা : ৩৪) তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি সম্পর্কের এতোটা অবনতি ঘটে যে, ওপরের কোন পদ্ধতিতেই স্ত্রীকে সংশোধন করা না যায় এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায় পৌঁছে যে, স্বামীর পক্ষে এই স্ত্রীকে নিয়ে ঘর-সংসার করা অসম্ভব হয়ে ওঠে এবং স্বামীও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, স্ত্রীকে সে ছেড়ে দিবে, তাহলে এ পর্যায়ে সে স্ত্রীর পবিত্রাবস্থায় তাকে এক তালাকে রাজয়ী দিবে। অর্থাৎ এভাবে বলবে যে, আমি তোমাকে এক তালাক দিলাম। এটাই হলো তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি। ব্যাস, এভাবে তালাক দেওয়ার পর যদি স্বামী-স্ত্রী নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং পূর্বের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাদের জন্য এখনও ভুল শোধরানোর সুযোগ আছে। স্বামী, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলেই তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আগের মতো হয়ে যাবে। তারা পুনরায় ঘর-সংসার করতে পারবে। আর যদি স্বামীর ছেড়ে দেওয়ারই একান্ত ইচ্ছা থাকে এবং তাকে আর ফিরিয়ে নিতে না চায়, তাহলে তাকে আর কোন কিছু করতে হবে না। বরং ইদ্দত শেষ হয়ে গেলেই স্ত্রী তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। (ইন্দতের সময় সীমা হল তিন ঋতু) এবার স্বামী ইচ্ছা করলেই বা চাইলেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। বরং তারা পুনরায় ঘর-সংসার করতে চাইলে নতুন করে বিবাহ পড়ানোর পর ঘর-সংসার করতে পারবে। তবে, স্মরণ রাখতে হবে,
স্ত্রীকে ইদ্দতের মধ্যেই ফিরিয়ে নিক অথবা ইদ্দতের পর নতুন করে বিবাহের মাধ্যমে, উভয় অবস্থায় স্বামী আর মাত্র দুই তালাকের অধিকারী থাকবে। ভবিষ্যতে কখনো দুই তালাক দিলেই স্ত্রী তার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন নতুন করে বিবাহের মাধ্যমেও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকবে না।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে যে পদ্ধতিটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত তা হচ্ছে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া। কেউ তো একবাক্যেই তিন তালাক দিয়ে দেয়। কেউ আবার পৃথক পৃথক তিন বাক্যে তিন তালাক প্রদান করে। মোটকথা শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে তালাক না দিয়ে নিজের মন মতো তালাক দেওয়া, রাগান্বিত অবস্থায় তাড়াহুড়া করে তালাক দেওয়া, কথায় কথায় তালাক দেওয়া, আবার তালাক দিতে গেলেই তিন তালাক দিয়ে দেওয়া, যেন তিন তালাকের কমে তালাকই হয় না, এসবই অন্যায় ও মারাত্মক গুনহের কাজ। তাই এগুলো থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক ।
এক সঙ্গে তিন তালাক দিলে কয় তালাক হয়? একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া অন্যায় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইসলামী আইনে একত্রে তিন তালাকদাতার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। তা সত্ত্বেও কেউ যদি এক কথায় বা একত্রে তিন তালাক দিয়ে দেয় তাহলে তিন তালাকই পতিত হবে এবং তার জন্য স্ত্রী সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিলো। অতঃপর সে স্ত্রী (অন্য ব্যক্তির সাথে) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং সেও তাকে তালাক দেয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে (উক্ত মহিলা) কি তার (প্রথম) স্বামীর জন্য হালাল (বৈধ) হয়েছে? তিনি বললেন, না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে মিলন হবে, যেমন পূর্বজনরে সঙ্গে মিলন হয়েছিল। (বুখারী শরীফ হাদীস- ৫২৬১)
বুখারী শরীফের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে (১০/৪৬১) ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) লেখেন, হাদীসে বর্ণিত শব্দ 'সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিলো' একথার উজ্জ্বল প্রমাণ যে, এই তিন তালাক এক সাথেই দেওয়া হয়েছিলো। এরপর তিনি এই অভিমতও ব্যক্ত করেছেন যে, এই ঘটনা ও রিফাআ (রা.) এর স্ত্রীর ঘটনা এক নয়। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, হযরত উয়াইমির (রা.) তার স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বললেন, সে তালাক, সে তালাক, সে তালাক। (মুসনাদে আহমাদ : হাদীস- 22324)
এসম্পর্কে সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, হযরত উওয়াইসিস (রা.)
তার স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার পর তার থেকে পৃথক হয়ে যান। (মুসলিম শরীফ : হাদীস- ১৪৯২) হযরত আবু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাস ইবনে মুগীরা (রা.) তার স্ত্রী ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা.) কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় এক বাক্যে তিন তালাক দিয়েছিলেন, যার দরুন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতেমা বিনতে
কায়েস (রা.)কে তার স্বামী থেকে স্বামী করে দেন।
কায়েস (রা.)কে তার স্বামী থেকে পৃথক করে দেন। (সুনানে দারাকুতনী :
8/35)
বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর নিকট এসে বললো, হে আবু আব্বাস! আমি আমার স্ত্রীকে রাগান্বিত অবস্থায় তিন তালাক দিয়েছি। তিনি বললেন, তোমার ওপর যা হারাম হয়ে গেছে, আবু আব্বাস তা হালাল করতে সক্ষম নয়। তুমি (একত্রে তিন তালাক দিয়ে) তোমার পালনকর্তার নাফরমানী করেছ। তোমার স্ত্রী তোমার ওপর হারাম হয়ে গেছে। (প্রাগুক্ত)
হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.)কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এক বৈঠকে তিন তালাক দিয়েছে। উত্তরে তিনি বলেছেন,
সে তার রবের আদেশ লঙ্ঘন করেছে এবং তার স্ত্রী তার ওপর হারাম হয়ে গেছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : হাদীস- ১৮০৮৭)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে (একত্রে) তিন তালাক দিল সে তার রবের নাফরমানী করল এবং তার স্ত্রী তার থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে গেল। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : হাদীস- ১৮০৯১)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, যদি কেউ তার স্ত্রীকে একত্রে তিন তালাক দেয়, তাহলে চার মাযহাবের চারও ইমামসহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অধিকাংশ আলেমগণের অভিমত হচ্ছে, তার স্ত্রীর ওপর তিন তালাকই পতিত হবে। (আল মিনহাজ : ১০/১৭৯৬)
ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.) বলেন, কুরআন, সুন্নাহ ও পূর্ববর্তীদের (সাহাবা, তাবেয়ীনদের) ঐক্যমত পোষণ করাই তিন তালাক এক সাথে দিলে তা পতিত হওয়াকে আবশ্যক করে। যদিও তা অন্যায়। (আহকামুল কুরআন জাসসাস : ১/৫২৯)
এক সঙ্গে অথবা এক কথায় তিন তালাক দেওয়া প্রসঙ্গে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী এবং ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ (রহ.) এর অভিমত হলো, এভাবে তালাক দেওয়া নিষিদ্ধ। তবে দিলে পতিত হয়ে যাবে। (মাজমু'আয়ে ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া : ৩৩/৮)
উপরোক্ত হাদীস, আছার, সাহাবী ও তাবেয়ীগণের অধিকাংশের অভিমত, পরবর্তী চারও মাযহাবের ঐক্যমতের ভিত্তিতে এ বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় পরিস্কার হলো যে, একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া যদিওবা অন্যায়, তবুও কেউ যদি দিয়ে ফেলে, তাহলে তা কার্যকর হয়ে যাবে এবং তার স্ত্রী তার জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যাবে।
শেষ কথা
তালাক খুবই স্পর্শকাতর ও জটিল বিষয়। যা ইচ্ছায় অনিচ্ছায়, রাগ বা স্বাভাবিক অবস্থায় এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে দিলেও কার্যকর হয়ে যায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তিনটি বিষয় এমন রয়েছে যা ওই উদ্দেশ্যে বললেও কার্যকর হয়, ঠাট্টাচ্ছলে বললেও কার্যকর হয়। (তা হল) বিয়ে, তালাক, এবং তালাকে রাজয়ীপ্রাপ্ত মহিলাকে পূণরায় গ্রহণ করা। (তিরমিযী শরীফ : ১১৮৪)
তাই তালাকের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পাশপাশি স্ত্রীকেও সচেতন থাকতে হবে, যেন তার দ্বারা এমন কোনো কাজ সংঘতি না হয় যার কারণে স্বামী অসন্তুষ্ট হতে পারে। স্বামীকেও সর্তক থাকতে হবে যে, স্ত্রীর সাথে এমন কোন আচরণ যেন তার দ্বারা না হয় যার পরিণতিতে স্ত্রী এমন কোন আচরণ বা উচ্চারণ করে, যার কারণে তাকে তালাক দেওয়ার মত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এভাবে উভয়েই পরস্পরের প্রতি আন্তরিক হলে দাম্পত্য জীবনে তালাকের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া অনেকটাই সম্ভব হবে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ফাটলের জন্য শয়তান অবিরাম চেষ্টা চালায়। উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। যখন তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যায়, তখন সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। তাই আমাদের কর্তব্য হলো, নিজেদেরকে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচিয়ে রাখা ও তালাক থেকে দূরে থাকার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। যাবের (রা.) হতে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'ইবলিস পানির ওপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। (সেখান থেকে) সে তার বাহিনী প্রেরণ করে। তার সবচেয়ে কাছের ও নিকটবর্তী সেই হয়, যে সবচেয়ে বেশি ফেনা ( গোলযোগ) করতে পারে। (তার কাছে) একজন এসে বলে, আমি এই কাজ করেছি, ঐ কাজ করেছি। সে (ইবলিস) বলে, তুমি কিছুই করোনি। আরেকজন এসে বলে, আমি অমুকের পিছু ছাড়িনি,
অবশেষে তার ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি। তখন সে তাকে কাছে টেনে নেয় ও বলে, তুমি কতইনা উত্তম সহযোগী। অতঃপর তাকে বুকে জড়িয়ে মুয়ানাকা করে। (মুসলিম শরীফ : হাদীস- ২৮১৩)
মনে রাখতে হবে, ইসলাম তালাককে পছন্দ করে না। ইসলাম চায়, বিবাহের এ বন্ধন যেন সদা অটুট থাকে। আর তা রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই খুব সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে। আমরা যদি একে অন্যের সাথে পূর্ণ মহব্বত ও ভালোবাসার আচরণ করি, সন্দেহের চোখে না দেখে আস্থাশীল হই, তাহলে আমাদের সম্পর্কে কখনো ফাটল ধরবে না। পাশাপাশি আমরা একে অন্যের হক আদায়ে পূর্ণ সচেষ্ট থেকে প্রত্যেকেই একথা মনে করি যে, আমার কাছে তার প্রাপ্য যে হক আছে, আমি তা আদায় করে দিই। কারণ কিয়ামতের দিন আমার হিসাব আমাকে দিতে হবে। আর সে তার হক আদায় করলো কি না সে বিষয়ে আমার মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। কারণ কিয়ামতের দিন তার বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। তাহলে দাম্পত্যবন্ধন আরো মজবুত হবে।
আর যদি একান্তই এমন পরিস্থিতি সামনে এসে যায়, যে ক্ষেত্রে তালাক দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা থাকে না, তাহলে সে ক্ষেত্রেও অনেক ভেবে-চিন্তে, পরামর্শ সাপেক্ষে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যেন পরবর্তীতে লজ্জিত হতে না হয়। আর সেটাও তালাক দেওয়ার শরয়ী পদ্ধতি অনুযয়ী হওয়া। কোন অবস্থাতেই একসাথে তিন তালাক না দেওয়া।


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন