তাকলীদ (ইমাম চতুষ্টয়ের কোন একজনের অনুসরণ) সম্পর্কে জরুরী কিছু কথাSomething important about Taqleed (following one of the four Imams).
তাকলীদ (ইমাম চতুষ্টয়ের কোন একজনের অনুসরণ) সম্পর্কে জরুরী কিছু কথা
‘কুরআন’ আল্লাহর কালাম। 'হাদীস' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী। আল্লাহ যেমন বড়, তার সত্তা যেমন মহত্ব তেমনি তার কালামও বড় ও হেকমতপূর্ণ। এমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সর্বাপেক্ষা বড় সাহিত্যিক ও হেকমতপূর্ণ ভাষার অধিকারী। আমাদের মত সাধারণ মেধার মানুষ আল্লাহর কালাম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝা ও তার নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ঘাটন করা প্রায় অসম্ভব। শুধু আমরাই বা কেন, সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) আরবী ভাষাবিদ হওয়া সত্ত্বেও কুরআন ও হাদীসের সকল বিষয় নিজে নিজে বুঝতে সক্ষম হননি। এজন্যই তো তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে থেকে তাঁর থেকে শুনে শুনে কুরআন ও হাদীস বুঝেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে যাদের বেশি থাকার সৌভাগ্য হয়েছে তারা কুরআন হাদীস সম্পর্কে বেশি পারদর্শী হয়েছেন। আরবী ভাষা জানলেই যদি কুরআন হাদীস বুঝা যেত, তাহলে বিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরামের তালিকায় হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, হযরত ওমর ফারূক, হযরত আলী, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত ইবনে ওমর, হযরত যায়েদ বিন সাবেত, হযরত আবু হুরায়রা, হযরত আয়েশা (রাযি.) প্রমুখ অল্প সংখ্যক সাহাবীর নাম
হানাফীদের বিরুদ্ধে প্রতারিত বিভ্রান্তির অবসান - ১০
পাওয়া যায় কেন? সকল সাহাবীই তো বড় বড় মুফতী হওয়ার দরকার ছিল। তারা তো সকলেই ভাষাবিদ ছিলেন, আর 'কুরআন'-'হাদীস'ও আরবী ভাষায়।
অতএব বুঝা গেল, কুরআন হাদীস তথা শরীয়াত নিজে নিজে অধ্যয়ন। করে বুঝার বিষয় নয়। বরং শরীআত সম্পর্কে সম্যক পারদর্শী কোন বড় আলেমের সাহচর্য গ্রহণ করে কুরআন হাদীস বুঝতে হয়। আর শরীআত সম্পর্কে দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে পারদর্শী কোন আলেমের ওপর আস্থাশীল হয়ে তার বর্ণিত মাসআলার অনুসরণ করার নাম তাকলীদ। যেমন আপনি শুক্রবার জুমার খতীব সাহেবের মুখ থেকে শরীআতের কোন বিষয় সম্পর্কীয় বয়ান শুনে সে অনুযায়ী আমল করলেন। এটা আপনার জন্য ঐ খতীব সাহেবের তাকলীদ বা অনুসরণ করা হল। এর অর্থ এটা নয় যে, আপনি কুরআন হাদীস বাদ দিয়ে একজন খতীবের অনুসরণ করলেন। বরং সে কুরআন হাদীস থেকে যে মাসআলা বর্ণনা করেছে আপনি তারই অনুসরণ করলেন, এটা সরাসরি কুরআন-হাদীসই মানা হল। তাকলীদের বিষয়টিও হুবহু এমন। এমন তাকলীদ শুধু এ যুগে কেন, সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) থেকে শুরু করে সর্বযুগে এর প্রচলন ছিল এবং আছে। আর এমন তাকলীদ তো না করে কোন উপায় নেই। কারণ শুরুতে বলেছি, আমাদের নিজস্ব বুঝ শরীআত মানার জন্য যথেষ্ট নয়। যারা জানে তাদের অনুসরণ জরুরী।
এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, তাহলে আমরা নির্দিষ্ট চার ইমাম তথা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.)এর তাকলীদ কেন করবো? তাহলে এবার শুনুন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.)সহ অপরাপর ইমামগণ আল্লাহ প্রদত্ত মেধা ও সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনদের সাহচর্যে থেকে কুরআন ও হাদীসের যে বুঝ অর্জন করেছেন এবং যে পরিমাণ মাসআলা বর্ণনা করেছেন তাদের পরবর্তী যুগে তাদের সমকক্ষ কেউ হতে পারেনি। শুধু তাই নয়; বরং পরবর্তীরা সকলে এসকল ইমামদের বর্ণনাকৃত মাসআলা মানুষদেরকে শোনায় কিংবা তাদের রচিত বইয়ে লেখে। এমন কি আহলে হাদীস দাবিদার বন্ধুরাও কোন মাসআলা বলতে কিংবা লিখতে ইমামদের অনুসরণ না করে পারে না। এক্ষেত্রে আমরা এখানে সমসাময়িক এক আহলে হাদীস বন্ধু শায়েখ আবুল
হানাফীদের বিরুদ্ধে প্রচারিত বিভ্রান্তির অবসান - ১১
ফজল কর্তৃক রচিত 'সহীহ নামায শিক্ষা' নামের একটি বইয়ের কথা উদ্ধৃত করছি। তিনি সে বইয়ের বহু জায়গায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নয় বরং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)এর অনুসারী ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত আলেম হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)এর রচিত বই 'বেহেশতী জেওর' থেকে উদ্ধৃতি নকল করেছেন। অতএব বুঝা গেল তাদের নিজস্ব কোন পুঁজি নেই। কিংবা কুরআন হাদীস সামনে রেখে মাসআলা উদ্ভাবন করার ক্ষমতা নেই। তাহলে এবার সহজেই বুঝে আসে যে, এ সকল ইমামগণের অনুসরণ না করে কোন উপায় নেই। তাই তো সারা বিশ্বের মুসলমান এই ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্য থেকে কোন না কোন ইমামের অনুসরণ করে থাকে। যেমন সৌদিআরবের মুসলমান ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) এর অনুসরণ করে। মিসরী মুসলমান ইমাম শাফেয়ী (রহ) এর তাকলীদ করে। ইথিওপিয়া মুসলমান ইমাম মালেক (রহ.) কে অনুসরণ করে। তুরস্ক, ইরাক, আফগান, আরকান, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ বহু দেশের মুসলমান হানাফী মাযহাবের অনুসারী। এমনকি অল্প সংখ্যক মুসলমান যারা তাকলীদ করে না বলে দাবি করে তারাও কোন না কোন ইমামের তাকলীদ করে থাকে। বরং তাদের বেলায় দেখা যায় তারা একাধিক জনের মাযহাব মানে। আবারো বলি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর অনুসরণ করা অর্থ তার ব্যক্তিগত কথা মানা নয় বরং কুরআন হাদীসের আলোকে তিনি যে সকল সঠিক মাসআলার ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা দিয়েছেন তার অনুসরণ করা। তিনি ১১ লক্ষের চেয়েও বেশি মাসআলা উদ্ভাবন করেছেন।
এখানে একটি বিষয় আলোচনা করা সমীচীন মনে করছি যে, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ হজ্বের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কাতে গিয়ে আরবীদেরকে দেখে যে, তারা নামাযে বার বার হাত তোলে, আমীন জোরে বলে, বুকের ওপর হাত বাঁধে ইত্যাদি। এগুলি দেখে মনে করে আমরা হানাফীরা ভুলের মধ্যে আছি। এটা তাদের নিতান্ত ভুল ধারণা। কেননা পূর্বে আলোচনা করেছি। যে, আরব মুসলমান ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) এর অনুসরণ করে। আর ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মাযহাবে এসব আমল আছে, অতএব এতে
হানাফীদের বিরুদ্ধে প্রচারিত বিভ্রান্তির অবসান
বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। হানাফী মাযহাবে এসব আমল না থাকা সম্পূর্ণ শরীআতভিত্তিক।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আমাদের দেশের নামধারী আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের ছাত্ররা মদীনা ইউনিভার্সিটি ও উম্মুল কোরা ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালে অবসর সময়ে হারাম শরীফ ও মসজিদে নববীতে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে হজ্বের উদ্দেশ্যে যাওয়া সাধারণ বাঙালীদেরকে তাদের মতাদর্শের প্রতি দাওয়াত দেয়। এতে সাধারণ মানুষ মনে করে আরব মুসলমান বুঝি আহলে হাদীস। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বাস্তব বিষয়টি এমন নয়। এসব ক্ষেত্রে সজাগ ও সচেতন থাকা খুবই জরুরী। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দান করুন। আমীন


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন