আমার চোখ চুরি করলো কে
আমার চোখ চুরি করলো কে
আ আমার নাম শিশির মণ্ডল। আমি টাট্টুর মামা। টাটুকে চিনলেন না তো? টাই আমার বোনপো। আপনারা না চিনলে কী হবে, আমাদের এলাকার প্রায় সবাই-ই চেনে টাটুকে। অবশ্য টাটুকে চিনেই বা আপনাদের লাভটা কী? আমার এই গল্পে ওর কোনও ভূমিকা নেই। তারচে আপনাদের বরং আমার গল্পটাই বলি ।
আমার বয়স তখন বিশ বছর। প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হলাম আমি। বাড়ির লোকজন প্রথমটায় গা করল না। কিন্তু জ্বরটা যে আমাকে ছাড়বে না তা কি আর ওরা ভাবতে পেরেছিল? যখন আমাকে হাসপাতালে নেয়া হলো, ততক্ষণে মরোমরো অবস্থা আমার। সমানে প্রলাপ বকে চলেছি। প্রচণ্ড জ্বর নামানোর জন্য সাপোজিটর দেয়া হলো। ডাক্তার জানালেন, রক্ত পরীক্ষা করতে হবে । তা আর অবশ্য হয়ে উঠল না। ওইদিন রাতেই হাসপাতালে উপস্থিত সব আত্মীয়-স্বজনকে কাঁদিয়ে চোখের জলে ভাসিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করলাম আমি। রাতের বেলা হওয়ায় আমার লাশ নিয়ে ফিরতে পারল না বাড়ির লোক।
পরদিন সকালে আমার ডেডবডি নিয়ে বাড়ি ফিরল আত্মীয়-স্বজন । আমার মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই দেখতে এলো আমায়। বলে রাখা ভাল, হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর ডাক্তার সাহেবরা সেই যে আমার লাশটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে গেল, তারপরে আর কেউ তা খুলে আমাকে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। বাসায় এসে আমার মুখের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে বাড়ির লোকজনের তো ভিরমি খাওয়ার দশা হলো। আমার চোখদুটি বিকৃত। অমন সুন্দর দীঘল কালো মণির আমার
হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বিকৃত চোখের আমার লাশটাকে দেখতে বীভৎস লাগছিল । অদৃশ্য আমিও আমার লাশটা দেখে করুণ সুরে কাঁদতে লাগলাম। আমার পরিবারের লোকেরা তক্ষুণি বডিটা নিয়ে হাসপাতালে ফেরত গেল । কিন্তু কর্তৃপক্ষ কি আর দায়, স্বীকার করে। লাশটা বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে কেন চেক করেননি? ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কথা বলে তারা প্রায় ঝেঁটিয়ে বিদেয় করল পরিবার ও স্বজনদের। কী আর করা, মনের দুঃখে আমার স্বজনরা চক্ষু ছাড়াই আমাকে জানাজা, পড়ে সমাহিত করল অন্ধকার কবরে। কিন্তু আমি তো জানি আমার চোখ জোড়া কীভাবে চুরি হলো । আমার মৃতদেহটা যখন ঢেকে রেখে আমার পরিবার ঘুমাচ্ছিল, সেই সুযোগে হাসপাতালের ডাক্তার অলোক রায়ের নেতৃত্বে একদল লোক আমার বডিটা গোপনে চুরি করে অপারেশন করে আমার কর্নিয়া দুটি নিয়ে অন্য আরেকজন রোগীকে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে, সেই রোগীটা কে ছিল তা আমার পক্ষে তখন জানা সম্ভব হয়নি।
মানুষ মারা গেলে কবর দেয়ার আগ পর্যন্ত তার আত্মাটা পার্থিব জগতের দেহটার আশপাশেই ঘুর ঘুর করে বেড়ায়। আমিও আমার দেহের পাশেই ছিলাম। অপারেশন করে ডাক্তার অলোক আমার বডিটা আবার আগের জায়গায় রেখে আসায় আমি আর আমার চোখের বর্তমান মালিকটিকে দেখতে পাইনি। দুর্ভাগ্য আরকী! তবে এত ঘটনার কিছুই জানল না আমার স্বজনরা। সম্ভবত চালাকি করে ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। যাকগে, সে তো গেল । ওভাবেই কবরে গেলাম আমি । কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই অতৃপ্তি আমার আত্মাকে শান্তি দিল না। শান্ত থাকতে পারলাম না
আমি। আমার চোখ দুটো গেল কোথায়? ওই 'দুটো ছাড়া মরেও শান্তি পাচ্ছি না আমি। কে নিল আমার চোখ? চোখ ছাড়া অন্ধকার কবর যে আরও অন্ধকার। ওই দুটো যে আমাকে পেতেই হবে। সেই কবর দেয়ার দিন থেকেই সন্ধ্যার পর যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, কবর ছেড়ে বেরিয়ে আসি আমি। উড়ে উড়ে খুঁজতে থাকি আমার চোখ জোড়া। ওই চোখ না পেলে যে কবরেও শান্তি পার না আমি। রাস্তায় যে লোকই পাই ছুটে যাই তার কাছে। আপনারা জানেন না বোধহয়, নখ না কাটতে কাটতে ওগুলো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। রাস্তায় যে লোকই পাই ধরে ইয়াবড় লম্বা লম্বা নখগুলো ঢুকিয়ে দিই তার দুইচোখের মধ্যে। খুবলে তুলে আনি ওদের চোখগুলো। ভাল করে পরখ করে দেখি ওই চোখগুলো আমার কি না। কিন্তু দুর্ভাগা আমি এখন পর্যন্ত নিজের চক্ষু জোড়া খুঁজে পাইনি। ওই লোকগুলোর চোখ তুলে যখন দেখি তা আমার নয়, তখন কী বলব, ভীষণ রাগ হয় আমার। তখন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাই আমি। প্রচণ্ড আক্রোশে আমার ধারাল নখগুলো দিয়ে ওই লোকটাকে তখন আমি চিরে ফালা ফালা করে ফেলি। নাড়িভুঁড়ি বের করে ছিঁড়ে খুঁড়ে একাকার করি তখন। পরদিন রাস্তায় ওদের রক্তাক্ত বীভৎস লাশ মেলে। কিন্তু রহস্যের এখন পর্যন্ত কোনও কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ভাগ্যিস আপনাদের কেউ এখনও আমার সামনে পড়েননি। তা হলে আপনাদেরও যে ওই অবস্থা হবে! তবে আপনাদের একটা সুখবর দিয়ে রাখি। গত দুই রাত আগে আমি একটা মধুর প্রতিশোধ নিয়েছি। কী করেছি জানেন? আর বলবেন না, হাহ্ হাহ্ হাহ্ হা... আমার চোখ চোরকে হঠাৎ বাগে পেয়ে যাই। কী করতে যেন ওই ব্যাটা অলোক রায় আমার এই গোরস্তানে এসেছিল।
তখন নিশুতি রাত। ব্যাটা দেখলাম একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে হেঁটে কোথায় যেন যাচ্ছে। দূরেই ওর গাড়িটা অবশ্য পার্ক করা ছিল। হঠাৎ গিয়ে ওর সামনে হাজির হলাম আমি। অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ আমাকে দেখে ওর যে কী অবস্থা। হয়েছিল, তার কী বলব আপনাদের। ও চোখ বড়-বড় করে আমার দিকে তাকাল। এতটাই ভয় পেয়েছিল, চিৎকার দেয়ার কথাও ভুলে গেল। আমি কী আর ওকে ছাড়ি! ভয়ের চোটে রসগোল্লার মত হয়ে যাওয়া ওর চোখ দুটো ধারাল নখ ঢুকিয়ে অবলীলায় তুলে নিলাম আমি জানিই তো ওর চোখ দুটো আমার প্রচণ্ড আক্রোশে ওর চোখ দুটো দু'হাতের তালু দিয়ে চটকাতে লাগলাম। চটকে চটকে একেবারে ভর্তা বানিয়ে ফেললাম ওদুটো তারপর খাইয়ে দিলাম হারামজাদাকে। কী বলব আপনাদের, প্রচণ্ড কষ্ট দিয়ে মেরেছিলাম ওকে। শরীর থেকে ছিলে ওর ছাল চামড়া তুলে নিয়েছিলাম। শরীর মাংস, নাড়ীভুঁড়ি ছিঁড়ে- ছুঁড়ে একাকার করেছিলাম। এমন অবস্থা করেছিলাম, ওর ডেড বডিটা একটা মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছিল।
* পরদিন লাশ সনাক্ত করতে গলদঘর্ম হয়েছিল পুলিশেরা। কী, কেমন হলো মধুর প্রতিশোধ? জানি আপনারা আমাকে পাগল ভাববেন, হাসবেন আমার কথায়। তা হাসুন, আর পাগলই ভাবুন, তাতে কিচ্ছু এসে যায় না আমার মরা মানুষের আত্মার আবার মান- অভিমান, ফুহ! আমি শুধু আমার চোখ চাই, ব্যস। আপনাদেরই যে কেউ একজন আমার চোখ জোড়া বয়ে বেড়াচ্ছেন না, তাই বা কে বলবে?
সুতরাং আপনাদের পেলেও যে ছেড়ে দেব, এমন ভাববেন না যেন! খালি পড়ুন না একবার সামনে। তখন দেখার মজা। খালি সমস্যা যে, অন্ধকার ছাড়া থাকতে পারি না আমি। ইস, যদি আলোতে যেতে পারতাম...! নিশ্চয়ই এতদিন আমার চক্ষু জোড়া ঠিক খুঁজে বের করে নিতে পারতাম। তা হলে আমিও বেঁচে যেতাম, আপনারাও স্বস্তি পেতেন। ধ্যাত্তেরি, এতক্ষণ ধরে ফালতু প্যাচাল পাড়ছি আপনাদের সঙ্গে। ওই যে, সামনের রাস্তায় একজন লোক দেখা যাচ্ছে। তারচে বরং এখন আমি যাই, গিয়ে দেখি তার চোখ জোড়াই আমার কি না।


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন