দাসপাড়ার রহস্য
দাসপাড়ার রহস্য
তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আর সে কারণে স্কুল আকস্মিকভাবে ছুটি ঘোষিত হলো। ছুটি থাকলেও একই ক্লাসের একই গ্রামের হাসান, অরুণ আর পলাশ স্কুলের মাঠে বিকেলে খেলতে যেত । প্রতিদিন বিকেলে খেলতে যাবার সময় পলাশ আগে হাসানদের বাসায় আসে, তারপর ওরা দুজনে মাঠে যাবার পথে অরুণকে ডেকে নিয়ে যায় ।
তিন-চারদিন পর এক বিকেলে অরুণকে ডাকতে গিয়ে তাকে পাওয়া গেল না। বাড়িতে একমাত্র অরুণের কুমারেশ কাকা ছাড়া আর কেউ ছিল না। কুমারেশ কাকা তখন ব্যস্ত-একটা গরুর গাড়িতে বাড়ির অনেক মালপত্র তোলা হয়েছে। আরও তোলা হবে। উঠনময় ছড়িয়ে আছে পিতলের কলসি, থালা-বাটি, লেপ-তোশক, বালিশ, ধানের-বস্তা, চালের বস্তা আর কাঠমিস্ত্রির কাজের নানা সরঞ্জাম।
অরুণের কাকা কুমারেশ, সেই ছোটকাল থেকে হাসানদের চেনে। ওদের আগমনের হেতু বুঝতে পেরে নিজে থেকেই তিনি জানালেন, অরুণ মামাবাড়ি বেড়াতে গেছে। কুমারেশ কাকার কথাগুলো আগের মত নয়; কেমন যেন বিষণ্নতায় ভরা। তিনি নিজেও যে বেড়াতে যাচ্ছেন এবং অনেকদিন এ বাড়িতে থাকবেন না সেকথাও জানালেন। অগত্যা পলাশ আর হাসান অরুণকে ছাড়াই মাঠে খেলতে যায়। যেতে-যেতে ওরা বলাবলি করে, অরুণটা এভাবে চলে গেল? একটু বলেও যাবে না? অরুণদের পরিবার যে স্বাভাবিকভাবে কোথাও বেড়াতে যায়নি, সেটা ওরা বেশ বুঝতে পারে। এরকম অস্বাভাবিকভাবে চলে যাওয়া কি তবে যুদ্ধের কারণে? যুদ্ধ তো সত্যিই তা হলে খারাপ জিনিস'।
মিস্ত্রিপাড়ায় অরুণদের বেশ বড় বাড়ি। চারদিকে কত গাছপালা-পুকুর। আর বাড়ির সামনে সারাবছরই অনেক কাঠ পড়ে থাকে। বেশিরভাগই বাবলার কাঠ। এ-কাঠ দিয়ে অরুণের বাবা আর কুমারেশ কাকা গরুর গাড়ির ঢাকা, লাঙলের ঈষ, লাঙলের জোয়াল এসব তৈরি করে । আবার বিজয়া দশমীর দিনে কিংবা কোনও মেলায় অরুণের বাবা আর কুমারেশকাকা ছোট-ছোট গাড়ি, বসার পিড়ি, রুটি তৈরির পিঁড়ি-বেলুন এসবের দোকান দেয়। মেলার অনেক আগে থেকেই তারা এসব তৈরি করে জমা করতে থাকে।
ক্লাস টু'তে পড়ার সময় অরুণ একটা কাঠের গাড়ি হাসানকে উপহার দিয়েছিল। ওরকম গাড়ি অরুণের বাবা বিক্রি করার জন্য কখনও বানায় না। বোঝা গিয়েছিল হাসানকে দেবার জন্যই গাড়িটা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। গাড়টা পেয়ে হাসান খুব খুশি হয়েছিল। এরপর থেকে হাসান প্রায় প্রতিদিনই অরুণদের বাড়ি সময়ে অসময়ে যাওয়া-আসা করত । অরুণদের পুকুরে কতদিন গোসল করে ভেজা কাপড়ে হাসান বাড়ি গেছে। কোনও কোনওদিন অরুণের মা হাসানের গা-মাথা মুছে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে কাপড় পাল্টাতে তাগিদ দিয়েছে। কতদিন অরুণের মা অরুণের সাথে হাসানকেও একসাথে দুধ দিয়ে চিঁড়ে- মুড়ি, নাড়ু খেতে দিয়েছে। সেই অরুণ এভাবে চলে গেল? এভাবে অরুণের মা, অরুণ চলে যাওয়ায়, হাসানের মনের মধ্যে কেমন যেন করে ওঠে। এমন আর আগে কখনও হয়নি।
অরুণরা চলে যাবার পর কয়েকদিনের মধ্যেই হাসানদের গ্রামের কামারপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, নাপিতপাড়া, পালপাড়াসহ অন্যান্য পাড়ার হিন্দুদের সবাই বাড়িঘর ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ইণ্ডিয়ায় চলে যায়। মানুষ ছাড়া এসব পাড়া-বাড়িঘরগুলো কেমন ছন্নছাড়া দেখাচ্ছে । উঠন ঘাসে ভরে গেছে। মাটির ঘরবাড়ি লেপা- মোছা না হওয়ায় ভেঙেচুরে গেছে। কারও কারও বাড়ির গাছের আম-কাঁঠাল, পেঁপে পেকে-পেকে গাছের নীচে ঝরে পড়েছে। শেয়াল-কুকুর, পাখিরা জটলা করে খাচ্ছে। তাড়ানোর জন্য কেউ আসছে না।
যুদ্ধ শুরু হবার পরে হাসানের ছোটচাচা
সেই যে মাস দুয়েক আগে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছিল আর এসেছিল গত পরশু। হাসানের ছোটচাচার কাছে তার আব্বু একটা চিঠি পাঠিয়েছেন, সে চিঠিতেই হাসানের আব্বু জানিয়েছেন, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব ও চলাচলের অসুবিধার কারণে তিনি বেশ কিছুদিন বাড়িতে আসবেন না। এখন তিনি দলবল নিয়ে ঝিনাইদহ শহরের কাছাকাছি বেশ নিরাপদেই আছেন। দেশের এ-অবস্থায় তাঁর পক্ষে বাড়ি থাকাটাও নিরাপদ নয়। তাই হাসানের আব্বু বাড়ির সবাইকে ধৈর্য ধরে থাকতে বলেছেন। যদি গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারি ঢুকে পড়ে তবে বাড়ির সবাই যেন পুকুর বা নদীতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কারণ মিলিটারিরা সহজে পানিতে নামতে চায় না। পানিকে ওরা খুব ভয় পায়। আম্মুর পড়া হলে, হাসান আম্মুর কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়ে।
পুকুরে মাছ ধরার জন্য হাসানের আব্বু খুব ছোটা একটা নৌকা বানিয়েছিলেন। পুকুরে মাছ ধরা ছাড়াও বর্ষাকালে যখন গ্রামের পথে হাঁটাচলা করা অসুবিধা হত এবং বাড়ির পাশের খালে পানি বাড়ত, তখন এ-নৌকায় করে হাটে যাওয়া-আসা হত। এ-বছর অন্য বছরের চেয়ে খুব বেশি পানি হয়েছে খালে। তাই অনেক আগেই খালে নৌকার ব্যবহার শুরু হয়েছে। হাসানের ছোটচাচা ঝিনেদায় যাবার জন্য কিছুটা পথ বাড়ির নৌকায় যাবার সিদ্ধান্ত নেয় । বাড়ি থেকে হরিশপুরের শেষ মাথা কিংবা বেলতলা গ্রাম পর্যন্ত অনায়াসে নৌকায় যাওয়া যায়। ওখান থেকে জিকে খালের বাঁধ ধরে গাড়াগঞ্জ হয়ে ঝিনেদা যাওয়া যাবে।
জিকে খালের বাঁধ পর্যন্ত হাসানের চাচাই নৌকা বেয়ে যায়। যাবার সময় হাসান আর ঈমান আলীকে পথ চিনিয়ে দেয় যাতে ফেরার সময় তাদের সুবিধা হয়। হাসান ও ঈমান আলী নৌকায় বসে চারদিক দেখতে দেখতে যায়; তেমন কথাবার্তা বলে না। বেলতলা গ্রামের জিকে-খালের বাঁধের কাছে নৌকা থামিয়ে হাসানের ছোটচাচা নেমে যায়। যাবার সময় সে হাসান আর ঈমান আলীকে খুব সাবধানে নৌকা বেয়ে ধীরে-ধীরে যেতে বলে।
এই প্রথম আব্বু ছাড়া হাসানের এতদূর
আসা। তাও আবার নৌকায়। দেশে যুদ্ধ-টুদ্ধ হলেও হাসানের এভাবে নৌকায় এতদূর আসাটা বেশ ভালই লাগছে। সে এর আগে হরিশপুর কিংবা বেলতলা গ্রামের নাম শুনলেও, এই প্রথম সে গ্রাম দেখল। বেলতলা গ্রামের দক্ষিণ দিয়ে বয়ে চলা জিকে খাল বা গঙ্গা- কপোতাক্ষ খালটা সেই হার্ডিঞ্জ ব্রিজ-এর কাছে পদ্মা নদী থেকে শুরু হয়ে আলমডাঙা থানার ভিতর দিয়ে শৈলকুপা থানার দিকে চলে গেছে। হাসানের ছোটচাচা সেই জিকে খালের বাঁধে উঠে শৈলকূপা থানার গাড়াগঞ্জের দিকে চলে যায়।
চারপাশে পানি আর পানি। শুকনো। থাকলে যে রাস্তায় ঘোড়াগাড়ি-গরুগাড়ি চলে এখন সে রাস্তায় নৌকা চলছে। যাবার সময় যে পথে গিয়েছিল সে পথ ধরেই ওরা নৌকা বেয়ে আসে। রাস্তার পাশে কোনও কোনও ছোট খেজুর গাছের পাতা রাস্তার উপর এসে পড়েছে। নৌকায় বসে হাসান একঝাক কবুতর উড়ে যেতে দেখে। উড়ন্ত কবুতরগুলোর দিকে হাসান অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। হাসানের ওভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে ঈমান আলী বলে, 'ওসব বুনো কইতর। খুব পাজি, পোষ মানতি
চায় না।' হাসান চোখ না ফিরিয়েই বলে, 'খুব সুন্দর
হাসানের মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে ঈমান আলী আরও বলে, 'ওসব কইতর বড় বড় দালানের খোপে থাকে, আমি কত দেকিচি।' ঈমান আলী মুগ্ধ-শ্রোতা পেয়ে আরও জানায়, সে হিন্দু পাড়ায় বুনো কবুতরের অনেক বাসা দেখেছে। অনেকে টিনের ঘরের পেছনের চালের সাথে ঝুড়ি বেঁধে রাখে। সেসব ঝুড়িতে বুনো কবুতর এসে তাদের ইচ্ছামত বসবাস করে। ওইসব ঝুড়ির মধ্যেই তারা ডিম পাড়ে, সে ডিমে বাচ্চ হয়।
ঈমান আলী এক নাগাড়ে এসব বলে গেলে সান আরও জানতে চায়, 'বুনো কবুতরের বাচ্চাও কি বুনো হয়? পোষ মানে না?'
ঈমান আলী মন্তব্য করে, "ভাল ঘর করে দিলি আর খাওয়া দিলি অনেক সুমায় বুনো কইতরও আর বাড়ি ছাইড়ে যায় না।' ঈমান আলী ওর দাদীর কাছ থেকে এমন কথাই
শুনেছিল।
কবুতরের প্রতি হাসান খুব দুর্বল। ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার আগে হাসানের সব কবুতর তার আব্বু ফুফুর বাড়িতে দিয়ে আসেন। কারণ পড়ালেখা বাদ দিয়ে দিনের মধ্যে কতবার যে হাসান কবুতর ঘরে উকি মারত। কোনওটা ডিম দিচ্ছে, কোনওটার বাচ্চা বড় হয়ে আর ক'দিন পরেই উড়তে শিখবে, এসব ভাবতে ভাবতে তার বৃত্তি পরীক্ষার পড়ার খুব ক্ষতি হচ্ছিল। তাই ভর আব্বু কবুতরগুলো ফুফুর বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হলেও সেসব কবুতরের আর খোঁজ করা হয়নি, কারণ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আগের কবুতরের ঘরখানা ভেঙে গিয়েছিল। একসময় সেটা চুলোর লাকড়িতে পরিণত হয়েছে।
নৌকায় বসে কবুতরের ঝাঁক উড়ে যেতে দেখে এবং ঈমান আলীর কথা শুনে হাসানের আবার কবুতর পোষার শখ জেগে উঠল। হিন্দুপাড়ার মানুষ তো সবাই ইণ্ডিয়ায় চলে গেছে, তাদের পাড়ায় গিয়ে বুনো কবুতর খোঁজ করলে, কে দেখবে বা মানা করবে? হাসানের প্রস্তাবে ঈমান আলীও উৎসাহিত হয়। তা হলে বাড়ি ফেরার পথে একটু ঘুরে গেলেই তো এ এলাকার সবচেয়ে বড় হিন্দুগ্রাম ভায়নার দাসপাড়ায় যাওয়া যায়।
ভায়না গ্রামের দাসপাড়ায় একটা বড় মন্দির আছে। সেই মন্দিরের পাশেই প্রকাণ্ড একটা বটগাছ। অনেক দূর থেকেও এই বটগাছটা দেখা যায়। হাসানদের নৌকাটা সেই বটগাছের কাছে এলে সেখানেই বটগাছের শিকড়ের সাথে নৌকাটা বেঁধে রাখে ওরা।
নৌকা রেখে ওরা দাসপাড়ার মধ্যে ঢোকার সময় ভয়ে ভয়ে মন্দিরের দিকে তাকায়। মন্দিরের মধ্যে মূর্তিটা ভাঙা। কারা যেন মূর্তিটা ক্ষতবিক্ষত করে রেখে গেছে। শিবের মুণ্ডুর কাছে কেবল কিছু খড়ের আভাস। হয়তো মুণ্ডুটা কেউ শক্ত কিছু দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। কালীমূর্তির মাথাটা গলা থেকে ভাঙা। সেটা দেহের উপর থেকে নীচে ঝুলে আছে।
বেলা তখন দুপুরের কাছাকাছি হলেও আকাশের সূর্যটা মেঘের আড়ালে থাকায় বাঁশ
বাগানের পাশের কালীমন্দিরটাকে কেমন যেন এক ভৌতিক বাড়ির মত দেখায়। ঈমান আলী আর হাসান তাই দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করে পাড়ার মধ্যে কবুতরের সন্ধানে যায় । হাসানদের গ্রামের মিস্ত্রিপাড়ার মতই, ভায়াগ্রামের সমস্ত দাসপাড়াটা নীরব-নিস্তব্ধ । কোথাও কোনও জনপ্রাণী নেই, কোনও শব্দ নেই। কেবল সারিসারি ঘরবাড়ি আর গাছপালা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমেই ওরা যে বাড়ির উঠনে এসে দাঁড়াল, সে বাড়ির উঠনে অনেক ধান ছড়ানো । ধানগুলো থেকে চারা বের হয়ে গেছে। বোঝা যায় গৃহকর্তা চলে যাবার পরে কেউ এ-বাড়ি লুট করতে এসে, ধানটান নিতে না পেরে তা উঠনময় ছড়িয়ে নিজেদের বন্য-স্বভাব জাহির করে গেছে।
পাশের আর একটা বাড়িতে ওরা ঢুকে দেখতে পায়, উঠনের কোনায় একটা কলাগাছে এককাঁদি কলার বেশকিছু পেকে গেছে। ঈমান আলী গাছটার কাছে গিয়ে অনেক কষ্টে তাতে উঠে, পাকা কলাগুলো ছিঁড়ে আনে। তারপর দুজনে কলাগুলো খেতে খেতে আরেক বাড়িতে যায়। কলাগুলো খুব মিষ্টি। তবে সম্পূর্ণ পাকেনি বলে তা একটু কষ-কষ মনে হলো। কলা খাওয়া শেষ না হতেই, ওদের কাছে আসে কবুতরের ডাকের শব্দ। সত্যিই কি কবুতরের ডাক? দু'জনেই কান খাড়া করে শুনে নিশ্চিত হয় এ ডাক কবুতরের না হয়েই যায় না। কিছুক্ষণ খোঁজ-খবরের পর ওরা কবুতরের সন্ধান পেয়ে যায়। বড় একটা টিনের ঘরের পেছনের চালের সাথে তিনটে ঝুড়ি বাঁধা। কবুতরের ডাক ওই ঝুড়ি থেকেই আসছে। তবে ঝুড়িটা যে অবস্থানে রয়েছে, সেখানে পৌছাতে হলে মই কিংবা কঞ্চিওয়ালা বাঁশ ছাড়া সম্ভব নয় । তাই আপাতত ওরা মই অথবা বাঁশের খোঁজ করতে থাকে। গৃহস্থ বাড়িতে ওসব কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আছে। খুবই মনোযোগ দিয়ে একটা মই কিংবা ওপরে ওঠা যায় এমন একটা বাঁশের সন্ধান করতে থাকে ওরা।
দাসপাড়ার যেদিকটায় সবচেয়ে বেশি দালান ঘর, এবার ওরা সেদিকে এসে পড়ে। এদিকে আসতেই হাসান আর ঈমান আলীর মনে হলো কে যেন কথা বলে উঠল। প্রথমে
ওদের বিশ্বাস হয় না, এই নির্জন পরিবেশে কে কথা বলবে? কিছুক্ষণ আর কোনও কথাটথা শোনা গেল না। হাসান আর ঈমান আলী আগের মত আবার কবুতর ও মই খোজ করতে থাকে। একটা টিনের ঘরের পেছনে ওরা ঠিক আগের বাড়িটার মতই দু'টো ঝুড়ি দেখতে পায়। একটা ঝুড়ির এক পাশের দড়ি ছিঁড়ে কাত হয়ে আছে। অন্যটায় কি কোনও কবুতর আছে? থাকলে তো বাক-বাকুম শব্দ করত। হয়তো বাসায় ছোট বাচ্চা বা ডিম রেখে কবুতর জোড়া কোথাও খাবারের খোঁজে গেছে?
যে ঝুড়িটা ঠিক-ঠাক দড়িতে ঝুলছে সেটাতে কী আছে অবশ্যই তা দেখা দরকার। এ-ঝুড়িটার কাছে পৌছানোর জন্য অবশ্য মইটই দরকার হলো না। পাশের একটা পেঁপে গাছে উঠে ঈমান আলী একটা কঞ্চি দিয়ে যেই না ঝুড়িতে একটা বাড়ি মেরেছে, অমনি ঝুড়ির ভেতর থেকে একটা গোখরো সাপ, হাত দেড়েক মাথা উঁচু করে কঞ্চিটাতে ছোবল মারে। 'বাবা গো' বলে ঈমান আলী তাড়াতাড়ি পেঁপে গাছ থেকে লাফিয়ে নামে।
ঈমান আলী পেঁপে গাছ থেকে নামার সময় বেশ শব্দ হয়। সেই শব্দ পেয়েই বোধহয় আগের মত কারা যেন কথা বলে ওঠে। আশপাশের কোনও ঘর থেকেই যে শব্দটা ভেসে আসছে তা বুঝতে ওদের কষ্ট হয় না। ওরা দু'জনেই পরিষ্কার শুনতে পায়, কারা গো তুমরা, আমাগের এদিক ইট্টু আসতি পারো?' ঠিক মানুষের মত কণ্ঠস্বর! তবে কী এই দিনে- দুপুরে ওরা কোনও ভূতের পাল্লায় পড়েছে? ওদের নৌকা তো ওই পাড়ায় মন্দিরের কাছে, বটগাছের নীচে বাঁধা। এক-দৌড়ে সেখানে যাবার উপায় নেই। আর ভূতের হাত থেকে দৌড়ে পালিয়ে কি বাঁচা যায়?
তবে ভূতই যদি হবে, তা হলে এতক্ষণে তারা ওদের কাছে আসছে না কেন? ওরা দু'জনেই উঠনের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় কিংবা বলা যায়, কেউ ওদের দাঁড় করিয়ে দিল। কারণ দিনের বেলা হলেও পরিবেশটা ভৌতিক। চারদিকে তখন মেঘমুক্ত আকাশের সূর্যের আলো ঝলমল করছে। বেশ কিছুটা সময় হাসান আর ঈমান দুপুর রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনও ভূত-ভূত দেখা গেল না। তবে দেখা না গেলেও ওরা সিদ্ধান্ত নিল,
আর কবুতরের সন্ধান করে কাজ নেই, এক্ষুণি ওরা বাড়ির উদ্দেশে নৌকা ছাড়বে।
ওরা যখন নৌকার দিকে যাবে বলে সামনে পা বাড়িয়েছে, তখন আবারও সেই শব্দটা হয়। মেয়েলী কন্ঠের ডাক, 'ওগো, মণিরা ভয় না পায়ে আমাগের এদিক ইট্টু আসো, আমরা মানুষ। ঘরের ভিতর আটকা পড়েছি।' এরকম কয়েকবার শোনার পরে হাসান আর ঈমান আলীর মধ্যে সাহসের সঞ্চার হলো। ওরা নিশ্চিত হলো, এটা কোনও ভূতের কন্ঠ নয়, ভূত হলে নিশ্চয় এতক্ষণ তার আলামত পাওয়া যেত।
তা হলে দেখা যাক কারা কথা বলছে। হাসান ঈমান আলীকে কথা বলতে বলে । ঈমান আলী বলে, 'আপনেরা কোন দিকি?' এবার সেই আগের কণ্ঠেই উত্তর আসে, 'পুবদিকি যে বড় নিমগাছ দেখা যাচ্ছে, সেইখানে চলে আসো।' সহসা ওদের দু'জনের মধ্যে যেন সাহস আরও বেড়ে গেল। সেই সাহসেই তারা নিম গাছের দিকে এগিয়ে চলল। নিম গাছের কাছাকাছি হতেই ওরা খেয়াল করল, একটা পাকা ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে কয়েকজন মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছে। ওরা কাছাকাছি হতেই ওদেরকে জিজ্ঞেস করা হলো, "তুমাগের বাড়ি কোন্ গিরামে?' ঈমান আলী আর হাসান তাদের কথার জবাব দিয়ে বুঝল, মানুষ ছাড়া এভাবে কেউ প্রশ্ন করতে পারে না। কারণ ভূতেদের কোনও জায়গা অচেনা থাকে না।
কিন্তু এই নির্জন পরিবেশে এই মহিলারা ঘরের মধ্যে কী করছে? একটু খেয়াল করে ওরা বুঝল, ওই মহিলারা যে ঘরে আছে, সে ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া। তাদেরকে কারা এভাবে তালা দিয়ে রেখেছে, জিজ্ঞেস করলে সেই মহিলারা জানাল, একথা তারা বলতে পারবে না, নিষেধ আছে। কারণ যে' বা যারা তাদেরকে এখানে ধরে এনে আটকে রেখেছে, তারা খুবই ভয়ঙ্কর মানুষ। তবে হাসান আর ঈমান আলী যদি ওই ঘরের বারান্দার থামের উপর থেকে চাবিটা এনে ঘরের তালা খুলে দেয়, তবে তারা সময়- সুযোগ মত পালাতে পারবে।
তাদের কথামত ঈমান আলী খোজ করে চাবির গোছাটা পেয়ে গেল। তারপর চাবি দিয়ে
ঘরের তালা খুলে দিলেও কোনও মহিলা ঘর থেকে বের হলো না, বরং খোলা দরজার পাল্লা ভেতর থেকে বন্ধ রাখার চেষ্টা করল। ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতে না পেরে ঈমান আলী জোর করে দরজা খুলতে গিয়ে বাধা পায় এবং এসময় একজন মহিলা বলে, দরজা খোলার দরকার নেই, শুধু তালা চাৰিটা জানালা দিয়ে তাদের হাতে নিলেই চলবে। ঈমান আলী চাবি সুদ্ধ তালাটা দিতে গেলে ভেতর থেকে একজন মহিলা বলে, তাদের সবারই পরনের কাপড় শয়তানেরা নিয়ে গেছে। ঈমান আলী এই অবস্থায় কি তার গামছাটা দিতে পারে? ঈমান আলী গামছাটা জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে ছুঁড়ে দেয়।
হাসান আর ঈমান নিশ্চিত হলো, ওই মহিলাদের কারোর পরনেই কাপড় নেই, তাই দরজা খুলে দিলেও কেউ বাইরে বেরুল না। ওই মহিলাদের ব্যাপারটা হাসান আর ঈমানকে ভাবিয়ে তোলে। সে ভাবনায় তাদের মাথা থেকে কবুতর খোঁজার বাসনা উধাও হয়ে গেল।
বাড়ি ফেরার জন্য ওরা যখন নৌকার কাছে ফিরছিল তখন ওদের মনে কোনও ভয় বা শংকা ছিল না। ওরা ভাবছিল হঠাৎ ওদের বয়স অনেক বেড়ে গেছে। ওরা যেন অনেক কিছুই বুঝতে শিখে গেছে। ওদের মনে আর কোনও ভয় নেই। আর সেজন্য যে-মন্দিরের কালীমূর্তির দিকে ওরা প্রথমে ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছিল, এখন ওদের মধ্যে সেই ভয় আর নেই। এবার ওরা মন্দিরের দিকে সরাসরি তাকাল।
দেখা গেল মন্দিরের মধ্যে অনেক কাপড়- চোপড় ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সবই মেয়েদের ব্যবহার্য কাপড়-চোপড়। শাড়ি- সায়া-ব্লাউজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মন্দিরের দরজাটা লোহার রেলিং দিয়ে তৈরি। সে- দরজায় কোনও তালা নেই। মন্দিরের মধ্যে কাপড়-চোপড় এভাবে পড়ে থাকতে দেখে হাসান সেগুলো সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিল । মন্দিরের লোহার রেলিং-এর দরজা ঠেলে সেই কাপড়ের স্তূপ অন্য একটা কাপড়ে বেঁধে ঈমান আলীর মাথায় তুলে দিল সে। তারপর ওরা ওই আটকে পড়া মহিলাদেরকে কাপড় দেবার জন্য ওই ঘরের দিকে চলল।


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন