আলেয়ার আলো রহস্য
আলেয়ার আলো রহস্য
কমল ধীর পায়ে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হাঁটা অবশ্য খুব সহজভাবে সম্ভব হচ্ছিল না। পরপর দোকান শুরু করে জুতা, ফলের-টুকরি, চায়ের দোকান, কী নেই ফুটপাতে? এসব এড়িয়ে, মানুষের ধাক্কা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, হাঁটতে দারুণ কসরত করতে হচ্ছে ওকে। ফুটপাতের পাশেই চওড়া নালা-ময়লা-পানি, কালো-কাদায় পরিপূর্ণ, তারই ওপর কায়দা করে বসানো কয়েকটা তক্তায় রাখা চুলোয় চায়ের দুধ জ্বাল হচ্ছে, কালো হয়ে যাওয়া কেটলিতে চা-পাতা ফুটছে। চা-ওলা ঘন সরপড়া লালচে দুধ, চামচ দিয়ে নেড়ে নিচ্ছে। এখানে মানুষের কোনও কমতি নেই, ভিড় করে সব দাঁড়িয়েছে চা খেতে । এসব চা কমল কখনও খায় না। নোংরা হাতে বানানো, ততধিক ময়লা কাপে খাওয়ার কথা বাদই গেল-বেশি চিনি ও গরুর দুধের বোটকা গন্ধযুক্ত সরভাসা প্রায়-সাদা তরল পদার্থটা খাওয়ার কথা মনে হলেই ওর বমি এসে যায়, গা ঘিনঘিন করে। 439 G C
একজন লোক প্রায় ওর ঘাড়ের ওপর এসে ধাক্কা দিয়ে নির্বিকারভাবে চলে গেল, আর একজন ওর পায়ের কাছেই একদলা থুতু ফেলল-এমন ভয়ঙ্কর জটিলতায় ওকে প্রতিদিনই পড়তে হয়। কমল থাকে সেন্ট্রাল রোডে। টিউশনি করতে যায় গ্রিন রোডে। কাছেই, তাই হেঁটেই যাওয়া-আসা করে, সুতরাং হাঁটার এই অস্বস্তিকর বিড়ম্বনা ওকে সব সময়ই সহ্য করতে হয়।
বি.বি.এ শেষ করে আপাতত টিউশনিই করছে, এম.বি.এ. করার সামর্থ্য নেই এবং আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। কমল অংক এবং ইংরেজিতে অসম্ভব ভাল, সুতরাং বেশ কয়েকটা ভাল টিউশনি পেয়েছে। চাকরি-সন্ধানের পাশাপাশি এগুলোতেই মন দিচ্ছে।
বাবা আজ ক'বছর স্ট্রোক করে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। সংসারে আছেন মা এবং ছোট দু'টি বোন ওরা স্কুলে পড়ছে। বাবা সরকারি অফিসার ছিলেন কিন্তু অসময়ে রিটায়ার করতে হয়েছে অসুস্থতার কারণে, তাঁর প্রভিডেন্ট ফাও, পেনশন এবং কমলের রোজগারে সংসার চলে আয়ের তুলনায় বায় বেশি। বাবার চিকিৎসা, বোনদের পড়ার খরচ ইত্যাদি অন্য পাঁচটা চাহিদা পূরণ করতে হিম- শিম খেতে হচ্ছে। ঢাকা শহরে নিজস্ব বাড়ি এবং কয়েকটা লোভনীয় টিউশনি থাকলে, রাজার হালে না হলেও মোটামুটি ভালভাবেই দিন চলে যায়। কিন্তু কমলরা ভাড়া বাড়িতে থাকে এবং ভাড়া বাবদ বেশ অনেকগুলো টাকা খরচ হয়। তবু সব মিলিয়ে কমল ডালই আছে। সংসারে কম-বেশি সমস্যা থাকেই সুখ শান্তিটা অনেকটাই নিজেদের ওপর নির্ভর করে। সেভাবে বলতে গেলে, কমলের পরিবারে সচ্ছলতা হয়তো নেই, কিন্তু শান্তি আছে।
দশম শ্রেণীর ছাত্র জামীর বাসায় এল কমল। এখান থেকে শুরু করে পড়ানো-সবাইকে পড়িয়ে, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা-সাড়ে দশটা হয়ে যায়। জামীকে পড়াচ্ছে, এমন সময় ওর মা এলেন। ঘরে, বললেন, কমল, তুমি বাবা, পড়ানো শেষ হলে বসার ঘরে একটু এসো, জরুরি কথা আছে তোমার সাথে।'
রাতে সবার আগে খান বাবা, কমল যখন ফেরে, বাবা তখন ঘুমিয়ে পড়েন, কিন্তু মা, বোনেরা অপেক্ষা করে কমলের জন্য, সবাই একসাথে খায়, নানারকম কথাবার্তা হয়। এই সময়টা খুব আনন্দে কাটে ওদের। খাওয়া- দাওয়া শেষে কাজ সেরে বোনেরা ঘুমাতে চলে গেলে, মাকে কথাগুলো জানাল কমল। জামীর মা দেখা করতে চেয়েছেন বাবার সাথে... কেন? একটু ইতস্তত করে কমল জানাল জামীর এক দূর সম্পর্কের খালাতো বোনের সাথে কমলের বিয়ের প্রস্তাব দিতে চান।
মেয়ে পরমাসুন্দরী। কোটিপতির একমাত্র সন্তান। মেয়ের মা মারা গেছেন অনেক আগে সংসারে শুধু বাপ আর মেয়ে, ঝামেলা নেই কোনও। মেয়েটি অবশ্য পড়াশোনা খুব বেশি করেনি, নবম শ্রেণীতে উঠে আর পড়তে চায়নি আলেয়া। দোষ অবশ্য ওর নয়, মা ছিল।
না। ব্যবসায়ী-বাবা খুব বেশি সময় দিতে পারেননি মেয়েকে, সুতরাং মেয়ে যখন যা ইচ্ছে হয়েছে, তাই করেছে- আদরের দুলালীকে কখনও বাধা দেননি বা দিতে পারেননি হাসিব খান। জামীদের বাসায় সুদর্শন, নম্র, বিনয়ী, শান্ত কমলকে দেখে খুবই পছন্দ হয়েছে ভদ্রলোকের, তাই জামীর মা'র মাধ্যমে প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
বাবা-মা সানন্দেই মত দিলেন, কিন্তু কমলের ইচ্ছে ছিল না এত ধনীর মেয়েকে বিয়ে করার তার স্বপ্নের মধ্যে শান্ত, নরম, শ্যামলা, খুব সাধারণ একটি মেয়ের ছবি আঁকা ছিল। কিন্তু মা-বাবার ইচ্ছে জেনে এবং হাসিব সাহেবের কথা শুনে আর অমত করতে পারেনি সে। হাসিব সাহেব কমলকে অনুনয়ের সুরে বলেছিলেন, “বাবা, যে বয়সে মেয়েরা মায়ের কাছ থেকে আদব-কায়দা শেখে, সেই বয়সে আলেয়া একা, আয়ার কাছে মানুষ, আমিও ওকে তেমন সময় দিতে পারিনি। মেয়েটাকে তুমি তোমার মনমত গড়ে নিয়ো, ওর কোনও ব্যবহারে কিছু মনে কোরো না। আর একটা কথা- আমার ব্যবসার ভার তোমার ওপর ছেড়ে দিয়ে এবার আমি বিশ্রাম নেব। আমার যা কিছু সব আলেয়া আর তোমার, তবে সর্বক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত তুমিই নেবে-তোমার ওপরে কথা বলার কেউ থাকবে না। আমার মেয়েটা একটু উচ্ছৃঙ্খল- আমার ওপর বড় অভিমান ওর আমাকে কথা দাও বাবা, ওকে তুমি সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে... আমার বড় আদরের সন্তান,' বলতে বলতে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। বিব্রত কমল দ্বিতীয়বার চিন্তা করার সময় পায়নি। কথা দিয়েছিল সে। হাসিব সাহেবের আরও একটা অনুরোধ ছিল কমলের কাছে। মেয়েকে ছাড়া তিনি থাকতে পারবেন না। তাঁর এত বড় বাড়ি-কমলরা সবাই এসে থাকলে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন ।
এই কথায় কমল সহজে রাজি হতে পারেনি, আবার তাঁর মুখের ওপর না করতেও পারেনি-শুধু মৃদু স্বরে বলেছিল, 'মা-বাবা রাজি হবেন না।'
হাসিব সাহেব কমলের অসুবিধে বুঝেছিলেন, কাতর মিনতি করে বলেছেন, 'আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তোমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, আমি জোর করব না, বাবা,
আমাকে একা হতে দিয়ো না। শোনো, আমার যা কিছু, সে তো তোমারই, আর তোমার ওপর অধিকার তোমার পরিবারের, সুতরাং এতে অন্যায় বা ছোট হওয়ার প্রশ্ন নেই।'
খুব জাঁকজমকের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। বাসরঘর সাজানো হয়েছে বাড়ির সেরা কামরায় কাঁচা ফুলের সৌরভে সুরভিত। কমলের দু'চারজন বন্ধু এসেছিল বিয়েতে, তারা ঠাট্টা করল-রাজত্বসহ রাজকন্যা পেল। ভীষণ সৌভাগ্যবান ইত্যাদি।
মুখে হাসি থাকলেও, মনে-মনে খুশি হতে পারছে না কমল, তার কেবলই মনে হতে লাগল, কোথাও হয়তো ভুল হয়েছে, তার যে স্বপ্ন ছিল...থাক, যে স্বপ্নই দেখে থাকুক, এখন সে বিবাহিত। শুভদৃষ্টির সময় আলেয়াকে দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল তার এত রূপ! তবু খুশি হওয়ার বদলে তার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল । একটু দেরি করে কমল বাসর ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল-দুরুদুরু বুক, ঘামে ভেজা মুখ, তারই নববধূ, রানির সাজে সেজে বসে আছে পালঙ্কে তার প্রতীক্ষায়-পাতলা ওড়নায় অনবদ্য মুখশ্রী ঢেকে ।
দরজা ভিড়ানো ছিল, আস্তে ঠেলা দিতেই খুলে গেল। অবাক কমল দেখল, সাজানো পালঙ্কশূন্য-কেউ নেই সেখানে। গেল কোথায় আলেয়া! ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ঘুরতেই নজরে পড়ল । ড্রেসিং-টেবিলের সামনে বসে আছে সে। নববধূর সাজ খুলে ফেলেছে-পরনে অত্যাধুনিক স্বচ্ছ নাইটি, মুখে লোশন মাখছে, গুচ্ছ গুচ্ছ রেশম লালচে বাদামি চুল পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো। কমলকে দেখে হাসি ফুটল আলেয়ার মুখে, অপূর্ব হাসি। নববধূর জড়তা, লজ্জা কিছুই নেই আচরণে। সপ্রতিভ ভঙ্গিতে স্বামীকে বলল, 'হা-ই।'
চমক আরও বাকি ছিল-ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা একটা সুদৃশ্য গ্লাসে সোনালি পানীয় টলটল করছে-আধ গলা বরফের টুকরো ভাসছে ওতে এবং গ্লাসটা অনেকখানি খালি। স্তম্ভিত কমলের হৃদয়ে কোনটা বেশি আঘাত করল, সেটা বেচারা বুঝতে পারল না, সম্বিত ফিরল ঝাঁঝাল কণ্ঠের সুরে 'কী ব্যাপার, ওইখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? আজ আমাদের বাসর রাত। জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত। তাই না? সেলিব্রেট করব বলে অপেক্ষা
করছি এতক্ষণে এলে? অবশ্য মা, বোনদের সবশুদ্ধ ঘাড় থেকে নামাবে আগে, তবে না আসবে? রাবিশ, বাবা যে কেন বাড়িতে.... যাকগে, কী খাবে বলো-হুইস্কি, জিন, রাম? বিয়ারও আছে, তবে ওটা আমার পছন্দ নয়। শ্রেফ চিরতার পানি কী করব, বন্ধু-বান্ধবদের জন্য সবরকম রাখতে হয়.... কথা বলতে বলতেই উঠল আলেয়া। ঘরের কোণে ছোট একটা ফ্রিজ রাখা, ওটা খুলল । থরে থরে বিভিন্ন সাইজের বোতল সাজানো, হাতে আর একটা গ্লাস নিয়ে সপ্রশ্নে চাইল কমলের দিকে, কই গো, বললে না, কী নেবে?'
পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেল কমলের, বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠল-ভৌতিক আঁধারে ঝলসে ওঠা আলোর মতই আলেয়া তার জীবনে মিথ্যে হয়ে গেল, এই আগুনের ফুলকিকে তার শুধরাতে হবে। গড়ে নিতে হবে মনের মত করে! পারবে তো সে! সম্ভব হবে? না, পারতেই হবে তাকে, একজন ভাল মানুষকে সে দিয়েছে-একজন পিতার মনের যন্ত্রণা দূর কথা করতেই হবে। গম্ভীর মুখে কমল বলল, 'তুমি মদ খাও?' খিলখিল করে হেসে উঠল আলেয়া। 'না,
মদ খাই না সবকিছু ভুলে থাকার জন্য ওষুধ খাই বাদ দাও, কোনটা দেব, বল?' রূপসী স্ত্রীর প্রতি বিষিয়ে যাওয়া অন্তর
নিয়ে বিছানায় বসল কমল, তারপর গম্ভীর মুখে বলল, 'নো, থ্যাঙ্কস, আমি ড্রিংক করি না।'
শুনেই মুখ বাঁকা করল আলেয়া, 'আ-চ্ছা, নিরামিষভোজী পদার্থ; না? আমার স্বামী হওয়ার যোগ্যতা তোমার নেই, সেটা জানতাম-মিডলক্লাস মেন্টালিটি। বাবাকে মানা করেছিলাম, একরকম জোর করেই বিয়ে দিলেন, এমনিতে বাবার ওপর আমার কোনও আগ্রহ নেই-তিনি শ্রেফ আমার আরাম- আয়েশের যোগানদার। তাই তাঁকে চটাতে চাইনি-তা ছাড়া তাঁর পছন্দ মত বিয়ে না করলে সম্পত্তি দেবেন না, হুমকি দিলেন, তাই... যাকগে...' কথা থামিয়ে গ্লাসে চুমুক দিল আলেয়া।
মন্ত্রমুগ্ধের মত বোকা হয়ে স্ত্রীর কথা শুনছিল
কমল, এবার সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করল,
'এইসব কথা আমাকে বলছ কেন? আজকের রাতে কেউ মন খারাপ হওয়া কথা বলে नो....
আর একটা দীর্ঘ চুমুক দিয়ে গ্লাসটা প্রায় খালি করে ফেলল আলেয়া, তারপর হেঁচকি তুলে টলোমলো পায়ে হেঁটে এসে কমলের পাশে বসে পড়ল। হাসতে হাসতে বলল, 'হ্যাঁ, আর একটা কথা বলা দরকার-শুনবে? শুনেছি, স্বামীর কাছে কিছু গোপন করতে হয় না। দেখো, দোষ কিন্তু ঠিক আমার নয়-রোজ মদ খেয়ে অত নাচানাচি করলে যা হয় কিছু বয়ফ্রেণ্ড আছে আমার, নেশার ঘোরে তাদের পাল্লায় পড়লাম, অবশ্য ব্যাপারটা আমাকে প্রচণ্ড আমোদ দিত, এখন তো রীতিমত আকর্ষণ বোধ করি, মানে... বিশুদ্ধ কুমারী নই আমি। তবে আমি বলব- এটাকে সহজ ভাবেই নাও, আজকের যুগে কে অত সংস্কার মানে?'
মাথায় যেন বাজ পড়ল কমলের বলে কী এই মেয়ে! অসামান্য রূপের আড়ালে এমন কদর্য, কুৎসিত মানসিকতা! শরীরটা ঘিনঘিন করে উঠল কমলের, স্বচ্ছ নাইটিতে অশ্লীলভাবে প্রকট তনুতট দেখে বমি লাগল ওর-এই নারী আমার স্ত্রী? শিউরে উঠে সরে বসল সে, তাই দেখে হেসে উঠল আলেয়া,
'ননসেন্স, আমাকে ঘৃণা করছ তুমি! এ-ত বড় সাহ... আর বলতে পারল না সে, ধপাস করে বিছানায় এলিয়ে পড়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
ব্যর্থ-বাসরে স্তব্ধ কমল বাকি রাতটা আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল, ঘুম এল না দু'চোখে।
শ্বশুরের আগ্রহে মধুচন্দ্রমায় যেতে হলো, অবশ্যই দেশের বাইরে, বিদেশে পৌঁছে আরও উদ্দাম, বেপরোয়া হয়ে গেল আলেয়া । প্রতিদিন লেট-নাইট ডিস্কো, নতুন বন্ধু-বান্ধব জুটিয়ে চুটিয়ে স্ফূর্তি। শপিং ইত্যাদিতে টাকার শ্রাদ্ধ করে ফিরে এল ধনীর দুলালী। সব ভুলে কমল স্ত্রীকে বোঝাতে চেষ্টা করল, কিন্তু আলেয়ার পরিবর্তন হলো না। কঠিন মুখে জবাব দিল, "তুমি প্রথম রাতে ঘৃণা করে আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছ, খবরদার, আমার কাছে আসার চেষ্টা কখনও কোরো না- একবারও ভাবলে না, মিথ্যে কথাও তো বলতে পারি? বা তোমার সাথে তামাশা করেছি?'
শান্ত স্বরে কমল বলে, 'অত ভয়াবহ তামাশা কেউ প্রথম রাতে স্বামীর সাথে করে
না-মিথ্যে নয়, সব সত্যি বলেছ। হানিমুনে গিয়ে ভাল করেই তার নমুনা দেখেছি। তোমার বাবাকে আমি কথা দিয়েছি। তোমাকে এই পঙ্কিল-পথ থেকে ফিরিয়ে আনব, কীভাবে সম্ভব জানি না। তবু আমি চেষ্টা করব।'
রেগে আগুন আলেয়া, 'আমার বাপের পয়সায়। আমি জাহান্নামে যাই, তোমার কী? শ্বশুরের পয়সায় গুষ্টিসুদ্ধ মৌজ করছ, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো। আমার ওপর খবরদারি করতে এসো না।'
কমল ব্যবসার ব্যাপারে দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিল কিন্তু আলেয়াকে কোনও মতেই বাগ মানাতে পারল না, সে পুরোপুরি লাগামছাড়া হয়ে গেল। হাসিব সাহেব কমলের কর্মদক্ষতায় খুশি হলেন, কিন্তু মেয়েকে নিয়ে শাস্তি পেলেন না-কমল তাঁকে ধৈর্য ধরতে বলল। সান্ত্বনা দিল, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বেলা বারোটার সময় ঘুম থেকে উঠে আয়েস করে নাস্তা খেয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল আলেয়া, এমনসময় কমল এসে ঢুকল ঘরে। সেদিন সে ইচ্ছে করেই বের হয়নি, স্ত্রীর সাথে কথা বলবে। কমল কিছুক্ষণ দেখল আলেয়াকে। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পোশাক পরনে তার । কড়া প্রসাধনীতে মুখের কমনীয়তা ঢাকা পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমল বলল, “তুমি নিজেকে কোনওদিন স্বাভাবিক, সাধারণ বেশে দেখেছ? আমার বিশ্বাস, তোমাকে অনেক ভাল লাগবে দেখতে। এইসব পোশাকে বাইরে যাও, মনে করো তোমাকে খুব ভাল দেখায়?'
স্থির-শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আলেয়া বলল, 'এসব কথা কোন্ অধিকারে বলছ?'
'স্বামীর অধিকারে।' “স্বা-মী! বেশ, তোমার আর কিছু বলার
আছে?' 'হ্যাঁ, আলেয়া, লক্ষ্মীটি, একবার তোমার বাবার কথা ভাব, তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছেন তোমার জন্য। ফিরে এসো ওই পথ থেকে, যা হয়ে গেছে, সব ভুলে যাও... এসো আমরা নতুন জীবন শুরু করি, কেমন?'
গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়াল আলেয়া। ওর প্রসাধন শেষ। 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে,' বলে উদ্ধত, দৃঢ় পদক্ষেপে কমলকে ধাক্কা দিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল ।
না-মিথ্যে নয়, সব সত্যি বলেছ। হানিমুনে গিয়ে ভাল করেই তার নমুনা দেখেছি। তোমার বাবাকে আমি কথা দিয়েছি। তোমাকে এই পঙ্কিল-পথ থেকে ফিরিয়ে আনব, কীভাবে সম্ভব জানি না। তবু আমি চেষ্টা করব।'
রেগে আগুন আলেয়া, 'আমার বাপের পয়সায়। আমি জাহান্নামে যাই, তোমার কী? শ্বশুরের পয়সায় গুষ্টিসুদ্ধ মৌজ করছ, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো। আমার ওপর খবরদারি করতে এসো না।'
কমল ব্যবসার ব্যাপারে দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিল কিন্তু আলেয়াকে কোনও মতেই ৰাগ মানাতে পারল না, সে পুরোপুরি লাগামছাড়া হয়ে গেল। হাসিব সাহেব কমলের কর্মদক্ষতায় খুশি হলেন, কিন্তু মেয়েকে নিয়ে শাস্তি পেলেন না-কমল তাঁকে ধৈর্য ধরতে বলল। সান্ত্বনা দিল, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বেলা বারোটার সময় ঘুম থেকে উঠে আয়েস করে নাস্তা খেয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল আলেয়া, এমনসময় কমল এসে ঢুকল ঘরে। সেদিন সে ইচ্ছে করেই বের হয়নি, স্ত্রীর সাথে কথা বলবে। কমল কিছুক্ষণ দেখল আলেয়াকে। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পোশাক পরনে তার । কড়া প্রসাধনীতে মুখের কমনীয়তা ঢাকা পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমল বলল, যাও, মনে করো তোমাকে খুব ভাল দেখায়?” স্থির-শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে
“তুমি নিজেকে কোনওদিন স্বাভাবিক, সাধারণ বেশে দেখেছ? আমার বিশ্বাস, তোমাকে অনেক ভাল লাগবে দেখতে। এইসব পোশাকে বাইরে
আলেয়া বলল, 'এসব কথা কোন অধিকারে
বলছ?"
'স্বামীর অধিকারে।'
“স্বামী। বেশ, তোমার আর কিছু বলার আছে?'
'হ্যাঁ, আলেয়া, লক্ষ্মীটি, একবার তোমার বাবার কথা ভাব, তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছেন তোমার জন্য। ফিরে এসো ওই পথ থেকে, যা হয়ে গেছে, সব ভুলে যাও... এসো আমরা নতুন জীবন শুরু করি, কেমন?' গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়াল আলেয়া। ওর
প্রসাধন শেষ। 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, বলে
উদ্ধত, দৃঢ় পদক্ষেপে কমলকে ধাক্কা দিয়ে পাশ
কাটিয়ে বেরিয়ে গেল ।
'স্যর, স্যর... উঠুন সার... জামী মৃদু ধাক্কা দিতে থাকে কমলকে... কী হয়েছে স্যর, সার...' জামীর উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর। কমল চমকে সোজা হয়ে. বসল। পড়াতে পড়াতে কখন যেন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিহ্বল, ঘোলাটে দৃষ্টিতে জামীর দিকে চেয়ে থাকল সে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে, কোথায়, কী অবস্থায় আছে সে। জামী ভয় পেয়ে বলল, 'স্যর, আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?'
ধীরে ধীরে ঘোর কাটল কমলের। দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে-জামীকে রচনা লিখতে দিয়ে, কমল স্বপ্নে, নাকি দুঃস্বপ্নে হারিয়ে গিয়েছিল?! অন্য জগতে বিভোর হয়ে গিয়েছিল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, শরীর অবশ-দুর্বল-কণ্ঠে বলে কমল, না, আমি ঠিক আছি। আজ যাই, হোমওয়ার্কগুলো করে রেখো।' উঠে দাঁড়াতেই গোটা ঘরটা যেন দুলে উঠল। বিস্মিত কমল ভাবল হচ্ছে কী তার? এ কী অনাসৃষ্টি কাণ্ড! এত অল্প সময়ের মধ্যে কী দেখল সে? তার ভবিষ্যৎ! কেন! কে আলেয়া... এমন অপার্থিব অলৌকিক ঘটনা কি আদৌ ঘটে মানুষের জীবনে? নিয়তির এই ইশারায় কী বুঝবে সে! এলোমেলো পারে এগোতে লাগল কমল। পেছন থেকে জামী বলে, 'স্যর, মা
জাপনার জন্য ড্রয়িং-কামে অপেক্ষা করছেন।' অবসাদগ্রস্ত দেহমন নিয়ে আর একটুও এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না। তবু ড্রয়িং- রুমে এল। কেউ নেই... সোফায় গিয়ে চুপচাপ বসল কমল-তীব্র পানি পিপাসা পেয়েছে তার, কিন্তু কাউকে ডাকতে ইচ্ছে করল না-সত্যি কি ঘুমের মধ্যে ওই অদ্ভুত ঘটনাগুলো ঘটেছে? এত বাস্তবভাবে! অর্থ কী এই রহস্যের? স্থবির, আড়ষ্ট হয়ে বসেই রইল কমল। এমন সময় জামীর মা এলেন এবং আশ্চর্য তাঁর হাতে
পানির গ্লাস। তাকে দেখে কমল উঠে দাঁড়াতেই খুব কোমল কণ্ঠে জামীর মা বললেন, 'বসো, বাবা, পানি নাও।'
তৃষ্ণার্তের মত পানি পান করল কমল- খানিকটা সুস্থ বোধ করল। তারপর শুনল, জামীর মা বলছেন, 'তোমার মুখ-চোখ কেমন দেখাচ্ছে, কী হয়েছে, বাবা? তুমি সুস্থ তো?' সে ঠিক
বিব্রতভাবে বলে কমল,
আছে...অতঃপর শুনল, তিনি বলছেন...
বেশিক্ষণ তোমাকে আটকাব না, শোনো... জামীর খালাতো বোন, মা অনেক আগেই মারা গেছেন, বাবা ব্যস্ত-ব্যবসায়ী। মেয়েকে সময় দিতে পারেন না, পড়াশোনায় মন নেই মেয়ের ওর বাবা একজন ভাল শিক্ষক চাইছেন, তোমার কথা বলায় তিনি সানন্দে রাজি হয়েছেন। কমল, কখন সময় দিতে পারবে...' আরও কিছু বলতে লাগলেন তিনি, কিন্তু সেসব আর কানে ঢুকল না কমলের... সে তখন তাকিয়ে আছে ঘরের অন্যপাশের দরজার দিকে-সেখানে এই মাত্র একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিস্ফারিত, আতঙ্কিত দৃষ্টিতে দেখছে কমল মেয়েটিকে অসম্ভব রূপসী, সাবলীল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে স্বপ্নে যাকে দেখেছিল, যার জন্য জীবন তার দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল-এই সেই মেয়ে... হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে ডানাকাটা পরীটি।
সস্নেহে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসলেন
জামীর মা, 'কমল, ওর কথাই বলছিলাম
তোমাকে, আমার বোনের মেয়ে, ওকেই পড়া-
বার কথা... আয়, আলেয়া... আলেয়া। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো যেন কমল-সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কমল। দুজন হতভম্ব মানুষকে পেছনে রেখে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে, বলে গেল, 'আমাকে মাফ করবেন, আমি পারব না। বাইরে এসে নির্মল বাতাসে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্বস্তির পরশে শান্ত কমল দীর্ঘ পদক্ষেপে হাঁটতে লাগল-দ্রুত, প্রায় দৌড়াতেই লাগল... যেন ভূতে তাড়া করেছে তাকে।
জাগীদের বাসায় আর কখনও যায়নি কমল। পাওনা বেতন নিতেও নয়। টিউশনি করাই ছেড়ে দিয়েছে সে। আলেয়ার ভৌতিক আলোয় সে আচ্ছন্ন, বিভ্রান্ত-তা ছাড়া ভাল চাকরি পেয়েছে। মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করল- বোন দু'টিকে যত্ন করে পড়াবে। পড়া শেষে ভাল ঘর, বর দেখে বিয়ে দেবে কিন্তু নিজে সে কখনও বিয়ে করবে না। কোনও আলেয়া তার জীবনের স্বাভাবিক সুখ-শান্তি যেন নষ্ট করতে না পারে।
আশ্চর্যের ব্যাপার-জীবনে সে আর কখনও আলেয়াকে স্বপ্নে দেখেনি।


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন