Header Ads

Header ADS

অজানা রোগ

 অজানা রোগ 

সা মনে যে ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা, তা আসওয়ানকে দেখলে একেবারেই মনে হয় না। দু'মিনিট পরপরই বেজে ওঠে তার মোবাইলফোন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় নতুন প্রেমিকার সাথে গল্প করে। কী এত গল্প করে, কে জানে! মেয়েটা আমাদের মেডিকেলেরই দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। একমুহূর্তের জন্য মোনালিসার ফোনটা বন্ধ পেলে অস্থির হয়ে ওঠে আসওয়ান। একদিন একটা নাম্বার দিয়ে বলল, 'দোস্ত, এই নাম্বারটায় একটা কল দিয়ে দ্যাখ না, তোর মোবাইল থেকে, কল যায় কি না?’ মুচকি হেসে বললাম, 'কী! মোনালিসার নাম্বার?

লাজুক হেসে আসওয়ান বলে, 'হুম।' ফোন দিলাম, কিন্তু অপারেটর জানাল ফোনের মালিক সিমটা বন্ধ করে রেখেছেন । বিকেল বেলা লন্ড্রিতে ধুয়ে ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট পরে নতুন কেনা পারফিউমটা লাগাচ্ছিল আসওয়ান। কোথায় যাচ্ছে প্রশ্ন করতেই বলল, মোনাকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছে।

আগামীকাল মেডিসিন ওয়ার্ড ফাইনাল, মোনালিসার জন্য সেটাও ভুলতে বসেছে আমার

রুমমেট!

"আচ্ছা, রোজ রোজ এমন কোথায় যাস তোরা, কখনই একঘেয়ে লাগে না?' ভুরু কুঁচকে একদিন জিজ্ঞেস করে দোহা। ফেলল

আসওয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সযত্নে চুলটা আঁচড়াতে-আঁচড়াতে বলে, *প্রেমিক-প্রেমিকারা যেসব জায়গায় ঘুরতে

যায়, সেসব জায়গায় যাই।' সত্যিই আসওয়ানের সুখী সুখী টেনশনমুক্ত জীবনযাপন দেখে আমাদেরও

মাঝে মাঝে খুব প্রেম করতে ইচ্ছে

হত! ছাত্রনিবাস থেকে ছাত্রী হোস্টেলটা ক্যাম্পাসের মাত্র দুটো ব্লক পরেই। মাস, দুয়েক ধরে রোজ সকালে নিয়ম করে লেটার বক্সে আসওয়ানের নামে নীল খামে ভরা প্রেমপত্র আসে মোনালিসার কাছ থেকে। আমাদের গায়ে জ্বলুনি ধরিয়ে প্রতিদিন চেয়ারে বসে দুলে-দুলে চিঠি পড়ে আসওয়ান আর মিটিমিটি হাসে । উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখে নিয়েছি, চিঠিতে হাতের লেখা যেন মুক্তোর মত ঝকঝকে। ভালমত দেখতে না পেলেও কেন যেন হাতের লেখাটা খুব পরিচিত মনে হত! মাঝে-মাঝে কৌতূহলে জিজ্ঞেস করে ফেলি, 'সারারাত ফোনে কথা বলার পর, ভোরবেলা কী এত লিখে পাঠিয়েছে রে, মোনালিসা?'

আসওয়ান নীরব হেসে বলে, 'প্রেমপত্রে যা লেখা যায়, তাই লিখেছে।'

এভাবেই কাটছিল ফাইনাল ইয়ারের আসওয়ান আর সেকেণ্ড ইয়ারের মোনালিসার মধুময় প্রেমময় দিনগুলো। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বিধ্বস্ত অবস্থায় রুমে ঢুকল আসওয়ান । আমি আর রিংকু পড়া তৈরি করছিলাম। হাসি-খুশি আসওয়ানের বিমূর্ত রূপ দেখে পড়া ছেড়ে

তড়িঘড়ি ছুটে এলাম, 'কী রে, দোস্ত, কী হয়েছে?"

'দোস্ত, মহা সমস্যায় পড়েছি রে. আবেগে আমার হাত জড়িয়ে ধরল

আসওয়ান।

'কী হয়েছে?' প্রশ্ন করলাম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে । "দোস্ত: মোনালিসা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমি কী করব রে? বলেই ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল আসওয়ান।

"তোকে ছেড়ে চলে গেছে মানে!' আকাশ থেকে পড়লাম যেন আমি আর রিংকু। গতকালও তো ওরা সারারাত ফোনে কথা বলল। ভোরবেলা নিয়ম করে চিঠিও এল নীল খামে ভরে। এখন আবার কী হলো?

আসওয়ান বাচ্চাদের মত ডুকরে উঠে বলল, 'হ্যাঁ, দোস্ত, আজ ওকে রিকশায় করে অরিত্রর সাথে বেড়াতে যেতে দেখলাম । মোনা অরিত্রর হাত ধরে হেসে হেসে কথা বলছিল।"

আজব তো! আসওয়ানের সাথে সম্পর্ক থাকাকালীন সময়ে মোনা থার্ড ইয়ারের অরিত্রর হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর সাহস পায় কী করে? দাঁড়া, অরিত্রকে আমি ক্যাম্পাস ছাড়া করছি।' চিৎকার করে উঠল আমাদের পলিটিশিয়ান বন্ধু নাহিদ। পরদিনই যে অরিত্রকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল, তা সার্জারি ওয়ার্ডে OT তে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই জেনে গিয়েছিলাম।

দুপুরে রুমে ফিরে প্রতিদিনের মত আজও আসওয়ানের হাসি হাসি মুখে নতুন শার্ট পরে চুল আঁচড়ানোটা চোখে পড়তেই ভাল লেগে গেল। যাক, রুমমেটের মুখে হাসি ফুটেছে অন্তত। মোনালিসার মত ছেলে

মোরানো মেয়েগুলোকে শাস্তি দেয়া গেলে খুব

ভাল হত । মাগরিবের আজানের শব্দে ঘুম ভাঙল আমার। এতক্ষণ কী হিসেবে ঘুমালাম। বুঝলাম না। মেজাজটা প্রচণ্ড গরম হয়ে আছে। শার্ট গায়ে দিয়ে চায়ের দোকানের দিকে পা বাড়াতেই চমকে উঠলাম। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মোনালিসা। কিন্তু আশপাশে কোথাও আসওয়ানকে দেখতে পেলাম না। তা হলে কি আসওয়ানের কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটা জানাতে মেয়েটা আমাদের হোস্টেলের গেটে দাঁড়িয়ে আছে?

আমাকে দেখেই মোনালিসা সামনে

এগিয়ে এল। অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে

উঠল আমার। 'এক্সকিউজ মি, সজীব ভাইয়া, আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি? অনুরোধের সুর মেয়েটার গলায়।

আমি মাথা নেড়ে সায় জানাতেই যেন হঠাৎ করে এক ঝাঁক অভিমান বর্ষিত হলো সুন্দরী মেয়েটার গলা দিয়ে। বলল, 'আচ্ছা, আপনার রুমমেটের প্রবলেমটা কি একটু বলবেন? সে আমার Boy friend এর পেছনে কেন লেগেছে? অরিত্রর দোষটা কী, তাকে পলিটিকাল নেতা দিয়ে মার খাইয়ে হসপিটালে ভর্তি করা হলো?'

Boy friend, রুমমেট, অরিত্র- সবগুলো শব্দ যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গুলিয়ে যাচ্ছিল আমার মাথায়। চিৎকার করে বললাম, 'কী সব আবোল-তাবোল বলছ? তোমার Boy friend কে, লিসা?'

ঝাঁঝালো গলায় মেয়েটি বলল, 'অরিত্র আমার Boy friend'

'আচ্ছা, তাই?' ঠোঁট টিপে বললাম,

'তোমার প্রেমিক যদি অরিত্র হবে, তা হলে

সারারাত আসওয়ানের সাথে মোবাইলে কথা বল কেন? রোজ ভোরবেলা ওকে নীল খামে চিঠি পাঠাও কেন? প্রতিদিন বিকেলে ঘটা করে ওর সাথে বেড়াতে যেতে লজ্জা করে না তোমার?'

'লজ্জা আমার না, আপনাদের করা উচিত। আমি কখনোই আসওয়ান ড়াইয়াকে ফোন করি না, আর চিঠি লেখা, ঘুরে বেড়ানো তো অনেক দূরের কথা।' প্রতিবাদ করল মোনালিসা।

এবার মেয়েটার প্রতি রাগের বদলে সহানুভূতি জন্মাল। নরম গলায় বললাম, দ্যাখো, আপু, প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে ছোট-খাটো ঝগড়া হতেই পারে। তাই বলে তুমি আসওয়ানের সাথে রিলেশন ভেঙে দেবে?'

"আশ্চর্য। আসওয়ান ভাইয়ার সাথে তো আমার কোনও রিলেশনই নেই! ভেঙে দেব কীভাবে? বিরক্তি ঝরল মোনার কণ্ঠে।

'আচ্ছা. আপু, আজ আসওয়ান আর তুমি কোথায় ঘুরতে বেরিয়েছিলে?' নরম সুরে প্রশ্ন করলাম ।

মোনালিসা চরম রেগে বলল, 'আমি কেন আসওয়ান ডাইয়ার সাথে বেড়াতে যাব? আজব! আমি সারা বিকেল হসপিটালে ছিলাম, অরিত্রর পাশে! শুনুন, আপনারা অরিত্রর পেছনে লাগা ছেড়ে দিন, Please।' এই বলে গটগট করে চলে গেল মোনালিসা, আমাকে অবাক করে দিয়ে।

চায়ের তৃষ্ণা পালিয়ে গেল। রুমে ফিরে বারবার শুধু মোনালিসার কথাগুলোই কানে বাজছিল। কী মনে করে ফোন দিলাম আসওয়ানকে। ওপাশ থেকে ভেসে এল। আসওয়ানের উত্তেজিত কন্ঠস্বর, "হ্যাঁ, দোস্ত, বল।"

“তুই এখন কোথায়?' জিজ্ঞেস করলাম। 'কোথায় মানে? এটা আবার বলতে হবে? মোনালিসাকে নিয়ে বাদাম খাচ্ছি।'

টাশকি খেলাম রীতিমত। 'মোনালিসাকে

নিয়ে বাদাম খাচ্ছিস?'

'হ্যাঁ,' ভাবলেশহীন কণ্ঠ আসওয়ানের। কী ভেবে বললাম, মোনাকে একটু ফোনটা দে তো?'

"ও তোর সাথে কথা বলবে না রে, দোস্ত, অনেক লাজুক তো, ছাড়ছি, বাই। আমাকে চিন্তায় ফেলে ওপাশ থেকে কলটা কেটে দিল আসওয়ান।

দোহা, নাহিদ আর রিংকুকে রুমে ডেকে সব খুলে বললাম। দোহা বলল, 'আমি প্রায়ই আসওয়ানকে বিকেলবেলা পার্কের বেঞ্চে বসে বাদাম, আইসক্রিম এসব খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ওর পাশে কখনও কাউকে দেখিনি!'

“তুই শিওর, ওর পাশে কেউ থাকে না!' - উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। দোহা মাথা নেড়ে সায় দিল।

বহুদিন আগে আসওয়ানের দেয়া মোনার নাম্বারটিতে কল দিলাম। যা জানার, মোনার কাছ থেকেই জানতে হবে। রিং হচ্ছে ওপ্রান্তে। অপেক্ষা করছি, মিষ্টি মেয়েলী কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। ঠিক এমন সময় ঘরের কোথাও আমাদের কারও মোবাইলের রিঙটোন বেজে উঠল। দোহা, রিংকু, নাহিদ প্রত্যেকেই মোবাইল বের করে দেখল, ওদের কারও ফোনে কল আসেনি। তার মানে রুমের ভেতরেই অন্য একটি মোবাইল বাজছে। নাহিদ রিঙটোন অনুসরণ করে এগিয়ে গেল আসওয়ানের বিছানার দিকে। বালিশটা সরাতেই খুঁজে পেল একটা নোকিয়া ১১০০। মোবাইলটা যখন নাহিদের হাতের

মুঠোয়, তখন অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, ওই মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে থাকা নাম্বারটির সাথে আমার সিম নাম্বার হুবহু মিল। তার মানে, আসওয়ানের দেয়া নাম্বারটা মোনালিসা নামের কোনও মেয়ের নাম্বার নয়, নাম্বারটা আসওয়ানের নিজেরই। আসওয়ানকে কোনও মোনালিসা ফোন দেয় না। আসওয়ান নিজেই এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে ফোন দিত এতদিন!

খুব দ্রুত পড়ার টেবিলের ড্রয়ার ঘেঁটে নীল খামে ভরা চিঠিগুলো বের করলাম। এতদিন অবচেতন মন ব্যাপারটা ধরতে না পারলেও, আজ ঠিকই বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলাম, চিঠিগুলোর হাতের লেখা, আসওয়ানের হাতের লেখার সাথে হুবহু মিল । শুধু আকার-ওকার-এ টানগুলো একটু বড় করে রয়েছে। তার মানে, চিঠিগুলো কোনও মোনালিসার লেখা নয়। আসওয়ান নিজেই নিজেকে চিঠি লিখে প্রতি রাতে সবার অগোচরে লেটার বক্সে ফেলে রেখে যেত এতদিন!

আমরা চারজন মুঠো ভর্তি করে আসওয়ানের নীল চিঠিগুলো আর মোবাইল ফোন নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি। কারণ, সব ঘটনা এটাই প্রমাণ করছে যে, আমাদের প্রিয় বন্ধু, আমার রুমমেট এক ভয়াবহ মানসিক রোগে আক্রান্ত-Thought disorder! এসব রোগীরা যাকে ভালবাসে, যখন জানতে পারে, তাকে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই, তখন নিজে নিজেই ভালবাসার মানুষটিকে নিয়ে একটা কল্পনার জগৎ গড়ে তোলে, কল্পনার জগত্‍টাকে বাস্তব বলে প্রমাণ করতে চায়। আসওয়ানেরও একই অসুখ হয়েছে। এ অসুখ থেকে কী করে ফেরাব ওকে আমরা?


কোন মন্তব্য নেই

  [ছেলোদের পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের ২য় তলায়, তারিখ- ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং মেয়েদের পরীক্ষা মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ এর প...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.