Header Ads

Header ADS

অদৃশ্য বন্ধু

 অদৃশ্য বন্ধু 

উৎ কট গন্ধটা এই প্রথম পেল সে, এমন নয়। এর আগেও আরেকবার পেয়েছে শফিক। বাসায় ঢোকার আধঘণ্টার মধ্যেই প্রথম বার এই গন্ধটা তীব্রভাবে তার নাকে লেগেছিল। কিন্তু তখন বিষয়টাকে তেমনভাবে আমল দেয়নি সে। ভেবেছিল, আশপাশের কোথাও থেকে গন্ধটা হয়তো আসছে।

আজই দুপুরে এই বাসার বাসিন্দা হয়ে শফিক উঠেছে। মূল রাস্তা থেকে ভেতরে বলে বাসার ভাড়া তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে বাসার পরিবেশটা চমৎকার। গাছগাছালিতে ভরা নিরিবিলি একটা বাসা। প্রথম দেখাতেই শফিকের খুব মনে ধরেছে বাসাটি।

এখানে এসে এমন সুন্দর বাসা পেয়ে যাবে, তা আগে ধারণাও করেনি শফিক। তিন রুমের হাফ বিল্ডিং, সামনে ও পেছনে গ্রিল দেয়া বারান্দা।

যদিও তিন রুমের বাসার কোনও দরকার নেই তার,তবুও এত কম ভাড়ায় বাসাটি দিচ্ছে বলে সে সাথে সাথে নিয়ে নিয়েছে। অথচ এই বাসাই কিনা অনেক দিন ধরে খালি পড়ে ছিল। বাসা যে এখনও মানুষজনে ভরপুর থাকবে, তা নয়। শফিক একাকী মানুষ। সারাদিন তার

কাটবে অফিস করে। বলতে গেলে, রাতে বাসায় ফিরে সে শুধু ঘুমোবে।

অফিসের এক সহকর্মী বলেছেও এ কথা, 'আপনি একা মানুষ, এই বাসা নিয়ে কী করবেন! বাসা তো দরকার আপনার শুধু

ঘুমানোর জন্যে

কথা সত্য। কিন্তু তারপরেও তো বাসা বলে কথা। বাসা মনের মত না হলে, সেখানে কি আরাম করে থাকা যায়। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো বাসার ভাড়া। এই ভাড়ায় এমন বাসা পাওয়া রীতিমত সৌভাগ্যের ব্যাপার।

উৎকট গন্ধটা তীব্র হচ্ছে। গন্ধটা আসছে পাশের রুম থেকে। শফিক পাশের রুমটিতে গেল।

অদ্ভুত কাণ্ড! পাশের রুমটিতে আসার পরই শফিকের মনে হলো, গন্ধটা অপর রুমটিতে চলে গেছে।

শফিক গন্ধের উৎসের সেই রুমটিতে গেল। তখন তার মনে হলো গন্ধটা ছোটাছুটি করছে। গন্ধটা আর এখন এখানে নেই। শফিক রুমটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী! এ তো দেখি কানামাছি খেলা শুরু হয়েছে। কিন্তু এই খেলা খেলছেটা কে?

দুই অফিস থেকে বাসায় ফিরে শফিক তাজ্জব বনে গেল। এ কী কাণ্ড! বিছানা, খাবারের টেবিল পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো।

গতকাল রাতে শফিকের ঘুম এসেছে অনেক দেরি করে। উৎকট গন্ধটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে 'রাতের অনেকটা অংশ সে নির্ঘুম অবস্থায় থেকেছে। অবশেষে কখন তার চোখে ঘুম এসেছে, সে বলতেও পারবে না। তবে ঘুমোনোর আগ পর্যন্ত সে উৎকট সেই গন্ধটা আর পায়নি ।

বেশি রাতে ঘুমনোর কারণে আজ সকালে তার ঘুম ভেঙেছেও দেরি করে। অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুতির সময়টাও তার কেটেছে তাড়াহুড়োর ঝড়ের মধ্যে। যে কারণে সে

বিছানা গোছগাছ করতে পারেনি। আর রাতে খাবারের পর টেবিলে এলোমেলো হয়ে থাকা থালাবাটি ধোয়া-মোছাও করতে পারেনি। কিন্তু এখন সে দেখছে সবকিছু সাজানো অবস্থায় আছে।

বিস্ময় ভরা চোখে শফিক আবিষ্কার করল, ঘরের কিছু কিছু জিনিসের স্থান পরিবর্তিত হয়েছে।

এখন আলনাটা যেখানে আছে সকালেও সেখানে ছিল না। টি-টেবিলটি এখানে এল কীভাবে! আর এই চেয়ারটি তো ছিল ওই রুমে, এটি এখানে!

শফিক প্রতিটি রুমই ঘুরে ঘুরে দেখল। প্রতিটি রুমেরই কোন না কোন আসবাবপত্রে হাত পড়েছে। তবে তা রাখা আছে এখন চমৎকারভাবে। যেটির যেখানে থাকা দরকার সেটি সেখানেই রাখা হয়েছে। আগেই বরং এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

শফিক ঠায় দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এসব কীভাবে সম্ভব?

তিন

দিনগুলো ভাল কাটছে শফিকের ' এখানে। সারাদিন কাটে অফিসে কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। এই অফিসের সহকর্মীরা খুবই আন্তরিক পরস্পরের প্রতি। তাই মানসিক কোন অশান্তিতে থাকতে হয় না। মেজাজ সর্বদা থাকে ফুরফুরে।

আর বাসায় ফিরে পত্রিকার পাতা উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে পড়ে শেষ করে দেয়া হয় নির্বিঘ্ন ঘুম। পত্রিকা পড়া ও ঘুমের মধ্যবর্তী সময়ে হোটেলে গিয়ে রাতের আহার খেয়ে আসা। এইভাবেই তার ছিমছাম জীবন চলছে। একজন বুয়া এসে রান্নাবাড়া করে দিয়ে যাবে বলে কথা ছিল, কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত এল না। কেন এল না, তা-ও জানা হলো না। তবে শফিক বুঝে নিয়েছে বুয়ার না আসার কারণ । অফিসের অনেক কলিগই তাকে বাসাটি

ছেড়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু শফিকের এক

কথা, 'আমার তো কোন অসুবিধা হচ্ছে না। বরং সুবিধাই বলা যায়, নিরিবিলি বাসা।' তখন কলিগরা ভৌতিক বিভিন্ন কথা বলত

এই বাসা নিয়ে। শফিক তা হেসে উড়িয়ে

দিত। শফিক বাসার গোপন ব্যাপারটি কারও সাথে শেয়ার করত না। সত্যি বলতে কী, প্রথম এক-দু'দিন একটু-একটু ভয় ভয় পেলেও সেই অনুভূতি খুব দ্রুত কেটে যায় তার। এখন বরং তার মনে হয়, সে একাকী না, কেউ নিশ্চয় আশপাশে থাকে। হোক অদৃশ্য, তারপরও তো উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

চার

গেটের কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল শফিকের। জোরে জোরে গেটে শব্দ করা হচ্ছে। এত ভোরে কে এল ।

গেট খুলে শফিক অবাক হয়ে গেল

সজলকে দেখে ।

অবাক কণ্ঠে শফিক বলল, 'এত ভোরে তুই কোথা থেকে এলি?'

দুই গাল হেসে সজল বলল, 'বাড়ি থেকে। যাচ্ছিলাম বড় ভাইয়ের কাছে। নাইট কোচ রাস্তায় নষ্ট হয়ে গেল। ভাবলাম, বাধা যখন পড়েই গেছে তাহলে তোকে দেখেই যাই।'

শফিক কৌতূহলী কণ্ঠে বলল, 'বাসা খুঁজে

পেলি কীভাবে?'

- 'ঠিকানা তো তোর কাছ থেকে অনেক আগেই রেখেছিলাম। তাই বাসা খুঁজে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।'

*আয়, ভেতরে আয়।'


অনেক দিন পর বন্ধুকে কাছে পেয়ে খুব ভাল লাগছে শফিকের। অনেক খবরা-খবর নেয়া-দেয়া, গল্পগুজব হচ্ছে দুই বন্ধুর মধ্যে। সকালে দু'জন একসাথে গিয়ে হোটেলে নাস্তা। সেরে এল। সমস্যা দেখা দিল শফিকের অফিসে যাবার সময়। সে সজলকে সাথে করে অফিসে নিয়ে যেতে চাইল ।


শুনে সজল বলল, 'পাগল নাকি তুই। আমি তোর অফিসে গিয়ে কী করব? রাতে আমি ঘুমুতে পারিনি, আমি বরং টানা ঘুম দেব।


তুই অফিস করে আয়।' শফিক বলল, 'খালি বাসায় তুই ভয় পাবি


সজল হাসতে হাসতে বলল, 'তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি, আমি ভয় পাব। আমি


কি বাচ্চা মানুষ!" শফিক সজলকে অনেক জোরাজুরি করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে একাই অফিসে গেল।


কিন্তু সারাটা দিন অফিসে বসে উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় কাটল শফিকের। অফিস ছুটি হবার সাথে সাথেই কোথাও সময় নষ্ট না করে সোজা বাসায় চলে এল সে। বাসার কাছে আসতেই শফিক দেখল গেটের সামনে পায়চারি করছে সজল ।


শফিক গেটের কাছে পৌঁছতেই সজল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, 'দোস্, তোর এই বাসায় ভূত আছে।'


শফিক স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, 'কী বলছিস


এসব “আমি ঠিক বলছি। আই অ্যাম ড্যামড

শিওর।'

'তুই কিছু দেখেছিস?'

*না, তবে অবশ্যই কিছু একটা আছে।'

সন্ধ্যার বাসেই সজল তার বড় ভাইয়ের উদ্দেশে রওনা দিল। যাবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সে শফিককে বারবার বলছিল, এই বাসা ছেড়ে দেয়ার জন্য।

পাঁচ

এই বাসা ছাড়তে মনই চাইছে না শফিকের। কেমন যেন একটা মায়ার বাঁধন সৃষ্টি হয়ে গেছে এই বাসাটিকে ঘিরে।

তবুও তাকে যেতে হবে এই বাসা ছেড়ে । না গিয়ে উপায় নেই। সে এখানকার অফিস থেকে বদলি হয়ে গেছে অন্যত্র।

অদৃশ্য স্বজন কীভাবে যেন টের পেয়ে গিয়েছিল শফিকের চলে যাবার বিষয়টি। গত এক সপ্তাহ ধরে তার কোনও উপস্থিতিই ঘটেনি শফিকের আশপাশে।

শফিকের আসবাবপত্র পিকআপে উঠানো হয়ে গেছে। এখন শুধু তার বাসা থেকে বেরিয়ে যাবার পালা।

কিন্তু শফিক শূন্য রুমগুলোর ভেতর ঘোরাফেরা করছে। সে অপেক্ষা করছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস তাকে বিদায় দিতে অদৃশ্য স্বজন নিশ্চয়ই আসবে।

অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে না শফিকের।

ইতোমধ্যে পিকআপের একজন এসে তাগাদা দিয়ে গেছে তাকে বেরুনোর জন্য। বাসার মালিকের প্রতিনিধি বাইরে অপেক্ষা করছে সদর দরজায় তালা লাগানোর জন্য ।

হঠাৎ করেই উৎকট গন্ধটি নাকে আসতে লাগল শফিকের। বেদনায় ভারাক্রান্ত হতে লাগল শফিকের মন। উৎকট গন্ধটি কাছে আসতে-আসতে একেবারে তার পাশে চলে এল ।

এই অবস্থার ভেতরেই বেশ কিছুক্ষণ সময় পার হয়ে গেল। একসময় নীরবতা ভেঙে শফিক শুধু উচ্চারণ করল, 'আসি।'


কোন মন্তব্য নেই

  [ছেলোদের পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের ২য় তলায়, তারিখ- ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং মেয়েদের পরীক্ষা মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ এর প...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.