Header Ads

Header ADS

মনে অজান্তেই অতংক

 

অফিশিয়াল চিঠিটার দিকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন এহসান আহমেদ। কিছুদিন অথেকেই গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু হুট করে অর্ডারটা যে হয়ে যাবে, তিনি কল্পনাও করেননি। ভেবেছিলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই আগে আলোচনা করবেন তাঁর সাথে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আলোচনা ছাড়াই আদেশ দিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। গলা শুকিয়ে আসে বার বার। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের লম্ফঝম্প টের পান।

এ-সময় টেবিলে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। রিসিভার তুলে কানে লাগাতেই কোম্পানির এমডি উত্তম বড়ুয়ার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ, শুনতে পান, 'কনগ্রাচুলেশন্স, এহসান সাহেব। লেটারটা হাতে পেয়েছেন নিশ্চয়ই। আপনাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য না জানিয়েই অর্ডারটা করে ফেললাম, এখন পার্টি কবে দিচ্ছে বলুন?'

“থ্যাংক ইউ, স্যর। কিন্তু, সার... আমি... মানে, সার.... আমতা-আমতা করেন এহসান আহমেদ... আমি এই পোস্টে ভালই আছি, স্যর। প্রমোশন দরকার নেই আমার।

ওপাশে থমকে যান উত্তম বড়ুয়া। 'মানে, কী বলছেন আপনি? সবাই প্রমোশনের জন্য ধরনা দেয়, আর আপনি প্রমোশন পেয়েও নিতে চাচ্ছেন না, এটা তো আপনার পাওনা। যোগ্যতা আর দক্ষতার কারণেই অফিসে আপনার সুনাম। তার ফলেই না এই প্রমোশন! আপনি আমার রুমে আসুন, সামনাসামনি আলাপ করি।'

উত্তম বড়ুয়ার ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে রইলেন এহসান আহমেদ। এমডি তাঁর

চেহারা দেখে প্রথমে কিছু জিজ্ঞেস না করে কফি অফার করলেন। কফির কাপে চুমুক দিতে-দিতে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে এমডি তাকালেন এহসান আহমেদের দিকে। দ্বিধাটা কিছুটা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করলেন এহসান। যে কথা লজ্জায় এতদিন বলেননি কাউকে, তা যে আজ বলতেই হচ্ছে।

মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিটির অ্যাসিস- ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, অর্থাৎ এজিএম পদে ছিলেন এহসান আহমেদ। এতদিন অন্যান্য এজিএমদের মত তাঁরও বসার কামরা ছিল অফিসের চতুর্থ তলায়। এর আগের পদে থাকতে বসার কামরা ছিল তৃতীয় তলায়। প্রায় নিয়মিতই একবার কি দু'বার পঞ্চম তলায় উঠতে হত, মিটিং-রুমে যাওয়ার জন্য। ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ায় তাঁকে এখন থেকে নিয়মিত বসতে হবে পনেরোতলা ভবনটির এগারো তলায়। মিটিং-এর জন্য নেমে আসতে হবে পঞ্চম তলায়। মূল সমস্যা হচ্ছে, এলিভেটর বা লিফটে চড়তে পারেন না তিনি। লিফটে চড়া দূরে থাক, লিফটে চড়ার কথা মনে হলেই তাঁর হাত-পা যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসে, নাড়ির গতি বেড়ে যায়। এর আগে দুটো চাকরিতে তিনি ইন্টারভিউয়ে পাশ করেও যোগ দেননি নয়- দশতলায় অফিস বলে। আর দুটো চাকরি তিনি ছেড়ে দিয়েছেন, প্রমোশনের ফলে আরও উঁচুতলার বসতে হবে বলে। কিন্তু কাউকে বলতে পারেননি সমস্যাটার কথা। চাকরি ছেড়েছেন 'ব্যক্তিগত সমস্যা'র অনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে। এই কোম্পানিতে এতদিন তৃতীয়- চতুর্থ থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত কর্মক্ষেত্র সীমাবদ্ধ থাকায় সিঁড়ি দিয়ে হেঁটেই পার হয়েছেন। কেউ কিছু টের পায়নি। দু-একজন সহকর্মী লিফট বাদ দিয়ে হাঁটতে দেখে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করলেও 'স্বাস্থ্য-সচেতনতা'র দোহাই দিয়ে পার পেয়েছেন। কিন্তু এখন? এগারো তলায় নিয়মিত হেঁটে উঠবেন কীভাবে? প্রতিদিন আবার সেখান থেকে পঞ্চম তলায় নামতে হবে মিটিং-এর জন্য। তার চেয়ে প্রমোশন না নেয়াই ভাল। সব শুনে উত্তম বড়ুয়া

বললেন, 'আপনি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাননি?' শুনে মুখ কালো হয়ে যায় এহসান

আহমেদের। 'সাইকিয়াট্রিস্ট? সার কি আমাকে পাগল ভাবছেন? আমার তো মাথা খারাপ হয়নি, সার। পাগলের ডাক্তার দেখাব কেন?' 'আরে না।' উত্তম বড়ুয়া হাসেন। 'পাগল হতে যাবেন কেন? সাইকিয়াট্রিস্ট মানে শুধু পাগলের ডাক্তার নাকি? মানসিক রোগের চিকিৎসক তারা। আপনার এটাও এক ধরনের মানসিক সমস্যা। মানসিক রোগ মানে তো কেবল আমরা যাদের পাগল বলি তাদের রোগই না। মনের বহু ধরনের রোগ হয়। আপনি ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। যদি ভাল হওয়ার কোন উপায় পাওয়া যায়, মন্দ কী? আপনার মত সৎ, নিষ্ঠাবান একজন কর্মকর্তা শুধু এই সমস্যার কারণে প্রমোশন নিতে পারবেন না, তা কি হয়?'

উত্তম বড়ুয়ার পরামর্শ মত মনোরোগ চিকিৎসক কামরুল হাসানের সাথে দেখা করেন এহসান আহমেদ। খুলে বলেন সমস্যার কথা। সব শুনে কামরুল হাসান বলেন, 'হুঁ। আপনার এটা এক ধরনের উদ্বেগজনিত রোগ বা এক্সাইটি-ডিসঅর্ডার। আমরা একে বলি স্পেসিফিক ফোবিয়া বা নির্দিষ্ট বিষয়ে অহেতুক ভীতি। ভয় হচ্ছে এক ধরনের মৌলিক বা সহজাত আবেগ। যেমনটি কি না, আনন্দ, দুঃখ বা ক্রোধও এক ধরনের আবেগ। জীবনে কখনওই ভয় পায়নি, এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ভয় গ্রহণযোগ্য। যেমন, শিশু হঠাৎ শব্দে ভয় পায়। রাতের অন্ধকার, বজ্রপাতের শব্দ, গুলি-বোমার শব্দ, মেঘের গর্জন ইত্যাদি কতগুলো বিষয় সাধারণ ভয়ের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু এই ভয়-ই যদি স্বাভাবিকতার সীমা ছাড়িয়ে তীব্র আকার ধারণ করে অথবা ভয়টি হয় অহেতুক, তখন তা রোগ হিসেবে বিবেচ্য হয়। আপনি কি কখনওই লিফটে চড়েননি জীবনে?'

'হ্যাঁ, তা চড়েছি। কিন্তু গত পঁচিশ বছরে একবারও না।' "লিফটের প্রতি ভীতি জন্মানোর নির্দিষ্ট

কোন কারণ কি আছে? কোন নির্দিষ্ট ঘটনা?' “হ্যাঁ, তা আছে। পঁচিশ বছর আগে, যখন আমি কলেজে পড়ি, এক আত্মীয়ের অফিসে। গিয়েছিলাম এক কাজে। তাঁর রুম ছিল


অফিসের ছ'তলায়। ওখানে যাওয়ার জন্য লিফটে চড়লাম। সেই প্রথম লিফটে চড়া। লিফটে আমি একা। লিফট উঠতে শুরু করার পর পরই বিদ্যুৎ চলে গেল। লিফটের মধ্যে আটকা পড়লাম। অন্ধকার ছোট্ট পরিসরের জায়গাটা। মনে হচ্ছিল, কখনওই এ লিফট আর খুলবে না । কিছুক্ষণ পর ভেতরের বাতাসে অক্সিজেন সব শেষ হয়ে যাবে। আমি দমবন্ধ হয়ে এর ভেতরেই মারা যাব। দরজায় থাবা দিচ্ছিলাম জোরে জোরে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিলাম। তখন দুপুর, লাঞ্চ ব্রেক ছিল বোধহয় । অনেকক্ষণ পর লোকজনের আওয়াজ পেলাম বাইরে। আমাকে লিফটের ভেতর থেকে উদ্ধার করার পর বুঝলাম মিনিট পনেরো মত পার হয়েছে। অথচ মনে হচ্ছিল যেন যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে। সেই ঘটনার পরও একবার লিফটে চড়েছিলাম। কিন্তু চড়ার পরপরই বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা এমনভাবে লাফাতে শুরু করেছিল, মনে হচ্ছিল তখনই সেটা লাফ দিয়ে বের হয়ে আসবে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মাথা ঘুরে তখনই অজ্ঞান হয়ে যাব বলে মনে হচ্ছিল। সাত তলায় ওঠার কথা থাকলেও তৃতীয় তলাতেই লিফট থেকে নেমে গিয়েছিলাম। এর পর থেকেই আর লিফটে চড়তে পারি না আমি। মনে হতে থাকে, লিফটের ভেতর চড়লেই লিফট বন্ধ হয়ে যাবে। আর কখনও বের হতে পারব না লিফট থেকে।'

“আপনি বোঝেন, লিফটের প্রতি এই ভয়টা যে অমূলক?'

“হ্যাঁ, আমি জানি, এই ভয়টা অহেতুক। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই লিফট দিয়ে ওঠানামা করছে নিরাপদেই। কিন্তু এই ভয় আমি দূর করতে পারি না মন থেকে। তাই, নিজেই লিফট থেকে দূরে থাকি। এ কথা তো লজ্জায় কাউকে বলাও যায় না। লোকে কী

ভাববে? আমি কি বাচ্চা মানুষ নাকি, যে এরকম সিলি একটা বিষয়ে ভয় পাব? নাকি আমি পাগল?'


'নাহ, আপনি বাচ্চা নন, পাগলও নন। এটা এক ধরনের মানসিক অসুখ। এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এরকম রোগে আপনি একা ভুগছেন না । এ ধরনের রোগে পৃথিবীতে আরও অনেকে ভুগেছে, ভুগছে। কারও কুকুর- বিড়ালে অতিরিক্ত ভয়, কারও ইনজেকশন- স্যালাইনে, কারও বা উঁচু জায়গায়, আবার কারও আপনার মত কোনও বদ্ধ জায়গায়। তবে, আশার ব্যাপার হচ্ছে, এই রোগটা চিকিৎসাযোগ্য। আরও আগে অর্থাৎ সেই শুরুর দিকে এলে চিকিৎসাটা দ্রুত হত, তাড়াতাড়ি সারতও হয়তো। এত বছর এটা নিয়ে কষ্ট পেতেন না। আর এত চাকরিও পরিবর্তন করতে হত না। সমস্যা নেই, চিকিৎসা শুরু হোক। তারপর দেখা যাক।'


চিকিৎসা শুরু হলো। একটা মাত্র ওষুধ দিলেন চিকিৎসক। সঙ্গে সাইকোথেরাপিস্টের সাথে সেশন। নিয়মিত সেশনে অংশ নিলেন এহসান আহমেদ। নিজের জীবন, বেড়ে ওঠা, ভীতি, উদ্বেগ-সব কিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। সাইকোথেরাপিস্ট শিখিয়ে দিলেন, রিল্যাক্সেশন টেকনিক, উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার পদ্ধতি, ধীরে-ধীরে ভীতি কাটিয়ে ওঠার নানা কলা-কৌশল। এহসান আহমেদও পরামর্শমত চর্চা চালিয়ে গেলেন। দেড় মাসের মাথায় পরিবর্তন টের পেতে শুরু করলেন। ধীরে-ধীরে লিফটে একতলা-দোতলা করে উঠতে পারলেন তিনি। তবে, একা নয়, সঙ্গে কেউ থাকলে তবেই। ছয় মাসের মাথায় কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই লিফটে চড়তে পারলেন একা একাই ।


এর আগেই স্থগিত থাকা প্রমোশনটা কবুল করে নিলেন তিনি


কোন মন্তব্য নেই

  [ছেলোদের পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের ২য় তলায়, তারিখ- ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং মেয়েদের পরীক্ষা মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ এর প...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.