ভয়ংকর পিচাশ
ঘোর সন্ধ্যা। কালিগোলা আঁধারে গ্রাস হতে থাকা প্রকৃতির মাঝে হালকা অস্পষ্ট আতা। এমন অন্ধকারের মাঝে পথ চলা খুব একটা সহজ নয়। তবে আজ গ্রামের ছেলে সাদেকের তেমন একটা অসুবিধা হচ্ছে না। তার অভ্যেস আছে। সাদেক তার পড় একত্ব মার্কা সাইকেলে চেপে ঝনঝন শব্দ তুলে দ্রুত বেগে নবাবপুরের হাট থেকে ফিরছে।
দু'দিন হলো সাদেকের বড় বোন শেফালি স্বামী-বাচ্চাসহ বেড়াতে এসেছে। শেফালির আগমন উপলক্ষে সাদেকদের বাড়িতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্রামের মানুষদের রেওয়াজ-নিজেরা খেয়ে থাকুক আর না খেয়ে থাকুক জামাইকে খুব আদর-আপ্যায়ন করা। গতকাল শেফালিরা এসে পৌঁছবার পরই বাড়ির খোপ থেকে একটা হাঁস আর একটা মুরগি বের করে জৰাই দেয়া হয়। পুকুরে জাল ফেলে কয়েকটা বড় বড় রুই-কাতলা ধরা হয়। দুপুরে জামাইয়ের সামনে চিনিগুড়া চালের পোলাও, মাছের কালিয়া, ডিমের কোরমা, মুরগির মাংস, মাছের মুড়িঘণ্ট আর পায়েস দেয়া হয়। সন্ধ্যা রাতে চুলা থেকে নামানো গরম ধোঁয়া-ওঠা হাঁসের মাংস দিয়ে গরম-গরম চালের আটার রুটি। রাত আর একটু বাড়ার পর আবার দুপুরের একই পদ-পোলাও, মাছের কালিয়া, ডিমের কোরমা ...আজ সকালে পরোটা, ডাবল ডিমের অমলেট, কবুতরের বাচ্চার ঝোল, সেমাই, সবরি কলা আর দুধ-সিরায় ভেজানো চিতই পিঠা । দুপুরে আবার গতকালের মত চিনিগুড়া চালের পোলাও, মাছের কালিয়া, মুরগির মাংস...তাই দেখে সাদেকের
বোন শেফালি বিরক্ত হয়ে নিচু স্বরে মাকে বলে, ৩. মা, প্রতি বেলায় জামাইরে যে একই ধরনের খাওন দিতেছ, এড়া কেমন দেহায় ?! একই মাছ, ডিমের কোরমা, মুরগির সালুন...! হার্ট দিয়া তো একটু গরুর মাংস, ইলিশ মাছ, রসগোল্লা, দই, সন্দেশ এইসবও আনাইতে পারো। আইজই তো হাটবার, সালেকরে হাটে পাঠাও।'
বিকেলে সাদেক তার ভাঙা-চোরা লড়- ঝকড় মার্কা সাইকেলটা নিয়ে নবাবপুরের হাটের উদ্দেশে রওনা দেয়। নবাবপুরের হাটের দূরত্ব সাদেকদের বাড়ি থেকে প্রায় ছয়-সাত মাইল। আশপাশে অন্তত আট-দশ গ্রামের লোক ওই নবাবপুরের হাটেই কেনাকাটা করে। নবাবপুরের হাটে পৌঁছে সাদেক বোনের ফরমায়েশ মোতাবেক বেশ বড় সাইজের একটি ইলিশ মাছ, দুই কেজি গরুর মাংস, রসগোল্লা, দই আর আধা কেজি ছানার সন্দেশ কিনে বাড়ির পথ ধরে ফিরতে-ফিরতে পথের মাঝে সন্ধ্যা হয়ে যায় ।
একটা চটের ব্যাগের ভিতর গরুর মাংস, রসগোল্লা আর সন্দেশের ঠোঙা ইত্যাদি ভরে ব্যাগটা সাইকেলের হাতলের এক পাশে ঝুলিয়ে দিয়েছে। ইলিশ মাছটার কানকোর ভিতর দিয়ে সুতলি ঢুকিয়ে শক্ত করে বেঁধে সেটাও সাইকেলের হাতলের অন্যপাশে ঝুলিয়ে নিয়েছে।
সাদেক এখন রহমতখালির হেরিং বোণ্ডের রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। এই জায়গাটা বড়ই নির্জন। আশপাশে কোন বাড়ি-ঘর নেই। রাস্তার এক পাশে ঘন বন-জঙ্গল আর অন্য পাশে বিস্তীর্ণ জলা । জলায় হাঁটু সমান পানি।
হঠাৎ হিমশীতল দমকা একটা হাওয়া ঘূর্ণির মত পাক খেয়ে সাদেকের গায়ে ঝাপ্টা মারল। যেন হাওয়াটা সাদেককে জড়িয়ে ধরেছে! সাদেকের গা কেমন কেঁপে উঠল গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। আর একটা ব্যাপার ঘটল মুহূর্তে-চলন্ত সাইকেলের চেইনটা
ঘটাং করে বিকট শব্দ তুলে ছিঁড়ে গেল। আকস্মিক সাইকেলের চেইন ছেঁড়ার সাদেক টাল সামলাতে না পেরে সাইকেল নিয়ে হুমড়ি খেয়ে রাস্তার যে পাশে জলা সেই পাশে পড়ল।
একটুর জন্য জলার মধ্যে পড়া থেকে রেহাই পেল। তবে সাইকেলের হাতলে ঝোলানো ইলিশ মাছটা ছিটকে পড়ল জলায়। অবশ্য মাছটা ছিটকে বেশি দূর যায়নি জলার কিনারা ঘেঁষেই আছে। অল্প পানিতে দেখা যাচ্ছে, চকচক করছে মুখে সুতলি বাঁধা রূপালী মাছটা।
সাদেকের তেমন একটা চোট লাগেনি। হাত-পায়ের দু-এক জায়গায় সামান্য ছড়ে- ছিলে গিয়েছে। কিছুটা ব্যথা-জ্বলুনি হচ্ছে। সেই ব্যথা-জ্বলুনিতে বিশ-একুশ বছর বয়সী শক্ত-পোক্ত পেটা শরীরের অধিকারী সাদেকের তেমন বিকার নেই।
আকস্মিক পতনজনিত হতবিহ্বল অবস্থাটা কাটিয়ে সাদেক গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাত-পায়ের ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে মুখ থেকে থুথু এনে লাগিয়ে সাইকেলটাকে তুলে স্ট্যাণ্ডের উপর দাঁড় করাল।
জলার কিনারা থেকে ইলিশ মাছটা তুলতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। মৃত মাছটা জ্যান্ত মাছের মত সাদেকের হাত ফসকে পানিতে ছড়ছড় শব্দ তুলে সাঁতার কেটে কিছুটা এগিয়ে গেল।
সাদেক তার প্যান্ট হাঁটু অবধি গুটিয়ে জলার পানিতে নেমে পড়ল। পানিতে নেমে মাছটার কাছে গিয়ে যেই না ওটার দিকে হাত বাড়াল অমনি আবার সেই একই কাণ্ড ঘটল। মাছটা দ্রুত বেগে সাঁতার কেটে সামনে এগিয়ে গেল। মরিয়া হয়ে সাদেকও সবেগে মাছটার পিছু নিয়ে আবার ধরতে চাইল। এবারও মাছটা আগের মত ফাঁকি দিয়ে হাত ফসকে চলে গেল।
মাছটাকে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা চালাতে- চালাতে সাদেকের অবস্থা পাগলপ্রায়। সব বিপত্তি অগ্রাহ্য করে তার মাথায় একটা ভাবনাই তাড়া করছে, মাছটাকে ধরে যত জলদি সম্ভব তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। বাড়ির সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে বাড়িতে ফিরলে গরুর মাংস, ইলিশ মাছ রান্না করে জামাইকে খেতে দেয়া হবে। যেহেতু সাইকেলটার চেইন ছিড়ে গেছে, ওটাকে আর চালিয়ে যাওয়া যাবে
না, যেতে হবে হেঁটে-হেঁটে সাইকেল ঠেলতে- ঠেলতে। উত্তেজিত আর বিপর্যস্ত সাদেকের মাথায় এটা কাজ করছে না, মৃত ইলিশ মাছটার এমন আচরণ করার কথা নয়, এটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ।
পানি-কাদায় ভিজে একেবারে মাখামাখি অবস্থা সাদেকের। কতক্ষণ ধরে মাছটাকে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে, কোন হিসেব নেই তার। সব খারাপের একটা ভাল লক্ষণ-মাছটা জলার মাঝ বরাবর না গিয়ে পাড় ঘেঁষে ঘেঁষেই অল্প পানিতে ছুটছে। সাদেকের সাইকেল যেখানে দাঁড় করানো, সেখান থেকে মাছের পিছনে ছুটতে ছুটতে অনেক দূর চলে এসেছে সে। আকাশে মেঘের আড়ালে থাকা ভাঙা চাঁদটা এতক্ষণে মুখ বের করেছে। অস্পষ্ট ঘোলাটে চাঁদের আলো, নির্জন জনমানবহীন এই জায়গাটাকে আরও গা ছমছমে আবহ এনে দিয়েছে।
হঠাৎ সাদেক লক্ষ করল, উপর থেকে চিকন ধারায় হালকা গরম পানি পড়ছে তার গায়ে। অনেক উপর থেকে পড়া হালকা গরম সেই পানি তার গা স্পর্শ করে জলার পানিতে পড়ে সুনসান নির্জনতাকে ভেঙে মৃদু শব্দ তুলছে। কী বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ সেই পানিতে। তৎক্ষণাৎ সাদেক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে তার সোজা উপরে তাকাল। মাথার উপরে, জলার পাড়ের একটা নারকেল গাছ ধনুকের মত বাঁকা হয়ে, জলার দিকে ঝুঁকে, সোজা অনেক উপরে উঠে গেছে। অনেক উঁচুতে নারকেল গাছটার মাথায় মানুষের অবয়বের মত কালো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। সেটাই গরম পানি ফেলার অপকর্মটা করছে।
সাদেক ভাবল, তার সমবয়সী গ্রামের কোন বখাটে ছেলে নারকেল-ডাব চুরি করতে এসে নারকেল গাছে উঠেছিল। এখন তাকে দেখে তার গায়ে প্রস্রাব করে ফাজলামি করছে। রাগে তার মাথায় আগুন ধরে গেল। সে ক্ষিপ্ত স্বরে চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'ওই, কোন, হালায় রে!... পুত, সাহস থাহে তো এহনই নীচে আয়, তোর...টাইন্যা ছিড়া হালামু। এত বড় সাহস, গায় পিসাব করোস!... পুত, শিগগির তুই নীচে আয় । ইঁট দিয়া তোর... ছেঁইচা, পিসাব করার
স্বাদ সারা জীবনের লইগ্যা মিটায়া দিমু...
গাছের মাথা থেকে কালো অবয়বটা বিকট স্বরে থিকথিক করে হেসে উঠল। সেই হাসি শুনে সাদেকের বুকটা ধক করে উঠল। যেন কোন মানুষের হাসি নয় গা শিউরানো জান্তব ভয়ংকর হাসি। হাসির দমকে নারকেল গাছটার ঝুপড়ি মাথা থর থর করে কাঁপতে লাগল।
নারকেল গাছের মাথার কালো অবয়বটা অতি দ্রুত নেমে আসছে। সাদেকের কাছে সেই নামাটাও অস্বাভাবিক লাগছে।
গাছের মাঝ বরাবর নামার পর সাদেক অস্বাভাবিকতাটা ধরতে পারল। অবয়বটা নামছে হামাগুড়ি দেবার ভঙ্গিতে। মাথা নীচের
দিকে। মানুষ এভাবে গাছ থেকে নামে না। ধীরে-ধীরে সাদেকের চোখে অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অসম্ভব লম্বা লিকলিকে একটা শারীরিক কাঠামো। অস্বচ্ছ আবছা চাঁদের আলোতে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, ওটার গায়ের রং মিশমিশে কালো।
আরও খানিকটা নেমে সাদেকের সাত- আট হাত উপরে গাছের বাঁকটায় পৌঁছে আবার খিকখিক করে হেসে উঠল। সেই সঙ্গে মুখটা তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে সাদেকের দিকে তাকাল । এটা কোন মানুষের মুখ হতে পারে না! লম্বাটে কিছুটা শূকরের মুখের মত একটা মুখ। মাথায় নিগ্রোদের কোঁকড়ানো চুলের মত শত শত জীবন্ত জোঁক যেন কিলবিল করছে। হাসির দমকে ওটার বিদঘুটে বীভৎস চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে তিন-চার ইঞ্চি নীচে ঝুলছে। জিভটাও মুখের ভিতর থেকে বেরিয়ে পাঁচ-ছয় হাত ঝুলে পড়ে সাপের মত লকলক করছে। জিভটা আরও হাতখানেক বেড়ে উঠে সাদেকের দিকে এগিয়ে আসছে। একটুর জন্য সাদেকের মাথা ছুঁতে পারছে না। তবে জিভ থেকে ঝরা দুর্গন্ধযুক্ত আঠাল লালা ছিটকে ছিটকে সাদেকের মাথায়, মুখে এসে পড়ছে।
ভয়ে আতঙ্কে সাদেকের সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে গেছে। কণ্ঠস্বর হয়েছে রুদ্ধ। চেতনা পেয়েছে লোপ ।
কোনক্রমে সাদেক 'ও-মা' বলে খানিকটা গোঙানির মত শব্দ করে, পাথরের মত জমে যাওয়া পা তুলে যেই না জলা থেকে তীরে
ওঠার জন্য এগোল, অমনি মুহূর্তে ওটাও গাছের বাঁকের সেই দশ-বারো হাত উপর থেকে লাফ দিয়ে ঝপাৎ করে জলার পানিতে উপুড় হয়ে পড়ল। পানিতে বড়সড় একটা আলোড়ন উঠল। ওদিকে সাদেক প্রায় পাড়ে উঠে গেছে। পানিতে লাফ দিয়ে পড়েই ওটাও বড়-বড় নখ যুক্ত লম্বা, কালো, রাক্ষুসে হাত সাদেকের দিকে ছুঁড়ে মেরে, পাড় বেয়ে ওঠারত সাদেকের পেছনের পা প্রচণ্ড আক্রোশে আঁকড়ে ধরল। মুহূর্তে তীক্ষ্ণ নখগুলো ঢুকে গেল সাদেকের পায়ের মাংস ভেদ করে। গলগল করে রক্ত বেরুতে লাগল। এবারে সাদেক গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল, 'ও-মা, ও মাগোরে, ও- বাবারে...' বিদ্যুৎ গতিতে অসুরের শক্তিতে ওটা সাদেকের পায়ে হ্যাঁচকা টান দিল। হ্যাঁচকা টানে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেঁচড়ে সাদেক জলার পানিতে উপুড় হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের জন্য ও-মা, ও মাগোরে.... চিৎকারটা থেমে গেল। আবার পরমুহূর্তে পানির ভিতর থেকে মুখ খানিকটা তুলে 'ও-মাগোরে, ও-বাবারে...' ভীত সন্ত্রস্ত, জীবন বাঁচানোর আকুতি ভরা আর্তনাদ ছাড়ল।
পিশাচটা জলার সামান্য পানিতে, হামাগুড়ি দেবার ভঙ্গিতে সাদেকের পিঠের উপর উঠে, সাদেকের মাথাটা পানিতে চেপে ধরল। এমনভাবে চেপে ধরল যে, ঘাড় অবধি মাথাটা থিকথিকে কাদায় দেবে গেল। কিছুক্ষণ সাদেকের হাত-পাগুলো খুব তড়পাল। পানিতে হাত-পা তড়পানোর অনবরত ছপ ছপ ছপাৎ- ছপাৎ শব্দ হতে লাগল। ধীরে ধীরে ছপ- ছপ...শব্দ কমতে লাগল। কমতে কমতে এক পর্যায়ে হাত-পাগুলো নিস্তেজ হয়ে গেল। পরিবেশটা আবার আগের মত নিঝুম রূপ নিল। ঝিরঝিরে বাতাসে জলার পানিতে ঢেউ খেলে যেতে লাগল। আকাশের ভাঙা চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে গ্রাস হলো প্রকৃতি ।
দুই
শেষমেশ ইলিশ মাছটা ধরতে পারে সাদেক। অনেক রাতে বাড়ি ফিরল ও।
সাদেককে দেখেই সাদেকের মা মারুফা
বেগম গালি-গালাজ শুরু করলেন, "হারামজাদারে দিয়া একটা কামও যদি ঠি মতন করান যাইত! সেই কোন্ বিকালে হাঙে পাড়াইছি, সবে ফিরছে হারামির বাচ্চায়। মনে অয় কোন হানে বইয়া টাস খেলছে এতক্ষণ। এদিকে অর বাজার নিয়া ফেরার অপেক্ষা করতে-করতে শ্যাষে জামাইরে মুরগির সালুন আর ডিম ভাইজ্যা ভাত খাইতে দিছি। জামাইর ধারে কী শরমডাই না পাইলাম! বিকাল থেইকাই সে হুনছে রাইতে ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, দই, মিষ্টির ব্যবস্থা করা হইতেছে। সাদেকের হাত থেকে বাজারের ব্যাগ আর ইলিশ মাছটা নিতে-নিতে আরও বললেন, 'এহন এই এত রাইতে আমার একলা একলা ইলিশ মাছ কুইটা ধুইয়া ভাইজ্যা পুইতে হইবে, গরুর মাংস জ্বাল দিয়া থুইতে হইবে। বাড়ির সবাই তো কহন ঘুমাইয়া পড়ছে। তুই অমন ভিজাপুরা ক্যান?' সাদেক নিচু গলায় থমথমে স্বরে বলল,
'সাইকেল লইয়া পানিতে পইড়া গেছিলাম।' মারুফা বেগম বাজারের ব্যাগ আর ইলিশ মাছটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে-যেতে বললেন, 'ভিজা শার্ট-প্যান্ট পান্ডাইয়া হাত-মুখ ধুইয়া ভাত খাইতে আয়। তোর ভাত সালুন 'বাইড়া ধুইছি।'
মারুফা বেগম যদি সাদেকের দিকে ভালভাবে লক্ষ করতেন, তা হলে দেখতে পেতেন সাদেকের চোখে-মুখে কী পরিমাণ ভয়াবহ থমথমে অভিব্যক্তি। আগের সাদেক যেন নেই! সহজ-সরল আলাভোলা সাদেকের মুখে এখন নিষ্ঠুর পিশাচের প্রতিচ্ছায়া।
সাদেকদের গ্রামে এখন পর্যন্ত ইলেকট্রিসিটি এসে পৌঁছয়নি। সাদেকের মা মারুফা বেগম কুপির আলোতে রান্নাঘরে বসে যথাক্রমে ইলিশ মাছ ভাজছেন, গরুর মাংস জ্বাল দিচ্ছেন। একসময় তাঁর কানে ভেসে এল গোঙানির মত অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ। রাতের সুনসান নীরবতার মাঝে শব্দটা খুবই ভীতিকর লাগছে। তিনি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে শব্দের উৎস অনুসরণ করে এগোতে লাগলেন। কিছুটা এগোনোর পর বোঝা গেল শব্দটা হচ্ছে
সাদেকের কামরার ভিতর থেকে। যতই এগোচ্ছেন ততই শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে কানে ধরা দিচ্ছে। যেন একাধিক বুনো জন্তু মাতম করছে। গভীর রাতে নেকড়ের দল যেমন সম্মিলিত স্বরে ডেকে গা ছমছমানো আবহ সৃষ্টি করে, তেমন!
মারুফা বেগম সাদেকের কামরার সামনে গিয়ে, ভিতর থেকে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ওই, সাদেইক্যা, তোর কী হইছে?! অমন 'করোস ক্যান?!' সঙ্গে-সঙ্গে মাতম থেমে গেল। একেবারে পিনপতন নীরবতা।
মারুফা বেগম আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হইল, কও না? অমন করছিলি ক্যান?' কোন প্রতি উত্তর নেই।
মারুফা বেগম ভাবলেন, মনে হয় ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে গোঙাচ্ছিল। গভীর রাত বলে অহেতুক তাঁর কাছে ওরকম ভীতিকর মনে হয়েছে। তিনি দরজার সামনে থেকে চলে এলেন। খাবার ঘরে এসে দেখতে পেলেন, সাদেকের জন্য যে ভাত সালুন বেড়ে, ঢেকে রেখেছিলেন তা তেমনই পড়ে রয়েছে। সাদেক তা ছুঁয়েও দেখেনি। তাঁর মনে দুশ্চিন্তা জাগল, ছেলেটার গায়ে বোধহয় খুব জ্বর উঠেছে। তাই ভাত না খেয়েই শুয়ে পড়েছে। আর জ্বরের ঘোরেই গলা দিয়ে অমন অদ্ভুত শব্দ বের হয়েছে।
তিন
খুব ভোরে সাদেকের বড় বোন শেফালির আচমকা ভয়ার্ত গলার আর্তনাদ আর চিৎকার করে কান্নার শব্দে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। তার গগনবিদারী চিৎকারে শুধু বাড়ির লোকই নয়, আশপাশের বাড়ির লোকজনও ছুটে আসে।
শেফালি আর তার স্বামী রোজকার মত গত রাতেও তাদের দুই বছর বয়সী শিশু পুত্রকে তাদের দুজনার মাঝে নিয়ে শুয়েছিল। ভোরে শেফালির ঘুম ভাঙার পর চোখ না খুলেই একটা হাত ছেলের দিকে বাড়িয়ে দেয়। তখনও ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটেনি তার। সেই অবস্থায়ই টের পায়, ছেলের গা থেকে তার হাতে চটচটে
কিছু লেগেছে। হাতটা চোখের সামনে এনে চোখ মেলে দেখে হাত ভর্তি টাটকা রক্ত। ভীত-আতঙ্কিত শেফালি তৎক্ষণাৎ ছেলের দিকে তাকায়। তাকিয়ে সে যা দেখতে পায় সত্যিই একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বীভৎস, মর্মান্তিক আর নারকীয় কিছু হতে পারে না।
রাতে শেফালি আর তার স্বামীর মাঝখানে বাচ্চাটাকে যেখানে শুইয়েছিল সেখানেই ঠিক শোয়া অবস্থায় বাচ্চাটা। তবে জীবিত নয়-মৃত! মরে সিঁটিয়ে রয়েছে। বাচ্চার সমস্ত গা, বিছানার চাদর টাটকা রক্তে মাখামাখি । রক্ত বের হবার কেন্দ্র বাচ্চার বুকের বাম পাশের গর্তযুক্ত একটা ক্ষত। যেন কোন হিংস্র জন্তু তীক্ষ্ণ নখযুক্ত থাবা বসিয়ে বাচ্চাটার বুকের বাম পাশ থেকে খুবলে মাংস সহ হৃৎপিণ্ডটা ছিঁড়ে নিয়েছে।
অতি দ্রুত দাবানলের মত সাদেকদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সংবাদটা। শত-শত লোকে ভরে যায় সাদেকদের বাড়ি। রায়পুর থানায়ও সংবাদটা পৌঁছে যায়। রায়পুর থানার ওসি সাহেব দুজন কনস্টেবল সহ রিকশা ভ্যানে চড়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছন। সবার মত ওসি সাহেবও বাচ্চাটার মৃতদেহ দেখে শিউরে ওঠেন। কী নিষ্ঠুরতা! কী নির্মম বীভৎসতা! ফুটফুটে নিষ্পাপ বাচ্চার বুক থেকে কেউ হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়েছে! কোন মানুষ এই নিষ্ঠুর কাজটা করেছে এটা বিশ্বাস হতে চাইছে না। কিন্তু মানুষ ছাড়া তো অন্য কিছুকে সন্দেহ করা যাচ্ছে না। হিংস্র জন্তু-জানোয়ার? এই গ্রামে কোন হিংস্র জন্তু- জানোয়ার নেই। সুন্দরবনের আশপাশের এলাকার কোন গ্রাম হলে খুব সহজেই ভেবে নেয়া যেত কোন মানুষখেকো বাঘ গ্রামে ঢুকে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে। গ্রামবাসীদের কারও কারও মুখে শোনা যাচ্ছে, দৈত্য-দানব, ভূত- প্রেতের কথা। সহজ-সরল-অশিক্ষিত- কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের মানুষ অমনটা ভাবতে পারে, তাই বলে ওসি সাহেব সুশিক্ষিত একজন লোক হয়ে তাদের সাথে একমত হবেন তা হয়। না। কোন মানুষই এ কাজ করেছে। হয় সে বিকৃত মস্তিষ্ক না হয় চরম আক্রোশে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে। আবার অন্য কোন
কারণও হতে পারে সম্পত্তির লোভে, পরকীয়ার টানে, কালোজাদুর সাধনায় ... এমন অনেক কারণ হতে পারে। ভারতের হরিয়ানা | রাজ্যে ২০০৪ সালে ১৫ অক্টোবর ঠিক এমন একটা ঘটনার মুখোমুখি হয় সেখানকার পুলিশ। সেই ঘটনার সাথে এই ঘটনার হুবহু মিল। সেই ঘটনায়ও মা-বাবার মাঝে ঘুমিয়ে থাকা শিশুর হৃৎপিণ্ড কেউ ছিড়ে নিয়ে যায়। পরে পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই শিশুটির মা-ই ঘটনাটি ঘটিয়েছিল কোন এক সাধুর পরামর্শে। সাধু বলেছিল, অমনটা করলে তারা অনেক ধনী হয়ে যাবে। আর পরকীয়ার টানে নিজের সন্তানকে বলি দেয়ার ঘটনা তো হাজারটা রয়েছে।
ওসি সাহেব এখন পর্যন্ত বাচ্চাটির পরিবারের কারও সাথে কথা বলতে পারেননি। যা কথাবার্তা হয়েছে, গ্রামের অন্যান্য লোকদের সাথে। আসল তথ্য বের করতে হলে বাচ্চাটির পরিবারের প্রত্যেককে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। এই মুহূর্তে বাচ্চার মা শেফালির সাথে কথা বলা অসম্ভব। কারণ শেফালি একটু পর পর মূর্ছা যাচ্ছে। আর যখন হুঁশ ফিরে আসছে, তখন পাগলের মত চিৎকার করে কাঁদতে-কাঁদতে বলছে, 'আমার বুকের ধন, আমার বাবারে কেডায় মারল? কেডায়?! কেডায় বাবার বুকটা অমন চিরে ফেলছে? কেডায়?!....
বাচ্চার বাবা অর্থাৎ, শেফালির স্বামী পক্ষাঘাতগ্রস্তের মত নির্জীব আর নির্বাক হয়ে বাড়ির উঠানে ধুলো-বালিতে মাখামাখি হয়ে কেমন অসহায় ভঙ্গিতে পড়ে রয়েছে। লোকটার অশ্রুসিক্ত লাল চোখে পলক পড়ছে না। শূন্য দৃষ্টিতে বোবা চোখ দুটো মেলে রেখেছে উদ্দেশ্যহীন। ঠোটের কোনায় জমে রয়েছে।
দাগ। এত লোক সামগম, পুলিশ, আঞ্চলিক খবরের কাগজের সাংবাদিক- কোনকিছুই তাকে স্পর্শ করছে না। সে যেন এই মুহূর্তে এখানে থেকেও নেই ।
অবশেষে ওসি সাহেব কথা বলার জন্য বাচ্চাটির পরিবারের দুজনকে পেলেন। এ দুজন হচ্ছে, বাচ্চার নানী মারুফা বেগম আর বাচ্চার খালা, অর্থাৎ শেফালির ছোট বোন সীমা। এরাও খুব কাঁদছে, বারবার চোখের পানি মুছছে তার পরেও কথা বলার পর্যায়ে আছে।
ওসি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা
কখন ওই অবস্থায় বাচ্চাটিকে দেখলেন? মারুফা বেগম ভাঙা গলায় বললেন, ভোর বেলায় শেফালির কান্দন হুইনা ঘুম থেইক্যা লাফ দিয়া উইঠ্যা দৌড়াইয়া যাইয়া দেহি ওই অবস্থা।' বলা শেষ করেই ফুঁপিয়ে উঠলেন ।
ওসি সাহেব খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে
আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'শেফালিদের শোবার
ঘরের দরজা কি খোলা পেয়েছেন?' শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে মারুফা বেগম বললেন, 'হ, দরজা খোলাই আছিল।
*আপনার জানা মতে আপনাদের কি এমন কোন শত্রু আছে, যে আপনাদের ওপর কোন কারণে খুব খেপে রয়েছে?
'না, ছার, হেইরহম শত্তুর তো কেউরে মনে হয় না। আর ওইডু বাচ্চার লগে কারই বা শত্রুতা থাকতে পারে?!'
'না, ধরেন আপনার বড় মেয়ে শেফালিকে এই গ্রামের কোন বখাটে রংবাজ ধরনের ছেলে বিয়ে করতে চেয়েছিল, তার সাথে মেয়েকে বিয়ে না দিয়ে আপনার বর্তমান জামাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছেন, সেইজন্যে
সেই ছেলে প্রচণ্ড খেপে রয়েছে, এখন শেফালি বেড়াতে আসায় সুযোগ পেয়ে শেফালির বাচ্চাকে নিষ্ঠুরভাবে মেরে শোধ নিয়েছে। এমন ঘটনা কিন্তু অনেক জায়গায়ই ঘটেছে।
না, ছার, শেফালির বিয়া নিয়া এমন কোন ঝামেলা হয় নাই।' কাল রাতে বাড়িতে আপনারা মোট কজন লোক ছিলেন এবং কে কে?
সীমা এবারে বলে উঠল, 'আমি মা'র, সাদেক ভাইজানে, শেফালি আফায় আর দুলাভাই। ছোট্ট বাবুটারে নিয়া মোট ছয় জন "তোমার সাদেক ভাইজানে কোথায়?
তাকে যে দেখছি না?'
ওসি সাহেবের এই প্রশ্নে মারুফা বেগম আর সীমার এতক্ষণে খেয়াল হলো সত্যিই তো, ভোর থেকে বাড়িতে এত লোকজন, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে, কিন্তু একটি বারের জন্যও সাদেককে কোথাও দেখা যায়নি!
সীমার কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে ওসি সাহেব বললেন, যাও তো, তোমার সাদেক ভাইজানকে ডেকে আনো।' সীমা ওসি সাহেবের সামনে থেকে উঠে
সাদেকের খোঁজে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর সীমা এসে বলল, "ভাইজান হের ঘরের ভিতরে, দরজা বন্ধ। বাইরে থেইকা জোরে জোরে ডাক দিয়া কইছি আপনে যে তারে ডাকতেছেন। হে ভিতর থেইকা কইছে-হের গায়ে খুব জ্বর, হে বিছানা থেইক্যা উঠতে পারবে না।
ওসি সাহেব চিন্তিত, গলায় বললেন, 'ঠিক আছে, আমাকে তোমার ভাইজানের রুমের দরজার সামনে নিয়ে চলো।'
ওসি সাহেব সীমার পিছু-পিছু সাদেকের কামরার দরজার সামনে গিয়ে, জোরে-জোরে দরজায় টক টক শব্দ তুলে বললেন, 'সাদেক, তোমার যেহেতু খুব জ্বর, বেশি সময় নেব না, দুই মিনিট কথা বলেই চলে যাব। একটু কষ্ট করে উঠে দরজাটা খুলে দিয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ো। শুয়ে শুয়েই তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দেবে।
ভিতর থেকে সাদেকের রুক্ষ, খসখসে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'ওসি সাব, হুধাহুধি
আমারে জ্বালাইয়েন না। আমার গায়ে এত জ্বর, ওঠবার মতন অবস্থা নাই। যা জিগানের ওহানে থেইক্যাই জিগান।
"তোমার সেবা-শুশ্রূষারও তো প্রয়োজন আছে। দরজা না খুললে কেউ তোমার সেবা- শ্রেষাই বা করবে কী করে?
কারও সেবা-যত্নের দরকার নাই আমার। আফনের যা জিগানের জিগাইয়া এহান থেইক্যা যান।'
ওসি সাহেবের মনে সন্দেহ ঘনীভূত হলো। তিনি নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন, সাদেক ছেলেটা তাঁর সাথে দেখা দিতে চাইছে না কেন?! গলার স্বর শুনে তো মনে হচ্ছে না ততটা জ্বর। বরং গলার স্বরে তেজী একটা ভাব। এই ছেলের মধ্যে কোন ঘাপলা থাকতে পারে। কাল আবার এসে সাম- নাসামনি ভালভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কারও মুখ না দেখে এভাবে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব নয়। ওদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বাচ্চাটির লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য সদরের হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হবে।
ওসি সাহেব সাদেকের বন্ধ কামরার সামনে থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় তাঁর চোখ পড়ল দরজার একটা ছোট্ট ফুটোতে। তিনি সঙ্গে-সঙ্গে সেই ফুটোয় চোখ রাখলেন কামরার ভিতরটা দেখার জন্য। কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না। কারণ কামরার ভিতরটা ঘোর অন্ধকার। তবে গা গুলিয়ে ওঠার মত ঝাঁজাল টকটক বিদঘুটে একটা পচা গন্ধ মৃদুভাবে নাকে ধাক্কা মারল।
চার
ওসি সাহেব বাচ্চাটির লাশ সদরের হাসপাতালে পাঠানোর জন্য ভ্যান চালক রমজান মিয়াকে ঠিক করেছেন। রমজান মিয়া তার রিকশা ভ্যানে করে লাশটি সদরের হাসপাতালে নিয়ে যাবে। অপঘাতে মৃত্যুর লাশ সদরের হাসপাতালে নিয়ে যাবার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে রমজান মিয়ার।
রমজান মিয়া দশাসই চেহারার বলিষ্ঠ
দেহের অধিকারী এক লোক। ডর-ভয়, কোনও
কিছুই তার মধ্যে নেই। গভীর রাতে নির্জন
রাস্তা ধরে ভ্যান চালালেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না সে। বরং নির্জনতা সে উপভোগ করে। সন্ধ্যা হবার খানিক পরে সে বাচ্চাটির লাশ ভ্যানে তুলে সদরের হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেয়। ভ্যানের সামনে একটি হারিকেন ঝোলানো। হারিকেনের মৃদু আলোতে সে অন্ধকার পথ ধরে এগিয়ে চলছে। মাঝে-মাঝে লুঙ্গির কোঁচড় থেকে বিড়ি বের করে, বিড়ি ধরিয়ে টানতে টানতে এগোচ্ছে।
ওসি সাহেব রমজান মিয়ার সঙ্গে একজন কনস্টেবলকে দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রমজান মিয়া তাতে রাজি হয়নি। কারণ একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিলে শুধু তাকে একজন লোকের বাড়তি ওজন বহন করতে হত। তার চেয়ে এ-ই ভাল-ছোট বাচ্চার হালকা দেহটা বয়ে নিতে, তার মোটেই কষ্ট হচ্ছে না। মৃদুভাবে ভ্যানের প্যাডেল চেপেই কত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
রহমতখালির হেরিংবোণ্ডের রাস্তা ধরে কিছুটা এগনোর পর রমজান মিয়ার মনে হলো, পিছনের লাশটির ওজন হঠাৎ যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। যেন কোন বাচ্চার লাশ নয়, মোটাসোটা অনেক ভারি বয়স্ক লোকের লাশ। চলন্ত অবস্থায়ই রমজান মিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। পিছনে হারিকেনের আলো তেমন পৌঁছচ্ছে না। এর পরেও অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, সাদা কাপড়ে মোড়ানো বাচ্চার লাশটি যে অবস্থায় রেখেছে সেই অবস্থায়ই পড়ে রয়েছে। রমজান মিয়া ভাবল, ড্যানের কোন চাকার হাওয়া হয়তো কমে গেছে, তাই ভ্যান তারি লাগছে।
রমজান মিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক জোর দিয়ে ভ্যানের প্যাডেল চাপছে। আগের মত হালকাভাবে চাপলে ভ্যান তেমন এগোচ্ছে না।
ধীরে-ধীরে ওজন যেন বেড়েই চলেছে। রমজান মিয়া ভ্যানের প্যাডেল চাপায় জোর বাড়াতে বাড়াতে ঘেমে নেয়ে উঠেছে। বিড়বিড় করে ভ্যানটাকে গালি-গালাজ করছে, "শুয়োরের বাচ্চায় নষ্ট হওয়ার আর জায়গা
পাইল না। প্রত্যেক দিন শুয়োরের বাচ্চার যত্ন নেই-পাম দেই, তেল দেই, $ টাইট দেই...হের পরও হালায় খ্যাপ নেবার সময়ই বিগড়াইবে....
হঠাৎ রমজান মিয়া যেন ভ্যানের পিছনে একটু নড়াচড়া টের পেল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। না, কিচ্ছু না! সাদা কাপড়ে মোড়ানো বাচ্চার লাশটি তেমনই নিথর পড়ে রয়েছে।
ক্রমে ভ্যানের গতি কমেই চলেছে। মনে হচ্ছে, পিছন থেকে কেউ যেন ভ্যানটা টেনে ধরেছে। পরিশ্রান্ত রমজান মিয়া ভাবল, ভ্যান থামিয়ে চাকাগুলো পরীক্ষা করে দেখবে কোথায় ঘাপলাটা হলো।
ভ্যানটা থামানোর সাথে সাথে ঝড়ো হাওয়ার মত জোরালো একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। সেই হাওয়ার তোড়ে হারিকেনটা দপ করে নিভে গেল। রমজান মিয়া মোটেও বিচলিত না হয়ে কোঁচড় থেকে দেয়াশলাই বের করল হারিকেনটা আবার জ্বালানোর জন্য।
আশ্চর্য! প্রতিবারই দেয়াশলাইয়ের কাঠি ঠুকে ধরানোর সাথে-সাথে এক চিলতে তীব্র হাওয়া ঠিক জ্বলন্ত কাঠি বরাবর বয়ে গিয়ে ওটা নিভিয়ে দিচ্ছে। দু'হাতের তালু দিয়ে আড়াল করেও দু-এক সেকেণ্ডের বেশি সময় কাঠি জ্বেলে রাখাই যাচ্ছে না।
একের পর এক দেয়াশলাইয়ের কাঠি ঠুকে ঠুকে হারিকেন জ্বালানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে-করতে এক পর্যায়ে উত্তেজিত রমজান মিয়ার মনে হলো, কে যেন পিছন থেকে সীসার মত ভারী আর বরফের মত ঠাণ্ডা একটা হাত তার কাঁধের উপর রেখেছে। ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে সে পিছনে তাকাল। না, কেউ নেই-মনের ভুল!
একে-একে দেয়াশলাইয়ের সব কাঠি ফুরিয়ে গেল, কিন্তু হারিকেনটা আর জ্বালানো গেল না। রমজান মিয়া হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়াল। আকাশে ভাঙা চাঁদ। লুঙ্গির খুট তুলে ঘামে ভেজা মুখটা মুছতে-মুছতে ভাবল, বাকি পথটা কোনমতে কষ্ট-ক্লেশে চাঁদের আলোতেই পাড়ি দেবে। ভ্যানটা চালাতে যদি বেশি কষ্ট হয় তা হলে না চালিয়ে হেঁটে-হেঁটে ভ্যান টেনে নিয়ে এগোবে।
রমজান মিয়া আবার ভ্যানটা চালাতে শুরু করল। অনেক জোর খাটিয়ে চালাতে হচ্ছে। ভ্যানের চাকা কাদায় দেবে গেলে যেমন জোর খাটাতে হয় তেমনি ।
কনস্টেবল ব্যাটারে সঙ্গে নিয়ে এলেই ভাল হত। ওই ব্যাটারে দিয়ে এখন ড্যান ঠেলানো যেত। তখন যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেত, পথের মাঝে ভ্যানটা এমন বিগড়াবে...এসব ভাবতে-ভাবতে গায়ের ঘাম ঝরিয়ে একটু একটু করে সামনে এগোচ্ছে রমজান মিয়া।
আবার রমজান মিয়ার মনে হলো, ভ্যানের পিছনে কিছু নড়াচড়া করছে। সেই সঙ্গে ছোট বাচ্চার চাপা কান্নার শব্দও পাচ্ছে। কোন বাচ্চার মুখ আলতোভাবে চেপে ধরলে বা মুখে কাপড় বেঁধে দিলে কান্নার শব্দটা যেভাবে বেরোবে ঠিক তেমন। রমজান মিয়া মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল । চমকে কেঁপে উঠে ভয়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। এ কী দেখছে সে?! সাদা কাপড়ে মোড়ানো পোটলার মত অবয়বটার ভিতরে বাচ্চার লাশটা নড়ছে এবং কান্নার শব্দটাও নিঃসন্দেহে ওই পোঁটলার ভিতর থেকেই বের হচ্ছে। ভয়ে রমজান মিয়ার হাত-পা অবশ হয়ে যেতে লাগল। লাশটার নড়াচড়া আরও বেড়েছে। ভ্যানের পাটাতনের উপর এখন গড়াগড়ি দিচ্ছে। গড়াগড়ির তোড়ে থেমে থাকা ভ্যানটায় ক্যাচক্যাচ শব্দ হচ্ছে। এক পর্যায়ে সাদা কাপড়ে মোড়া পোঁটলাটা শুয়োপোকার মত ঢেউ খেলে খেলে দ্রুত গতিতে রমজান মিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। 'ও, আল্লাগো' বলে বিকট চিৎকার দিয়ে রমজান মিয়া ভ্যানের সিট থেকে লাফিয়ে নীচে নামতে গেল। কিন্তু পা হড়কে হুমড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ল। লাশটাও ভ্যানের উপর থেকে লাফিয়ে নীচে পড়ে একই ভঙ্গিতে গুঁয়োপোকার মত ঢেউ খেলে খেলে রমজান মিয়ার দিকে তেড়ে যেতে লাগল। ভয়ে- আতঙ্কে তটস্থ রমজান মিয়া হাঁচড়ে-পাঁচড়ে কোনক্রমে উঠে দাঁড়াতেই ওঁয়োপোকার মত ঢেউ খেলানো সাদা পোঁটলার কাপড় ফেটে ভিতর থেকে তড়িৎ গতিতে ছিটকে বেরিয়ে পড়ল পশুর মত কালো-কালো লোমে আবৃত
অস্বাভাবিক লম্বা বলিষ্ঠ একটা হাত। সেই হাতের লম্বা-লম্বা আঙুল আর আঙুলের মাথায় পাখির ঠোঁটের মত কিছুটা বাঁকানো, সুচাল, তীক্ষ্ণ নখগুলো খামচে ধরল রমজান মিয়ার পা। এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল মাংস। ফিনকি দিয়ে বেরোতে লাগল রক্ত। রমজান মিয়ার আর্তচিৎকার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কিন্তু সেই চিৎকার শোনার জন্য আশপাশে দু-তিন মাইলের মধ্যে কেউ নেই।
পা চেপে রেখেই সাদা রঙের লাশের পোঁটলাটা ওঁয়োপোকার মত ঢেউ খেলে খেলে উঠে পড়ল চিত হয়ে থাকা রমজান মিয়ার বুকের উপর। রমজান মিয়ার মনে হচ্ছে, বুকের উপর যেন একটা পাহাড় চেপেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
রমজান মিয়ার বুকের বাম পাশটায় পাখির ঠোঁটের মত সুচাল তীক্ষ্ণ নখযুক্ত হাতটা মাংস ভেদ করে ঢুকে গেল। রমজান মিয়ার গলা ফাটানো মরণ চিৎকারের মাঝেও বুকের পাঁজরের হাড় ভাঙার মৃদু মটমট শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই পিশাচের রক্ত মাখা হাতটা রমজান মিয়ার বুকের ভিতর থেকে বের হলো, লাফাতে থাকা রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে।
পাঁচ
রহমতখালির হেরিংবোণ্ডের রাস্তার উপর রমজান মিয়ার নিথর লাশটা পড়ে রয়েছে। লাশের মুখটা হাঁ হয়ে জিভ আধ হাতের মত বেরিয়ে এসেছে। স্থির চোখ দুটো সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায়। সেই চোখে ফুটে রয়েছে তীব্র ভয় আর, আতঙ্কের স্পষ্ট অভিব্যক্তি। বুকের বাম পাশে দগদগে গভীর গর্ত। সেই গর্ভ সংলগ্ন লাশের বুকে, পেটে, পাশ ঘেঁষে রাস্তায় গড়ানো থিকথিকে ঘন রক্তের আস্তরণ। বাম পা-টাও তীক্ষ্ণ কিছু দিয়ে ফালা ফালা করা হয়েছে। পায়ের কাছের রাস্তাতেও থিকথিকে রক্তের আস্তরণ।
রমজান মিয়ার লাশ থেকে আট-দশ হাত দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তার রিকশা ভ্যানটা। ড্যানের পাটাতনের উপর গত রাতে সে যে বাচ্চার লাশটি নিয়ে সদরের হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল সেই লাশটি। সাদা
কাপড়ে মোড়ানো বাচ্চার লাশটি ঘিরে ভন ভন করে মাছি উড়ছে।
শত-শত লোক, কমপক্ষে বিশ-পঁচিশ হাত দূরত্ব বজায় রেখে চারদিক ঘিরে গোল হয়ে ভীত-আতঙ্কিত চোখে এই দৃশ্য দেখছে। কিছুক্ষণের মধ্যে রায়পুর থানার ওসি সাহেব চার-পাঁচজন কনস্টেবল নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছলেন।
সব কিছু অনেকক্ষণ ধরে বিজ্ঞের মত পর্যবেক্ষণ করে ওসি সাহেবের মনে হলো, নিশ্চয়ই মস্তিষ্ক বিকৃত কেউ এ কাজ করছে। গতকাল বাচ্চাটাকে যে মেরেছে সেই একই খুনি। বাচ্চাটাকে যেভাবে হৃৎপিত ছিঁড়ে মারা হয়েছে, রমজান মিয়াকেও সেই একই ভাবে। মস্তিষ্ক বিকৃত খুনিটা একাধারে প্রচণ্ড মূর্খ, বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী। তা না হলে রমজান মিয়ার মত অমন দশাসই একটা লোককে ঘায়েল করা সহজ ব্যাপার নয়।
ওসি সাহেবের ঘোর সন্দেহ হচ্ছে সাদেক নামের ছেলেটাকে। শুনেছেন, ওই ছেলেটা নাকি বেশ বলবান এবং ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী। এমন মস্তিষ্ক বিকৃত সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় হয়েছে। কোন কারণ ছাড়াই এরা নির্মম নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে মানুষ হত্যা করে। এবং প্রতিটা হত্যাকাণ্ডে প্রায় একই পদ্ধতি ব্যবহার করে। কেউ গলা কেটে ফাঁক করে দিয়ে, কেউ পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি, কলিজা টেনে বের করে, কেউ হাত-পায়ের শিরা কেটে দিয়ে, কেউ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, কেউ গলা টিপে, কেউ আগুনে পুড়িয়ে, কেউ উঁচু জায়গা থেকে ফেলে দিয়ে...যেমন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার জ্যাক দ্য রিপার গ কেটে শ্বাসনালী ফাঁক করে মারার পর কিছু ক্ষেত্রে জিগস পাজলের মত ছোট-ছোট টুকরো করত। বাংলাদেশের রসু খা গলা টিপে হত্যা করে, চটের বস্তায় ভরে লাশ নদীতে বা কোন জলাশয়ে ফেলে দিত
অনেক ঝামেলা আর ব্যস্ততার মধ্যে ওসি সাহেবের দিন কাটল। রমজান মিয়া এবং বাচ্চাটির লাশ সদরের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে
অবিলম্বে বাচ্চার লাশটি পোস্টমর্টেম করার ব্যবস্থা করেন। কারণ লাশটায় পচন ধরে গিয়েছিল। লাশটি পোস্টমর্টেম করা শেষে আবার তৎক্ষণাৎ লাশটি বাচ্চার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বের হবে কাল। ওদিকে শোকে মুহ্যমান দরিদ্র রমজান মিয়ার পরিবার- পরিজনকে আশ্বাস দেন, রমজান মিয়া যেহেতু একটি সরকারী কাজের সহায়তা করতে গিয়ে খুন হয়েছে তাই সরকার থেকে কিছু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করবেন।
ওসি সাহেবের খুব ইচ্ছে ছিল বাচ্চাটির মামা সাসপেক্টেড সাদেকের সাথে একবার দেখা করার। কাল সাদেক ছোকরা জুরের অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গিয়েছে, আজ ব্যাটাকে প্রশ্নবাণে বেঁধে ফেলা অত্যাবশ্যক ছিল। খুব সম্ভব ওই ব্যাটাই মস্তিষ্ক বিকৃত সিরিয়াল কিলার। যত শীঘ্রি সম্ভব ও ব্যাটাকে আট-ঘাট বেঁধে পাকড়াও করা দরকার। না হলে আরও দু'একটা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় ওসি সাহেবের আর সাদেকের বাড়ি যাওয়া হলো না।
পোস্টমর্টেম শেষে ভর দুপুরে বাচ্চার লাশটি এসে সাদেকদের বাড়িতে পৌঁছবার পর অতি দ্রুত লাশটি দাফন করার ব্যবস্থা করা হয়। লাশটি থেকে পচা গন্ধ বেরুচ্ছিল। বিকেল হবার আগেই সাদেকদের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে লাশটি দাফন হয়ে যায়। দাফন শেষে বাচ্চাটির শোকাচ্ছন্ন মা-বাবা অর্থাৎ সাদেকের বড় বোন শেফালি এবং শেফালির স্বামী, সাদেকদের বাড়ি ছেড়ে তাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। তাদের সঙ্গে সাদেকের ছোট বোন সীমাও যেতে চেয়েছিল। সীমার ইচ্ছে ছিল, কিছুদিন বোন-দুলাভাইয়ের সাথে থেকে ছেলে হারানোর বেদনায় কাতর বোন- দুলাভাইকে সঙ্গ দেবে। কিন্তু তাদের মা মারুফা বেগম তাকে যেতে দিলেন না। কারণ, তাঁর নাকি খুব ভয় ভয় লাগছে। সীমা ওদের সঙ্গে গেলে বাড়িতে তিনি আর সাদেক ছাড়া কেউ থাকবে না । সাদেকের ভরসা কী সাদেক
তো তার কামরা থেকেই বের হচ্ছে না। এই যে লাশ দাফন-কাফন করা হলো, বাড়ি জুড়ে এত লোক, কিন্তু একটিবারের জন্যও সাদেকের দেখা পাওয়া গেল না।
ছ সন্ধ্যার পর সাদেকদের বাড়ি থেকে লোকজন কমে যেতে লাগল ।
রাত দশটা। বাড়িতে এখন বাইরের মানুষ আর কেউ নেই। প্রতিবেশীরা যে যার বাড়িতে চলে গেছে। মারুফা বেগমের ভয় ভয় অনুভূতিটা আরও বেড়েছে। তিনি ভয়ে কেমন গুটিসুটি মেরে গেছেন।
-ঘুমাবার জন্য মারুফা বেগমের বিছানায় মারুফা বেগম আর সীমা পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। মারুফা বেগমের খুব ভয় লাগছে বলে সীমা তাঁর সাথে শুয়েছে। বিছানার পাশে টেবিলের উপর একটা হারিকেন নিভু নিভু অবস্থায় জ্বেলে রাখা হয়েছে। তাতেও মারুফা বেগমের ভয় কমছে না।
শুয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সীমা গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে। বলতে গেলে গত দু'দিন তাদের ঠিক মত ঘুম, খাওয়া, নাওয়া কিছুই হয়নি।
মারুফা বেগমের চোখে ঘুম নেই। তিনি শঙ্কিত মনে আকাশ-পাতাল ভাবছেন। গ্রামের প্রায় সব লোকের ধারণা, শেফালির বাচ্চা এবং রমজান মিয়ার মৃত্যু কোন মানুষের হাতে হয়নি, ভূত-প্রেত বা দৈত্য-দানবের কাজ। মারুফা বেগমের ধারণাও তাই। বহু বছর আগে বেলাল নামে এক কাঠ মিস্ত্রির লাশ পাওয়া গিয়েছিল রহমতখালির জলার মধ্যে। হাঁটু সমান জলার পানিতে বেলাল লোকটাকে উল্টো করে মাথা থেকে প্রায় বুক পর্যন্ত কাদার ভিতরে পুঁতে রাখা হয়েছিল। বুকের নীচের অংশ, অর্থাৎ পেট, কোমর, পা পানির উপরে কলাগাছের মত সোজা হয়ে সিঁটিয়ে ছিল। সেই সময়ও সবাই বলাবলি করেছে ভূত-প্রেত বা দৈত্য-দানব এমনটা করেছে। পরশু রাতে সাদেক বাড়ি ফিরেছে পানি-কাদায় মাখামাখি হয়ে। সেই যে সাদেক নিজের কামরায় ঢুকে দরজা বন্ধ করেছে আর দরজা খোলেনি। তবে
কি সাদেকের ওপর কোন ভূত-প্রেত ভর করেছে?। এ কথা ভাবতেই ভয়ে মারুফা বেগম কেঁপে উঠলেন। পাশের কামরায়ই সাদেক রয়েছে। সাদেকের সাথে পিশাচটাও!! মারুফা বেগমের বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল ।
ভীত-সন্ত্রস্ত মারুফা বেগম শুয়ে শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবতেই থাকলেন। কান খাড়া করে রইলেন, সাদেকের কামরা থেকে যদি অস্বাভাবিক কিছু শোনা যায়। এক পর্যায়ে ক্লান্তিতে তাঁর চোখে তন্দ্রাবেশ এল। হঠাৎ তন্দ্রার মাঝে শুনতে পেলেন, সাদেকের কামরা থেকে কুকুরের কান্নার মত একটা শব্দ ভেসে আসছে। ধড়মড় করে সঙ্গে-সঙ্গে উঠে বসলেন। বুকের ভিতরে দুরমুশ পড়তে লাগল। কোনমতে পাশে ঘুমানো সীমাকে ঠেলেঠুলে উঠিয়ে ফিসফিস করে বললেন, 'ও, সীমা, হুনছিস, সাদেকের ঘর থেইকা কুত্তার কান্দনের লাহান কেমন আওয়াজ
আইতেছে!!!' সীমা কিছুটা বিরক্ত ভঙ্গিতে ঘুম জড়ানো গলায় বলল, 'ভাইজান মনে হয় বাবুর লইগ্যা কানতেছে।'
ভীত গলায় আবার মারুফা বেগম ফিসফিস করে বললেন, 'মানুষ অমন কইরা কান্দে নাহি!! মনে হয় অন্য কিছু!!!'
'ধুর, মা, তোমার যত্তসব আজগুবি ভাবনা! মনে হয় ঠাণ্ডা-জ্বরে ভাইজানের গলা বইয়া গেছে। তাই হের কান্দন ওইরহম হুনাইতেছে।' বিছানা থেকে নামতে নামতে সীমা বলল, 'আমি গিয়া দেইখা আসি।'
মারুফা বেগম আতঙ্কিত গলায় বলে
উঠলেন, 'না, তুই যাইস না!! কী না কী! খুব
ডর লাগতেছে।'
সীমা টেবিলের উপরের হারিকেনটার আলো বাড়িয়ে সাদেকের কামরার দিকে গেল ।
এদিকে এ ঘরে অন্ধকারে মারুফা বেগম কান খাড়া করে কাঠ হয়ে রইলেন। সীমার নিয়ে যাওয়া হারিকেনের আলোর হালকা একটু আভা চুইয়ে-চুইয়ে এ ঘরেও আসছে। তাই এ ঘরটা ঠিক গাঢ় অন্ধকার নয়।
মারুফা বেগম শুনতে পাচ্ছেন, সীমা সাদেকের কামরার দরজায় ঠকঠক শব্দ করে বলছে, 'ভাইজান, তোমার কী হইছে?! অমন কইরা কানতেছো ক্যান? জ্বর বাড়ছে? দরজাড়া খোলো দেহি।' দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। হারিকেন থেকে আসা হালকা আভাটা বিলীন হয়ে গেল। বোধহয় সীমা হারিকেন নিয়ে সাদেকের কামরার ভিতরে ঢুকে পড়েছে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর হাত থেকে কিছু পড়ে যাবার শব্দের সাথে সীমার গগনবিদারী আর্তনাদ। আর্তনাদের পর কারও দম আটকানোর মত ঘড়ঘড় শব্দ। আলোর আভাটা এখন আরও উজ্জ্বলভাবে দেখা যাচ্ছে। আলো বেড়েই চলছে । মারুফা বেগম কাঁপতে-কাঁপতে আলো-আঁধারির মাঝে হাতড়ে হাতড়ে কোনক্রমে সাদেকের কামরার দরজার সামনে গিয়ে যা দেখলেন তাতে তিনি সঙ্গে-সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
অজ্ঞান হবার আগে মারুফা বেগম দেখেছেন, সাদেকের কামরা ভর্তি উজ্জ্বল আলো। কারণ সীমার হাতের হারিকেনটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গিয়ে ঘরে আগুন লেগেছে। আর দাউ-দাউ করে বেড়ে ওঠা সেই আগুনের আলোতে দেখতে পান, সীমা মেঝেতে পড়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় তড়পাচ্ছে। সীমার বুকের বাম পাশে গর্তযুক্ত দগদগে একটা ক্ষত। সেই ক্ষত বেয়ে রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরের মেঝে তড়পানোরত সীমার পাশে বসে দীর্ঘদেহী, মিশমিশে কালো, শূকরের মত লম্বাটে মুখ- মণ্ডলের একটা পিশাচ সীমার বুক থেকে ছিঁড়ে
নেয়া রক্তে রঞ্জিত জীবন্ত লাফাতে থাকা হৃৎপিণ্ডটা, সুচাল লম্বা-লম্বা দাঁত দিয়ে কামড়ে- কামড়ে চপ-চপ করে খাচ্ছে।
পরিশিষ্ট
বাড়িতে আগুন লেগে সেই রাতে সাদেক, মারুফা বেগম, সীমা, তিনজনই মারা যায়। পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে তাদের তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করার পর পোড়া, কোঁকড়ানো, বিকৃত লাশ তিনটি দেখে চেনার উপায় ছিল না কোনটি কার লাশ। ডি.এন.এ পরীক্ষায় শনাক্ত হয় কোনটা কার লাশ। পোস্টমর্টেম করার সময় দেখা যায়, সাদেক এবং সীমার লাশ দুটির হৃৎপিণ্ড নেই। খুবলে বুকের পাঁজর ভেঙে কেউ তাদের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়েছে। তাদের মৃত্যু আগুনে পুড়ে হয়নি, হয়েছে আগুনে পোড়ার আগেই হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নেয়ায়। এর চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার, সাদেকের মৃত্যু আগুন লাগার সেই রাতের দু'দিন আগেই হয়েছে। অর্থাৎ, শেফালির বাচ্চার মৃত্যুর আগের রাতে।
ওসি সাহেব সিরিয়াল কিলার হিসেবে সন্দেহ করছিলেন সাদেককে ৷ কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে সাদেকের মৃত্যু আগুন লাগার দু'দিন আগেই হয়েছে বলে উল্লেখ করায় সন্দেহটা গিয়ে পড়ে মারুফা বেগমের উপর। কারণ একমাত্র মারুফা বেগমের মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে, হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নেয়ায় নয়। এই জন্যে ওসি সাহেবের ধারণা হয়, মারুফা বেগমই সেই বিকৃত মস্তিষ্কের সিরিয়াল কিলার ছিল-যে প্রত্যেকের হৃৎপিণ্ড কোন ধারাল অস্ত্র দিয়ে খুবলে তুলে তুলে হত্যা করেছে। এর পরে সেই রাতে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহনন করে বা কোন কারণে ঘরে আগুন লেগে পুড়ে নিজেও মারা -যায়। কিন্তু সবকিছুর পরেও একটা ব্যাপার ঘোলাটেই থেকে যাচ্ছে। সাদেক যদি শেফালির বাচ্চার মৃত্যুর আগের রাতে মারা গিয়ে থাকে, তা হলে বাচ্চাটার মৃত্যুর দিন সাদেকের বন্ধ কামরার সামনে দাঁড়িয়ে ওসি সাহেব কার সাথে কথা বলেছেন? কার গলার স্বর শুনেছেন? এক্ষেত্রে ওসি সাহেবের
যুক্তি-আবার কে? মারুফা বেগমই সাদেকের গলার স্বর নকল করে কথা বলেছে। সাধারণত সিরিয়াল কিলাররা এমন ধূর্ত স্বভাবেরই হয়। কিন্তু ছয় মাসের মাথায়ই ওসি সাহেবের এসব ধারণাও আবার বদলাতে হয়। কারণ ছয় মাসের মাথায় পোড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সাদেকদের পরিত্যক্ত বাড়ির ভিতরে আবার এক গ্রামবাসীর লাশ পাওয়া যায়। এই লোকটিরও মৃত্যু ঘটানো হয় হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে।
ওসি সাহেব এখন খুব সতর্কতার সাথে তদন্ত করছেন। কারণ, তাঁর পূর্বের ধারণাগুলো ভুল প্রমাণ হয়েছে। বিকৃত মস্তিষ্কের সিরিয়াল কিলার এখনও জীবিত।
মাঝ রাত। ওসি সাহেব একা একা গোপনে তদন্তের উদ্দেশ্যে সাদেকদের আগুনে পুড়ে ফাংস হওয়া জনমানবহীন পরিত্যক্ত বাড়িটার- ভিতরে ঘোরাঘুরি করছেন। দু'দিন আগেও হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নেয়া একটা লোকের মৃতদেহ পাওয়া গেছে এই বাড়ির ভিতরে। সিরিয়াল কিলারটা একের পর এক খুন করেই যাচ্ছে। কিলারটা হয়তো এবাড়িরই কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। ওসি সাহেব মোটেও ভীত নন, তাঁর কোমরে রয়েছে একটা অত্যাধুনিক পিস্তল। ঘাতকটাকে দেখা মাত্র গুলিতে ঝাঝরা করে দেবেন তার বুক।
সুবিশাল বাড়ির ভিতরটা ঘুরে-ঘুরে এক পর্যায়ে ওসি সাহেব এসে বাড়ির কবরস্থানের সামনে দাঁড়ালেন। আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোতে নীরব-নির্জন কবরস্থানটা কেমন খাঁ-খাঁ করছে। এই কবরস্থানেই কবর দেয়া হয়েছে সাদেক, মারুফা বেগম, সীমা আর শেফালির বাচ্চাকে।
ওসি সাহেব কিছুক্ষণ কবরস্থানের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উল্টো ঘুরে ফিরে যেতে লাগলেন। ঠিক তখনই সাদেকের কবরের মাটি কুঁড়ে কবরের ভিতর থেকে বের হলো পোড়া, কুচকুচে কালো একটা হাত মেলে ধরা হাতটার অস্বাভাবিক লম্বা- লম্বা আঙুলগুলো পাখির ঠোঁটের মত সামান্য বাঁকানো, সুচাল আর তীক্ষ্ণ নখযুক্ত ।


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন