হায়রে বাঙ্গালি
কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট। অপেক্ষা করছি ঢাকাগামী মালয়েশিয়ান-প্লেনের জন্য। সুটেড- বুটেড হাই ক্লাস এক ভদ্রলোক চেঁচিয়ে বলছেন, ‘কারও কাছে বাংলাদেশি এক টাকার কয়েন হবে?' ওই কয়েন সাইজ আর ওজনে দশগুণ বেশি মূল্যমানের স্থানীয় কয়েনের বদলে টেলিফোন বক্স-এ নাকি ব্যবহার করা যায় এবং উনি (?) নাকি বহুবার করেওছেন।
কিছু বলতে চাইলাম, কিন্তু আমার স্ত্রী নিষেধ করলেন, “তাকে চেন না । ঢাকায় নামলে হাত পা ভেঙে দেবে মেরে...' অক্ষমতায় চুপ করে থাকলাম ।
(১) সিরাজগঞ্জ শহরে তখন শত শত ট্রাক পাথর এনে যমুনা নদীর তীরে ফেলছে পরে নৌকায় ওপারে ব্রিজ এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। HAM-এর এক বিদেশি ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করার জন্য দুপুরের পর ওইরকম এক পাথরবাহী নৌকায় পার হলাম এবং বিকেলে ওই রকম খালি নৌকায় ফেরৎ আসছিলাম। অনেক শ্রমিক কাজ শেষে ফিরে আসছে-আবার কাল সকালে যাবে। একটু ভাল করে বসার জন্য পাশেই রাখা এক শ্রমিকের এক বাটির টিফিন বক্স ঠেলা দিয়ে সরাতে গিয়েই চমকে উঠলাম, এত্তো ভারী। কিন্তু এখন তো খালি থাকার কথা! পীড়াপীড়ি করতেই খুলে দেখাল প্রকাণ্ড এক স্টীলের নাট। এটা গলিয়ে দুটো ভাল কুড়াল বানানো যায়।
(২) প্রায়ই চোখে পড়ে কোনও এক গৃহবধূ বা বৃদ্ধা মহাসড়কের পাশে ঝাড় দিচ্ছে। ভাবছেন নিখাদ দেশপ্রেম থেকে পরিষ্কার পরিছন্নতার মহান স্বেচ্ছাশ্রম? আমিও তাই ভাবতাম, অন্তত সেদিন পর্যন্ত, যেদিন আমি বগুড়া থেকে বন্ধুর সঙ্গে গাড়িতে আসছিলাম। ওই রকম এক বৃদ্ধাকে দেখে গাড়ি থামাতেই সে তড়িঘড়ি করে চলে যেতে উদ্যত হলো। দৌড়ে পথ আটকাতেই তার কাঁদো কাঁদো চেহারা হলো। কাঁধে বাঁশের ঝুড়ি ভর্তি মুড়ো ঝাঁটা দিয়ে রাস্তার পাশ থেকে খসানো খোয়া! জিজ্ঞেস করতেই বলল, 'ঢেঁকির গলুই ভাইঙ্গা গেছে, একটু সিমিট (সিমেন্ট) দিয়া লাগামু।' ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ভঙ্গীমায় পালিয়ে বাঁচল। আর এক মহিলা ছাগল নিয়ে যাচ্ছিল, তার সত্যতা যাচাই করার জন্য সব কথা বলতেই সে ফোঁস করে জ্বলে উঠল, 'ওই বুড়ি? এক নাম্বারের চোর। ওর জ্বালায় একটা ইটও রাখা যায় না । ওর বাড়িতে চলেন-রাজ্যের ভাঙা ইট আর খুয়া! তিরিশ-পঁয়ত্রিশ টাকা ঝুড়ি বেচে।'
(৩) যমুনা ব্রিজ হবার বেশ ক'বছর পর ব্রিজের পশ্চিম পাশে এক গ্রাম্য সচ্ছল লোকের বাড়ি গেছি। টিনের ঘর কিন্তু পাকা মেঝে। মেঝেতে এক কালারের পুরু কার্পেট। ঠিক চেনা চেনা
লাগলেও চিনতে পারলাম না। সম্ভবত প্লেনের ফ্লোরে বিছানো হয়। আমার উৎসুক দৃষ্টি দেখে গৃহকর্তা বলে উঠলেন, 'ঠিকই ধরছেন। জিনিস, বটে। ১০০ বৎসরের গ্যারান্টি। পানির মধ্যে থাকলে, শুকনায় ৫০০ বৎসর। ব্রিজ করার সময় নদীর দুই পাড়ে পাতার জন্য আনা বিদেশি মাল। শালার বাঙালি লেবাররা অর্ধেক পাছে অর্ধেক নদীর মধ্যে ডুবাইয়া রাখছে-রাইতে যায়া তুইলা আনছে। এই টুকরা (আনুমাণিক ২০ ফুট গুণ ১৫ফুট) ৫০০ চাইছিল, ২০০ দিছি।'
(৪) রোজার ছুটিতে প্রায় মাস খানেক উত্তর ভারতে ঠাণ্ডায় প্রায় জমে গিয়ে ২৫/২৬ রোজার দিকে বর্ডার পার হয়ে দর্শনা স্টেশনে পৌঁছলাম। ট্রেনের সময় হয়ে যাচ্ছে, অথচ টিকিট কাউন্টারে কোনও লোক নেই-উনি বাইরে রোদ পোহাচ্ছেন। প্রথমে টিকিট দিতে উঠতেই চাইলেন না, বললেন, 'টিকিট লাগবে না। ট্রেনে-এ উঠে টিটিকে ম্যানেজ করলেই হবে।' পীড়াপীড়িতে উঠলেন এবং বিরস বদনে আড়াই টিকিট দিলেন। ঈদের কয়েকদিন আগে, তাই চিনি ও গরম মশলার চোরাকারবারীদের ঠ্যালায় বুফে কারে উঠতে বাধ্য হলাম। বয়স্ক টিটিই এসে একে ওকে টিকিট দেন, টিকিট দেন বলতে লাগলে, সবাই কমপক্ষে ৫ টাকা এবং কেউ কেউ ২০ টাকা দিতে লাগল। টিটিই সাহেব 'এ টাকাতে' হবে না, আরও দিতে হবে বলতে বলতে পকেট পূর্ণ করে পাশের কামরার দিকে এগুলেন। একমাত্র আমাদের কাছে এসে টিকিট চাওয়া তো দূরের কথা—চোখ তুলেও একবার দেখলেন না!
ঈশ্বরদী পৌঁছবার আগেই ইফতারির সময় হলো। ওই টিটিই সাহেব এলেন এবং একটা টেবিলে গামছা পেতে নিয়ে ডাব, কলা ইত্যাদি (হকারদের নিকট থেকে আদায় করা নিশ্চয়ই) এবং বুফে কারের গরম গরম চপ, পিয়াজু ও ছোলা নিয়ে বসলেন।
বড়ই ইচ্ছে হচ্ছিল, টান মেরে ওই গামছাসহ ইফতারি ফেলে দিয়ে বলি, 'তোমার জন্য এই ইফতারি নয়!!"


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন