কুমিরের অত্যাচার
কুমিরের অত্যাচার
জলাভূমির রাক্ষস
সি সংহের পরই কুমিরের স্থান। আতংকের চিহ্ন হিসেবে। ভয়ের ছায়া হিসেবে। শুধু এই নামটাই কলজে ঠাণ্ডা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ।
এমনকী আফ্রিকান সাহসী কালো মানুষগুলো পর্যন্ত ভয় পায় কুৎসিত এই উভচর প্রাণীটাকে। জলাভূমির আশপাশেই কোথাও সব সময় ঘাপটি মেরে থাকে ওটা। কখন এসে হাজির হবে কেউ জানে না।
আদিবাসীরা সব সময় নদী, জলাভূমি এড়িয়ে চলতে চায়। প্রতি বছর গড় হিসাবে প্রায় এক হাজার আদিবাসী প্রাণ হারায় এই রাক্ষসের হাতে।
জেমস যখন সিরে (SHIRE) নদীর নাকের ডগায় বাস করতেন, তখন প্রায় প্রত্যেক দিন শুনতে পেতেন কুমির এসে আদিবাসীদের ধরে ধরে খেয়ে ফেলছে। বিশেষ করে মহিলারা
প্রাণ হারাত বেশি। ওরা হয় ঘরের জন্য পানি
আনতে যেত অথবা তীরে বসে জামা-কাপড়
কাচত। সে সময় ঘটত ঘটনাগুলো।
সিরে নদীর উল্টো পাশে ছিল ফোর্ট জনসন। ছোট শহর। ওখানে এত বেশি সংখ্যায় আদিবাসি কুমিরের হাতে প্রাণ হারাত যে প্রত্যেকদিন সবাই জানতে চাইত, আজ কতজন?
এমনকী কুমির এসে আক্রমণ করত ক্যানুগুলোতে । হয়তো আদিবাসীরা মাছ ধরতে যেত, আর ফিরে আসত না। শূন্য ক্যানু ভাসত নদীতে।
বেশ কিছু ইউরোপীয়ান বাস করত ফোর্ট জনসন শহরে। তখন দেখা গেল তাদের মধ্যে অবসর বিনোদনের ভাল একটা সুযোগ এসে গেছে। সবাই যার যে রকম রাইফেল আছে সেগুলো বগলে নিয়ে ছুটে যেত জলাশয়ের পাশে। সারাদিন বসে থাকত কখন কুমির আসবে সে আশায়। সন্ধ্যাবেলায় গজগজ
করতে করতে বাড়ি ফিরত। এদের আশা ছিল একটা কুমির মারতে পারলে দেশে ফিরে বন্ধু- বান্ধবদের আড্ডায় বা জমজমাট আসরের মধ্যমণি হতে পারবে। তাদের আশায় গুড়ে বালি অথবা গুড়ে সিমেন্ট। কেউ কখনওই একটাও কুমির মেরে দেখাতে পারেনি।
আদিবাসীরা বিপদে একজন শিকারীকেই পাশে পেত। তিনি জেমস সাদারল্যাণ্ড। সিরে নদীর পাশে থাকার সময়ই জেমস বেশ কিছু বাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। একদিন । তিনি মাত্র শিকার শেষ করে ক্যাম্পে ফিরেছেন । জঙ্গল কাছেই। হঠাৎ করেই বিচ্ছিরি একটা গোলমাল শুনতে পেলেন। অনেকে মিলে চেঁচাচ্ছে। আদিবাসীদের গলার স্বর। তারমধ্যে একটা শব্দ বারবার শোনা যাচ্ছে।
মানে কিনা-কুমির! কুমির!!
ওদের চেঁচামেচির শব্দগুলো টুকরো টাকরা সাজালে এর মানে কাউকে এই মাত্র কুমিরে ধরে নিয়ে গেছে।
সব ক্লান্তি কোথায় চলে গেল।.303 রাইফেলটা মুঠিতে ধরে ফুটলেন তিনি সেই নদীর পারে, ঘটনা যেখানে ঘটেছে। নদীর পারে মানুষের মেলা বসে গেছে
যেন। সবাই উত্তেজিত। হাত পা নেড়ে চিল্লা- চিল্লি করছে। গিয়ে দাঁড়ালেন ওদের সামনে। একজনকে বাছাই করলেন যে কিনা খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারে। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে। বক্তা জানাল-এক মহিলা এসেছিল নদী থেকে পানি নিতে। মাটির কলসিটা ভরছিল। হঠাৎ করে কুমির এসে তার হাত কামড়ে ধরে নিয়ে গেছে স্রোতের গভীরে। মহিলা হাত-পা নেড়ে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছিল। আর চিৎকার করে সাহায্য চাইছিল। তার পাশেই হঠাৎ করে সে আবিষ্কার করে নদীতে ঝুঁকে পড়া এক গাছের শিকড় আর লতাপাতা। এক হাতে সেগুলো শক্ত করে খামচে ধরে মহিলা। আবার চেঁচাতে থাকে। ভাগ্য ভাল। নদীর পাশেই কিছু পুরুষ
আর মহিলা জঙ্গুলে শাক সংগ্রহ করছিল। সবাই দৌড়ে আসে মহিলাকে বাঁচাতে। খিচে ধরে তার পা। তারপর মানুষ বনাম কুমিরে চলে দড়ি টানাটানির মত মহিলাকে নিয়ে টানাটানি। নদীর পারে বেশ মানুষজন তখন। মহিলাটার বাচ্চাটা নদীর পারে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, মায়ের দুর্দশা দেখে। হঠাৎ করে কীভাবে যেন সে পড়ে গেল পানিতে।
তৎক্ষণাৎ রাক্ষুসে কুমিরটা মহিলার হাতটা ছেড়ে দিয়ে চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাচ্চাটার উপরে। চোয়ালে বাচ্চাটাকে কামড়ে ধরে হারিয়ে গেল জলের অতলে ।
দুঃখিনী মা দেখল তার আদরের ধন সারাজীবনের জন্য হারিয়ে গেল কালো অন্ধকার জলের নীচে। কখনওই ফিরে আসবে না তার মাটির কুঁড়ে ঘরে। চাইবে না খাবার। করবে না অভিমান । হাঁটবে না উঠানে।
নাটকটা এখানে শেষ হলেই ভাল হত। কিন্তু আরও একটু বাকি ছিল। গ্রামের আদিবাসীদের একজন হাতে ঢাউস এক বর্ণা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ভিড়ের মধ্যে। এত লোকের মাঝে তার হয়তো নায়ক হবার ইচ্ছে হয়েছিল। সে বারবার চিৎকার করে বলতে লাগল, "কোথায়? কুমির কোথায়? অ্যাঁ? কোথায় কুমির?'
কেউ বাধা দেয়ার আগেই সে নেমে পড়ল নদীতে।
সঙ্গে সঙ্গে কোত্থেকে একটা কুমির ভেসে উঠে তার কোমর কামড়ে ধরল। পাশে আরও
একটা উঠে কামড়ে ধরল তার মাথা এবং কাঁধ। দুই কুমিরে মিলে টেনে টুকরো টুকরো করে ফেলল কুমির সন্ধানী বীর পুরুষকে। কোত্থেকে এসে যোগ দিল আরও কয়েকটা কুমির। বাকি টুকরোগুলো নিয়ে নিঃশব্দে সটকে পড়ল ওরা যার যার মত।
যে মহিলার হাত আর বাহু কুমিরে কামড়ে ধরেছিল তার অবস্থা বেশ করুণ। জেমস প্রথমেই তার হাতের যত্ন নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নইলে রক্তটা বিষাক্ত হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। ব্যাণ্ডেজ করে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। মহিলা কয়েক সপ্তাহ ভুগে বেঁচে গেল।
পুরো কয়েকটা দিন নদীর পারে রইলেন জেমস। বিন্দুমাত্র দয়া না দেখিয়ে একটার পর একটা কুমির মেরে গেলেন অক্লান্তভাবে।
যে মহিলাটা বেঁচে গিয়েছিল, ছয় মাস পর আরেকজন সঙ্গিনীসহ সে গিয়েছিল নদীতে। ঠিক একই জায়গাতে কুমিরের হাতে প্রাণ হারায় সে।
কী অদ্ভুত নিয়তি!
আবার রাইফেল নিয়ে মৃত্যুদূতের মত ফিরে এলেন জেমস। আবার মেরে চললেন। কুমির। চোখে পড়া মাত্রই ।
একদিন বিশাল সাইজের একটা কুমির মারলেন তিনি। সাধারণত এত বড় সাইজের কুমির হয় না। বেশ অস্বাভাবিক বড়। মারার পর জেমসের এক সঙ্গী ওটার পেট কাটল। কুমিরের মাংস ঝলসে খেতে ভাল। চিংড়ি
মাছের মত। পেট কাটার পর ভেতরে পাওয়া গেল অনেকগুলো ব্রোঞ্জের তৈরি অলংকার। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক আদিবাসী গৃহবধূ প্রাণ হারিয়েছিল কুমিরের খাবার হিসাবে। ওরা এসেছিল গোসল করতে অথবা স্বামী- সন্তানদের জন্য পানি নিতে। কত ঘটনাই না ঘটে।
একবার এক আদিবাসী ক্যানুতে উঠতে গিয়ে তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুকে বলল, 'জানিস, মাত্র গত সপ্তাহে আমার মাকে কুমিরে খেয়েছে। আমার মনে হয় একদিন আমার কপালেও একই ঘটনা ঘটবে।'
আসলে কথাবার্তা বলার সময় সাবধান থাকার পরামর্শ দেন আমাদের গুরুজনেরা। কেন কে জানে! বাচাল আদিবাসীটা একথা বলা শেষ করে যেই মাত্র ক্যানুতে চড়েছে, অমনি বলা নেই, কওয়া নেই কোত্থেকে একটা কুমির এসে তার হাত কামড়ে ধরে ডুব দিল। মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুটা কিছু করার আগেই, হারিয়ে গেল অতল জলে। লাশটা কখনওই পাওয়া যায়নি।
সেই তিনটে মেয়ে
এবারের ঘটনা রোভুমা (Rovuma) নদীর তীরে। সাধারণত নদীর পাশেই ক্যাম্প করতে ভালবাসেন জেমস। অনেক সুবিধে এতে। রান্নাবান্না, গোসল করার সুবিধা হতে শুরু করে মাছ ধরা, এমনকী টয়লেট করার পর ইয়ে করারও সুবিধা। কত কী!'
দুপুর বেলা। জেমস মাত্র দুপুরের খাবার শেষ করেছেন। তাঁবুতে বসে একটা সিগার ধরিয়ে উপভোগ করছিলেন তামাকের ধোঁয়া। এমন সময় তাঁর ছোকরা-ভৃত্য - এসে জানাল সুলতান এমপারেমরের লোকজন তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছে। এই সুলতান এমপারেমবেটা আবার কে? না, উনি এক বিশাল আদিবাসী সর্দার। লুজেনডা (Lujenda) নদীর তীর তাঁর সাম্রাজ্য! হায়রে সাম্রাজ্য। হয়তো দশ বারোটা কুঁড়ে ঘর, কিছু জঙ্গল, আর কিছু লোকজন।
তো, সুলতান এমপারেমবের লোকজন তিনটে খুব সুন্দরী ক্রীতদাসী নিয়ে এসেছে জেমসের জন্য উপহার হিসাবে। বিনিময়ে অবশ্য সে কিছু জিনিস চায়। যেমন-এক পিপে বারুদু, কিছু টুপি আর হাতি মারার কোনও টোটকা ওষুধ!
শেষের জিনিসটার একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। হাতি মারার টোটকা ওষুধ আবার কী? ব্যাপারটা হচ্ছে আদিবাসীরা কখনওই বিশ্বাস করে না সাদা মানুষেরা শুধুমাত্র রাইফেল আর গুলি দিয়ে বিশাল দানবের মত হাতি, বুনো মহিষ আর গণ্ডারগুলো মারে। এর মধ্যে অবশ্যই কোনও গুপ্তরহস্য রয়েছে। সাদা শিকারি নিশ্চয়ই কোনও মন্ত্রপূত পানি পান করে অথবা শরীরের কোথাও তাবিজ-কবচ বেঁধে রাখে।
আধুনিক অনেক মানুষ যেমন বিশ্বাস করে। শুধুমাত্র পরিশ্রম দিয়ে ভাগ্য বদলানো যায় না, এর সাথে অতীন্দ্রিয় কোনও সাহায্য লাগে, বা পীর ফকির বা কোনও ন্যাংটা বাবার দয়া। আজও অনেকে গলায় ঢোল বা ল্যাপটপের সাইজের তাবিজ ঝুলায়।
তো, গহীন বনের এই হাতি শিকারিদের দোষ দিয়ে লাভ কী! ওরাও যায় ওঝার কাছে। ওঝা উপযুক্ত দক্ষিণার বিনিময়ে তুকতাক করে দেয়। শিকারির শরীরে লতাপাতার রস দিয়ে চিহ্ন এঁকে দেয়, বা গাছের শিকড় পুড়িয়ে ছাই মেখে দেয় শরীরে, বা অন্য কোনরকম রক্ষাকবচ বেঁধে দেয়
এর ফলে শিকারির মনে অদম্য সাহস এসে যায়। হাতির মুখোমুখি হতে আর ভয় পায় না সে। এবং সে শিকার করে বেশ কিছু হাতি। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তার শিকারি হিসাবে, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত। সেই সাথে সে ওঝার কদর বেড়ে যায়। আরও অনেকেই ছুটে যায় ওঝার কাছে। আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন সেই
সুলতান এমপারেমবে কেন জেমসের কাছে
হাতি মারার টোটকা ওষুধ চেয়েছে!
তাঁবুর বাইরে চলে এলেন জেমস ।
দেখতে পেলেন কতগুলো কালো আগন্তুক,
যারা নিঃসন্দেহে সুলতানের লোক; তিনটে
অপরূপা সুন্দরী মেয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা সত্যিই বিরক্তিকর। এ ধরনের বদলাবদলি খেলা একেবারে বাচ্চাদের খেলার মত। হ্যাঁ, অনেক সাদা ইউরোপীয়ন এই খেলা পছন্দ করে। জেমস তো তাদের মত নোংরা মনের মানুষ নন। তুচ্ছ ফালতু কিছু জিনিসের বদলে তিনটা মেয়ের জীবন। জঘন্য।
তিনি নিশ্চিত ওই সুলতান ব্যাটা মেয়েগুলোকে কোন না কোন জায়গা থেকে ধরে নিয়ে এসেছে। জিজ্ঞেস করলেন একটা মেয়েকে, আসলে কী হয়েছে তাদের ভাগ্যে।
মেয়েটা অবাক হলো সাদা মানুষের মুখ থেকে নিজের ভাষা শুনে। জানাল, সে লোচেরিংগো (Locheringo) নদীর পারে ছোট্ট একটা গ্রামে থাকত। চার সপ্তাহ আগে সে যখন পানি আনতে যাচ্ছিল, তখন মাটাকা গোত্রের লোকজন অর্থাৎ সুলতানের চামচাগুলো তাকে ধরে নিয়ে এসেছে। তার দুই সঙ্গিনী থাকত ইউনাংক (unangu) গ্রামে একটা ইংলিশ চার্চের স্টেশনে। ওদেরও মাটাকারা ধরে এনেছে।
মেয়েটা অনুরোধ করল জেমস যেন তাদের ফিরিয়ে না দেন। তা হলে বাকি জীবন তাদের ক্রীতদাসীর জীবন কাটাতে হবে সুলতানের কাছে। অথবা সুলতান তাঁর বন্ধু- বান্ধবদের বিনোদনের জন্য তাঁদের ব্যবহার করবেন। করুণ জীবন যাপন করতে হবে তিনজনকেই। বদলে সাদা প্রভুর কাছে তারা ভাল থাকবে।
জেমস সুলতানের চামচাগুলোকে বললেন, তিনি বারুদ এবং টুপি দিতে পারবেন না। তবে এই তিন মেয়ের বদলে হাতি মারার টোটকা দিতে রাজি আছেন। টোটকা আর কিছু না। সুলতানকে প্রতিদিন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পানিতে
দুই বেলা গোসল করতে হবে। এতে তাঁর সাহস বাড়বে। শিকারে যাবার আগে সারা শরীরে প্রচুর তামাক পাতা মাখতে হবে। আর তাবিজ হিসাবে জেমস এক টুকরো নীল রঙের পুরানো কাপড় দিয়ে দিলেন, যেটা সুলতানের শরীরে বাঁধতে হবে। কাপড়টা তারই এক কর্মচারীর বউয়ের পুরানো ন্যাকড়া।
মনে মনে হাসলেন, ঠাণ্ডা পানিতে দুই বেলা গোসল করলে সুলতানের কী অবস্থা হবে এই ভেবে। তা ছাড়া সারা শরীরে প্রচুর তামাকপাতা মাখলে হাতি অনেক দূর থেকে গন্ধ পেয়ে ভেগে যাবে।
পরদিন সকালে সুলতানের লোকজন হাতির টোটকা আর তাবিজ নিয়ে খুশি মনে ফিরতি পথ ধরল। জেমস জানেন, সুলতান ও খুশি হবেন এই হাতি মারার অব্যর্থ ওষুধ পেয়ে। (আসলেও তাই হয়েছিল। এর কিছুদিন পর সুলতানের লোকজন কয়েক বস্তা চাল নিয়ে হাজির হয়েছিল। এগুলো সুলতান পাঠিয়েছেন শুভেচ্ছা হিসাবে।)
লোকগুলো চলে যাবার পর জেমস সেই তিনটা মেয়েকে বললেন, 'তোমরা এখন স্বাধীন। ইচ্ছে করলে ফিরে যেতে পারো
নিজেদের গ্রামে। মেয়ে তিনটে আঁতকে উঠে দ্রুত মাথা নাড়ল। জানাল, তাদের গ্রামের পথ অনেক দূরে। পথ-ঘাট বিপদসংকুল। তা ছাড়া আবার যে সুলতানের লোকজন হানা দেবে না এমন কথা কে বলেছে? সুন্দরী মেয়েদের কত বিপদ! আরও কত সুলতান রয়ে গেছে!
জেমসের কর্মচারীদের বউয়ের দলও নারাজ। তারা কিছুতেই তাদের সদ্য পাওয়া বান্ধবীদের বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারবে না। দু'চারজন তো ওদের বোন-মেয়ে ইত্যাদি আত্মীয়ও বানিয়ে ফেলেছে।
একজন প্রস্তাব দিল, জেমসের দলে তো বেশ কয়েকজন অবিবাহিত তরুণ রয়ে গেছে, তাদের যে কোনও তিনজনের সাথে এই তিনটে মেয়ের বিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
এতক্ষণে জেমস খেয়াল করলেন, তাই তো। এই সুন্দরী মেয়ে তিনটে আসার পর থেকেই তো দলের সব ছোকরাগুলো খামোকাই এদের সামনে দিয়ে ঘোরাঘুরি করছে অনেকটা মধুর পেয়ালার আশপাশে যেভাবে মাছি উড়ে বেড়ায় ঠিক সেভাবেই।
এরকম সুন্দরী মেয়েকে বউ হিসাবে পেলে যে কেউই আনন্দে বগল বাজাবে।
জেমস দলের ছেলে-ছোকরাদের ডেকে ব্যাপারটা বললেন। কিছু টাকা হাতে দিয়ে বললেন প্রচুর খাবার কিনে অনিতে
তারপর সবাই এসে লাইন দিয়ে জেমসের সামনে দাঁড়াল। যথাসাধ্য পরিপাটিভাবে এসেছে ওরা। জেমস মেয়ে তিনটেকে এনে বললেন, 'তোমরা এখান থেকে নিজেদের স্বামী হিসাবে কাউকে বেছে নাও।'
মেয়েগুলো চুপচাপ হবু স্বামীদের দেখতে লাগল। আর সব ছেলে-ছোকরাগুলো হৈ-চৈ শুরু করল, 'বাওয়ানা, আমি ওই মেয়েটাকে চাই। বাওয়ানা, আমি মাঝেরজনকে চাই...' ইত্যাদি।
মেয়েগুলো কিন্তু বেশ সিরিয়াস স্বামী পছন্দ করার ব্যাপারে। শেষে একজন হেসে • বলল, তারা আরও কয়েকদিন থাকার পর এই দলের মাঝখান থেকেই নিজেদের শিকার বেছে নেবে।
বেশ কয়েকদিন থাকার পর একে অপরকে চেনার পর তিন মেয়েই দলের মধ্য থেকে তিনজনকে স্বামী হিসাবে বেছে নিল । ছোটখাট একটা উৎসব হলো জেমসের ক্যাম্পে। যারা বউ পেল তারা খুব খুশি আগুনের আলোতে ওদের দাঁতের ঝিলিক দেখা গেল।
যারা বউ পেল না তারা বিরক্ত হয়ে বলল, 'বিয়ে একটা ঝামেলার ব্যাপার। গাধারাই বিয়ে করে। গজগজ করতে লাগল, ওরা। মহাবিরক্ত।
বুনো কুকুর হাতি খুঁজতে বের হয়েছিলেন জেমস।
গভীর জঙ্গলের ভেতরে। পাশে ছোট একটা নদী। নাম-পুকুলি। হঠাৎ করেই বুনো কুকুরের ডাক শুনতে
পেলেন। শব্দ শুনে মনে হলো খুব কাছেই রয়েছে ওরা। বুরো কুকুরের এটা স্বভাব, অনেক দূর থেকেই ঘেউ ঘেউ করে। হঠাৎ করে তেড়ে এসে কামড় বসায় না। বেশির ভাগ সময় দূর থেকে ঘেউ ঘেউ করে ভেগে যায়। যাই হোক, বুনো কুকুরের খোঁজ করার দরকার নেই কারও। কিন্তু কথা হলো হঠাৎ করেই সিবা নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে উঠ “বাওয়ানা, আমি বাচ্চা কুকুরের শব্দ পেলাম মনে হয়।
একটু ইতস্তত করে শব্দ অনুসরণ করে হেঁটে গেলেন শিকারি এবং ট্র্যাকার। অনুমান করে। কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলেন ঝোপের আড়ালে বসে আছে তিনটে খুলে শয়তান, বুনো কুকুরের বাচ্চা।
যেহেতু তখনও কোনও হাতির টাটকা পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি, আর ক্যাম্পও খুব কাছেই, কাজেই সিদ্ধান্ত নিলেন জেমস এই
তিনটে কুকুর ছানা সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। নিয়ে এলেন সঙ্গে করে। ঠিক করলেন,
চেষ্টা করে দেখবেন পোষ মানানো যায় কি না। বেশ সময় লাগল। সহজে ওদের বুনো স্বভাব দূর করা গেল না। লেগে রইলেন জেমস। মজার ব্যাপার এমনকী সুগন্ধি সাবান দিয়ে ওদের গোসল করাতে গেলেও ওরা আক্রমণ করতে চাইত। যখন ওরা এক সাথে সুর করে বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে কাঁদত তখন জেমস ওদের খাবার দিতেন।
সবচেয়ে ভাল যেটা তা হলো যখন সন্ধ্যা বেলায় রহস্যময় অন্ধকার নেমে আসত বনভূমিতে তখন বাচ্চাগুলো বেশ তৎপর হয়ে উঠত। নিজেদের দায়িত্ব যেন বুঝে ফেলল ছোট বেলাতেই
খাওয়া-দাওয়া ভালই দেয়া হত ওদের। সেই পিচ্চি অবস্থা থেকেই মাংস দেয়া হত। অবশ্য অন্য কোনও খাবার ওরা ছুঁয়েও দেখত না। সম্ভবত ওদের প্রিয় ছিল কচি জলহস্তির মাংস। কাজেই রোম (Rovuma) নদীতে
গিয়ে প্রায়ই জলহস্তি মেরে আনতেন জেমস।
খেতে দেয়া হত তিন পিচ্চি শয়তানকে।
তিন মাস টানা ওদের সভ্য বানানোর কাজ চালানোর পর প্রথমটা অজানা একটা অসুখে পড়ল। কারণটা জানতে পারা যায়নি। অসুখে ভুগে মারা গেল। আঠারো মাসের সময় দ্বিতীয়টা কোত্থেকে যেন বিষ খেয়ে এল। ওরা বিষাক্ত লতাপাতা চিবোয় না। হতে পারে কেউ বিষ দিয়েছে। মারা গেল। তৃতীয়টা দীর্ঘ দুই বছর পর্যন্ত জেমসের সাথে ছিল। আদর করে এটাকে 'জামবো' ডাকতেন তিনি। মহা প্রভুভক্ত ছিল ওটা। ওটার পুরানো ইতিহাস বিচার করলে বলতে হয় দারুণ পোষ মেনেছিল জামবো। শিকারে বের হলে ডাকতে হত না জামবোকে। পিছু নিত জেমসের। সন্ধ্যাবেলা যখন ক্যাম্পে বসে থাকতেন তখন তাঁর সামনে এসে গড়াগড়ি দিত। লাফঝাপ পেড়ে খেলায় আমন্ত্রণ জানাত প্রভুকে ।
একবার জামবো অসুস্থ হয়ে পড়ল। সে সময় জেমসকে শিকারে যেতে হয়েছিল। তিনি তাঁর লোকজনের কাছে জামবোকে রেখে শিকারে চলে গেলেন। ভেবেছিলেন বিশ্রাম আর প্রচুর খাবার পেলে ওটা ভাল হয়ে উঠবে।
- প্রায় মাস খানেক পর জেমস ক্যাম্পে ফিরে এলেন। দূর থেকে প্রভুকে দেখে জামবো, তীরের মত ছুটে গেল। ততদিনে বেশ সুস্থ হয়ে গেছে সে। খুশিতে জিভ বের করে ফ্যা-া করছে। দ্রুত হাত চেটে দিল জেমসের । ট্রাউজারের নীচের অংশ কামড়াতে লাগল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। জেমসও খুশি হলেন প্রিয় পোষা প্রাণীটার সুস্থ-সবল অবস্থা দেখে।
কিন্তু ক্যাম্পে পা রাখতে না রাখতেই সবাই জামবোর বদমেজাজের জন্য নালিশ জানাল জেমসের কাছে। এক মাসে সে ক্যাম্পের দু'জন মানুষকে কামড়ে দিয়েছে-যাদের অবস্থা খারাপ। ক্ষতস্থান বিষাক্ত হয়ে যাবার মত অবস্থা।
জেমসের প্রধান কর্মচারীটা জানাল, বাকি সবাই খুব বিরক্ত। এখন জেমস যদি কুকুরটা রাখেন তবে সবাই জেমসকে ছেড়ে চলে যাবে। খুবই বিব্রতকর অবস্থা।
জেমস দলের সবাইকে ডেকে বললেন, ওরা যেন প্রত্যেক দিন এক একজন ভারুই পাখি, কবুতর, আর মুরগি এনে দেয় জামবোকে। নিজে তো দেবেনই। মনে মনে ক্ষমা করে দিলেন জামবোকে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে দারুণ অসুখে ভুগে উঠেছে। খাওয়া- দাওয়াও ভাল পায়নি হয়তো। কে জানে!
সবাই মেনে নিল ব্যাপারটা। সবকিছু ঠিকঠাক চলতে লাগল আগের মত। কিন্তু হায়! জামবো শেষ রক্ষা করতে
পারল না। একদিন একজন আদিবাসী এ | দাড়াল জেমসের সামনে। কায়দা করে মিলিটারি ভঙ্গিতে একটা স্যালুট ঠুকল জেমসকে। আচমকাই। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল জামবো। সে ভাবল লোকটা বোধহয় জেমসকে আক্রমণ করতে চাইছে। দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মাটিতে ফেলে চোয়াল আর তীক্ষ্ণ দিয়ে কামড়ে লোকটার অবস্থা কাহিল করে ফেলল। বেচারা প্রায় মারাই যেত। ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দুর্ঘটনা। বেচারা জামবো কোনও পথই খোলা রাখল না নিজে জামবোকে গুলি করতে পারেননি জেমস। পাশে দাঁড়ানো একজনকে বললেন, তাঁর হয়ে সে যেন জামবোকে গুলি করে।
জামবো মারা গেল ।
কিন্তু জেমসের মনটা বিষাদে ভরে গেল, দীর্ঘ দিন ধরে কুকুরটার স্মৃতি ছিল তাঁর মনে। উজ্জ্বল সেই স্মৃতি।
স্কটল্যাণ্ডে ফিরে গিয়ে ঘটনাটা লেখার সময় লক্ষ করলেন চোখ দুটো ভিজে আসছে যেন। না কি চোখের সমস্যা হলো! তা হলে এত দুঃখবোধ আসছে কোত্থেকে?
পরিশিষ্ট
আদিবাসীরা বলে বুনো কুকুর যেখানে থাকে সিংহ সেখানে আসে না। কথাটা বোধহয়। সত্যি!
আইভরি সম্রাট
মালিংগানিরো আসলে গ্রামের নাম। লেক নিয়াসার পূর্ব দিকের বিস্তীর্ণ এলাকাটা জুড়ে গ্রামটা। সে সময় এলাকাগুলো পর্তুগীজরা
শাসন করত।
মানতেগুলা (matengula) ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় সর্দার। যে গোত্রের লোকজনদের মানতেগুলা শাসন করত তারা আজও আছে সেই এলাকাতে। মানুষ চাঁদে গেছে, স্তরা আগের মতই আছে। আজও বলে সবাই মানতেগুলার কথা। তবে ১৯০০ সালের আগে পর্তুগীজরা মানতেগুলার কথা জানত না। পর্তুগীজদের স্থানীয় চৌকিদাররা তাদের এলাকাতে অবশ্য কোনও গ্রামের লোকদের অর্থাৎ মানতেগুলার প্রজাদের ঢুকতে দিত না । এমনিতেই।
ছোট ছোট ঘটনা বড় ঘটনার জন্ম দেয়। বদলে যায় সবকিছু। জন্ম নেয় নতুন কাহিনি মালিংগানিরো গ্রামটা বিখ্যাত ছিল আইভরি, মানে হাতির দাঁতের জন্য। ওরা বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করে জমাত হাতির দাঁত পরিমাণে এত বেশি হয়ে গিয়েছিল যে সবার মুখে মুখে ফিরত এর গল্প- গাধা।
এর কারণ, গ্রামের সব লোকজন অর্থাৎ মানতেগুলার সব প্রজাই ছিল এক একজন দক্ষ হাতি শিকারি। আর মানতেগুলা নিজে হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে ভালবাসত। নিজের চেষ্টায় এবং শিকারি প্রজাদের সাহায্যে বিশাল এক আইভরির গুদাম বানিয়েছিল এই আদিবাসী সর্দার। জলাভূমির পাশেই। এ তথ্যটাই পর্তুগীজদের মনে লোভ
জাগিয়ে তুলল। আইভরির লোভ! ইচ্ছে করলেই তারা সহজ-সরল গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বা সর্দার মানতেগুলার কাছ থেকে ভুংভাং করে অল্প দামে বা পানির দামে কিনে নিতে পারত। কিংবা আজেবাজে জিনিসের বদলেও বিনিময় করতে পারত।
কিন্তু কেন করতে যাবে, যদি একটু বুদ্ধি
খাটালে মাগনা পাওয়া যায়? নোংরা একটা খেলার পরিকল্পনা করল পর্তুগীজরা। মানতেগুলার কাছের একজন লোক ছিল-নাম আবদুল্লা এনওনডা। কালো, তবে আরবের রক্ত বইছে ওর ধমনীতে আবদুল্লা লোভী, বোকা, এবং অসতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে সে এলাকাতে বাস করত। কেনা-
শাসন করত।
মানতেগুলা (matengula) ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় সর্দার। যে গোত্রের লোকজনদের মানতেগুলা শাসন করত তারা আজও আছে সেই এলাকাতে। মানুষ চাঁদে গেছে, স্তরা আগের মতই আছে। আজও বলে সবাই মানতেগুলার কথা। তবে ১৯০০ সালের আগে পর্তুগীজরা মানতেগুলার কথা জানত না। পর্তুগীজদের স্থানীয় চৌকিদাররা তাদের এলাকাতে অবশ্য কোনও গ্রামের লোকদের অর্থাৎ মানতেগুলার প্রজাদের ঢুকতে দিত না । এমনিতেই।
ছোট ছোট ঘটনা বড় ঘটনার জন্ম দেয়। বদলে যায় সবকিছু। জন্ম নেয় নতুন কাহিনি মালিংগানিরো গ্রামটা বিখ্যাত ছিল আইভরি, মানে হাতির দাঁতের জন্য। ওরা বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করে জমাত হাতির দাঁত পরিমাণে এত বেশি হয়ে গিয়েছিল যে সবার মুখে মুখে ফিরত এর গল্প- গাধা।
এর কারণ, গ্রামের সব লোকজন অর্থাৎ মানতেগুলার সব প্রজাই ছিল এক একজন দক্ষ হাতি শিকারি। আর মানতেগুলা নিজে হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে ভালবাসত। নিজের চেষ্টায় এবং শিকারি প্রজাদের সাহায্যে বিশাল এক আইভরির গুদাম বানিয়েছিল এই আদিবাসী সর্দার। জলাভূমির পাশেই। এ তথ্যটাই পর্তুগীজদের মনে লোভ
জাগিয়ে তুলল। আইভরির লোভ! ইচ্ছে করলেই তারা সহজ-সরল গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বা সর্দার মানতেগুলার কাছ থেকে ভুংভাং করে অল্প দামে বা পানির দামে কিনে নিতে পারত। কিংবা আজেবাজে জিনিসের বদলেও বিনিময় করতে পারত।
কিন্তু কেন করতে যাবে, যদি একটু বুদ্ধি
খাটালে মাগনা পাওয়া যায়? নোংরা একটা খেলার পরিকল্পনা করল পর্তুগীজরা। মানতেগুলার কাছের একজন লোক ছিল-নাম আবদুল্লা এনওনডা। কালো, তবে আরবের রক্ত বইছে ওর ধমনীতে আবদুল্লা লোভী, বোকা, এবং অসতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে সে এলাকাতে বাস করত। কেনা-
শাসন করত।
মানতেগুলা (matengula) ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় সর্দার। যে গোত্রের লোকজনদের মানতেগুলা শাসন করত তারা আজও আছে সেই এলাকাতে। মানুষ চাঁদে গেছে, স্তরা আগের মতই আছে। আজও বলে সবাই মানতেগুলার কথা। তবে ১৯০০ সালের আগে পর্তুগীজরা মানতেগুলার কথা জানত না। পর্তুগীজদের স্থানীয় চৌকিদাররা তাদের এলাকাতে অবশ্য কোনও গ্রামের লোকদের অর্থাৎ মানতেগুলার প্রজাদের ঢুকতে দিত না । এমনিতেই।
ছোট ছোট ঘটনা বড় ঘটনার জন্ম দেয়। বদলে যায় সবকিছু। জন্ম নেয় নতুন কাহিনি মালিংগানিরো গ্রামটা বিখ্যাত ছিল আইভরি, মানে হাতির দাঁতের জন্য। ওরা বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করে জমাত হাতির দাঁত পরিমাণে এত বেশি হয়ে গিয়েছিল যে সবার মুখে মুখে ফিরত এর গল্প- গাধা।
এর কারণ, গ্রামের সব লোকজন অর্থাৎ মানতেগুলার সব প্রজাই ছিল এক একজন দক্ষ হাতি শিকারি। আর মানতেগুলা নিজে হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে ভালবাসত। নিজের চেষ্টায় এবং শিকারি প্রজাদের সাহায্যে বিশাল এক আইভরির গুদাম বানিয়েছিল এই আদিবাসী সর্দার। জলাভূমির পাশেই। এ তথ্যটাই পর্তুগীজদের মনে লোভ
জাগিয়ে তুলল। আইভরির লোভ! ইচ্ছে করলেই তারা সহজ-সরল গ্রামবাসীদের কাছ থেকে বা সর্দার মানতেগুলার কাছ থেকে ভুংভাং করে অল্প দামে বা পানির দামে কিনে নিতে পারত। কিংবা আজেবাজে জিনিসের বদলেও বিনিময় করতে পারত।
কিন্তু কেন করতে যাবে, যদি একটু বুদ্ধি
খাটালে মাগনা পাওয়া যায়? নোংরা একটা খেলার পরিকল্পনা করল পর্তুগীজরা। মানতেগুলার কাছের একজন লোক ছিল-নাম আবদুল্লা এনওনডা। কালো, তবে আরবের রক্ত বইছে ওর ধমনীতে আবদুল্লা লোভী, বোকা, এবং অসতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে সে এলাকাতে বাস করত। কেনা-
বেচা করত পর্তুগীজ আর গ্রামবাসীদের পণ্য। পর্তুগীজদের দরকারী জিনিস গ্রাম থেকে কিনে এনে ওদের কাছে বেচত। আবার গ্রামবাসীদের জন্য দরকারী জিনিস পর্তুগীজদের কাছ থেকে কিনে এনে গ্রামে বেচত। দুপক্ষ থেকেই ভাল লাভ করত। ব্যবসায়ী এবং দালালের দারুণ সংমিশ্রণ এই আব্দুল্লা।
যে কোনও লোভনীয় লুটপাটের কাজে আবদুল্লার মত লোক গুটি হিসাবে দারুণ, সহজেই ব্যবহার করা যায়। ঝুঁকি নেই।
আবদুল্লা সর্দারের অনুমতি নিয়েই কিছু আইভরি নিয়ে গেল বেচতে। মানতেগুলার আপত্তি নেই যদি ভাল দাম পাওয়া যায়। নতুন এই ব্যবসায়ীটার প্রতি তাঁর মন বেশ নরম। আর আবদুল্লাও মানতেগুলার আইভরির পরিমাণ দেখে বেজায় খুশি। এখন এগুলোর সবই গায়েব করতে হবে। এবং ব্যবসাও করতে হবে।
এখন জানতে হবে মানতেগুলার দুবর্লতা কোথায়, ভাল কথা, মানতেগুলার দুবর্লতা হচ্ছে বারুদের পিপের উপর। ছোট ছোট পিপে, যেগুলো বারুদ দিয়ে ঠাসা থাকে। আবদুল্লা গিয়ে সর্দারকে জানাল পর্তুগীজদের প্রচুর বারুদ আছে। গাধাটাকে সেরকমই শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল।
এখন পর্তুগীজরা হাতির দাঁতের বদলে বারুদ দিতে রাজি আছে। তবে আবদুল্লা একা গেলে ওকে দেবে না। মানতেগুলা নিজে গেলে ওরা ব্যবসা করতে আপত্তি করবে না। ব্যাপারটা রাজকীয় লেনদেন হবে। তা ছাড়া এত দূরের পথ... রাস্তায় তো মন্দ লোকের অভাব নেই...কেউ যদি আবদুল্লার কাছ থেকে আইভরি ছিনিয়ে নিতে চায়? হেন তেন। এখন মানতেগুলা নিজে যদি...মানে...
মানতেগুলা ‘বিশ্বস্ত' আবদুল্লার পিঠ চাপড়ে দিলেন। ঠিক আছে। ঠিক আছে। সব আইভরি নামানো হোক। তিনি নিজে যাবেন পর্তুগীজদের এলাকায় । নিজে পণ্য অদলবদল করবেন। বারুদ কিছু তাঁর দরকার যে। সবার অলক্ষে ফাঁদে পড়লেন মানতেগুলা । মালিংগানিরো গ্রামের আইভরি সম্রাট। ১৯০১ সালের ঘটনা। মানতেগুলা ষাটটা
সবচেয়ে সেরা আইভরি নিয়ে পৌঁছলেন। পর্তুগীজদের এলাকাতে। পর্তুগীজরা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করল। সব সুন্দরভাবে চলল। সমস্যা হলো ওরা আইভরি শুনে নেয়ার পর যখন দামামামি শুরু হলো।.
মানতেগুলা অবাক হয়ে দেখলেন ওরা কোন বারুদ দিতে চাইছে না। এবং আইভরির জন্য যে দাম ওরা দিতে চাচ্ছে সেটা খুব-খুউব কম
এখন কী করা? পর্তুগীজরা ভদ্রভাবে তাকে জানাল, মানতেগুলা যদি ইংল্যাণ্ডে আইভরিগুলো বেচতে চান তবে ভাল দাম পাবেন। তবে তার আগে তাঁকে থানায় যেতে হবে। সেখানে আইভরিগুলো ওজন করাতে হবে। তাঁকে রপ্তানী করার জন্য দরকারী কাগজ সংগ্রহ করতে হবে। এগুলোই আজকালকার নতুন ইউরোপীয় আইন।
বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে মানতেগুলা তাঁর আইভরি নিয়ে থানায় গেলেন। থানায় পৌঁছামাত্র তিনি নিজেকে আসামী হিসাবে আবিষ্কার করলেন।
বন্দি করা হলো মানতেগুলাকে। মানতেগুলা যদি স্বীকার করেন তিনি পর্তুগীজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করতেন তবেই তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে।
মানতেগুলা স্বীকার করলেন। পর্তুগীজরা তাঁকে দয়া দেখিয়ে মুক্তি দিল। তাঁর আইভরি রেখে দেয়া হলো। কারণ? না, জামানত হিসাবে মানতেগুলা এবং তাঁর প্রজাদের সবার ‘সদাচরণ' হিসাবে। ওরা খারাপ কিছু করলে ষাটটা আইভরি জব্দ করবে পর্তুগীজ সরকার।
ঘটনাগুলো ঘটার সময় বিন্দুমাত্র টু শব্দ। করেননি মানতেগুলা। কে বলবে তাঁর মনে কী
চিন্তা চলছিল সে সময়। বলা কঠিন। তবে সে
সময় থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিশোধ নিয়ে
গেছেন এই আইভরি সম্রাট। মানতেগুলা একটা আতংকের নাম হয়ে গিয়েছিল জলাভূমির আশপাশের কয়েকশো
মাইল এলাকা জুড়ে।
পর্তুগীজদের এলাকায় গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছেন তিনি। পর্তুগীজদের সবগুলো সৈনিক, থানার লোকজন, দালাল, সবাইকে মেরে লাইন দিয়ে ফেলে রেখেছেন লম্বা করে। যেখানে মাত্র একজন পর্তুগীজ ছিল সে এলাকাতে গিয়েও আক্রমণ করেছেন প্রতারিত এই সর্দার। মৃত্যু, লাশ, রক্ত। এই তিনটের আরেক নাম-মানতেগুলা ।
জেমসের স্মৃতিতে মানতেগুলা সারাজীবন উজ্জ্বল হয়ে ছিলেন। মানতেগুলা বেঁটে, গোলগাল এবং হাসিখুশি মানুষ। সব সময় তাঁকে দেখা যেত বিয়ার পান করছেন অথবা হাতে বানানো তামাকের বিড়ি টাইপের জিনিস টানছেন। তাঁর চোখ দুটো উজ্জ্বল আর অভিজাত। আর দশজনের সাথে তাঁর পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। ওই ঘটনার পর জীবনে
আর কোনও ভুল করেননি আইভরি সম্রাট। দুবার তাঁর এলাকার পাশ দিয়ে যেতে হয়েছিল জেমসের। প্রথমবারের ঘটনা ।
মানতেগুলার এলাকার বাইরে ক্যাম্প করেছিলেন জেমস। সে সময়ই এলেন তিনি। 1 সঙ্গে সত্তরজন লোক। সবার হাতে লোডেড রাইফেল। চকচক করছে। মানতেগুলা জানতে চাইলেন, জেমস কী করছেন তাঁর এলাকাতে? এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া এত অল্প লোক নিয়ে আসতে কী জেমস একটুও ভয় পাননি?
জেমস, জবাব দিলেন, তিনি একজন ইংরেজ। তাঁর ভয় পাবার কিছু নেই। তাঁর কাছে সাতটা রাইফেল আছে। পাঁচটা
'রাইফেলের দশটা করে কান্ট্রিজ। এক সাথে দুটো করে গুলি বেরোয়। তার মানে এক শটে কমপক্ষে একটা মানুষ মরবে। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি লড়াই করতে আসেননি। পুজিনডা নদীর দিকে যাচ্ছিলেন। হাতি খুঁজতে অবশ্যই । এখানে অস্থায়ী ক্যাম্প করেছেন। এবং সেই সাথে মানতেগুলার গ্রাম থেকে কিছু খাবার কিনতে চান নিজের জন্য এবং অবশ্যই দলের লোকদের জন্যও ।
মানতেগুলা জবাব দিলেন, ইংরেজরা তাঁর এলাকায় স্বাগতম। তবে তিনি তাঁর শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও পর্তুগীজ বেজন্মাদের বাধা দিয়ে যাবেন সারাজীবন ধরে। জেমস তাঁর বন্ধুত্ব চান এটা বুঝাতে এক পেয়ালা ভর্তি হুইস্কি আর বড় এক বাটি ভর্তি চা-পাতা দিলেন। মানতেগুলা সেগুলো দলের লোকদের হাতে দিয়ে তৎক্ষণাৎ কাঙালের মত আরও দাবি করলেন। সবারই কোনও না কোনও দুর্বলতা থাকে। সারাজীবন।
জেমস প্রতিজ্ঞা করলেন, পরদিন দেবেন আরও। গ্রামে ফিরে গেলেন মানতেগুলা । তখুনি পাঠিয়ে দিলেন প্রচুর মুরগি, ডিম, জেমসের জন্য ছাগল, ময়দা আর জেমসের লোকজনদের জন্য বিয়ার, বিয়ার আর বিয়ার ।
মানতেগুলার মৃত্যুর পর যে দলের এবং গ্রামের সর্দার হয়েছিল সে-ও সারাজীবন একই কাজ করেছে যা মানতেগুলা করতেন। ভেবেছিল এতে যদি সর্দারের আত্মা শান্তি পায়। মানতেগুলার কথা আজও অনেকে বলে । তিনি ছিলেন সত্যিকারের রাজা।
সোয়াসুরির বিপদ
গরমের এক দুপুর। লোচেরিংগো (Locheringo) নদীর পাশে
তাঁবু খাটিয়েছেন জেমস। পাশে জঙ্গল। কেমন একটা অলস আর ঘু পরিবেশ। চারদিক সুনসান।
হঠাৎ করেই একটা গোলমাল শুনতে পেলেন জেমস। আদিবাসীদের চিৎকার। একশো গজের মধ্যেই কিছু একটা হচ্ছে।
জেমসের কৌতূহল বরাবরই খুব বেশি। সেজন্য সারাজীবন হাজার ঝামেলা এসে
গড়িয়েছে তাঁর কপালে।
দলের কয়েকজনকে নিয়ে সেই গোলমাল লক্ষ্য করে পা চালালেন জেমস। ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে হবে। কিছুদূর গিয়েই মুখোমুখি হলেন দলটার । এক গাদা মানুষ। সবার হাতে বন্দুক। নলগুলো রোদে চকচক করছে। বোঝাই যাচ্ছে ডাকাত দল। কোথাও ওদের বৃত্তি শেষ করে ফিরছে। কী লুটপাট করেছে কে জানে। তবে দুটো ছোট বাচ্চা, একটা মহিলা আর অল্পবয়স্কা একটা মেয়েকে বেঁধে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ওরা।
গরু ছাগলকেও কেউ এভাবে হিচড়ে
টেনে নিয়ে যায় না। ডাকাত দল বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল । গহীন এই জঙ্গলের ভেতরে কোত্থেকে এই সাদা মানুষটা এসে হাজির হলো জ্যান্ত উৎপাতের মত।
এক মুহূর্তের জন্য সবাই থমকে দাঁড়াল।
কী করবে বুঝতে পারছে না কেউ। এমন সময় বেশ কাও হলো। ছোট মেয়েটা কীভাবে যেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিল বন্দিশালা থেকে। তারপর দে ছুট। দৌড়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল জেমসের সামনে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, 'বাওয়ানা, আমাকে ওদের সাথে নিয়ে যেতে দেবেন না। আমি ক্রীতদাসী নই। গতকাল সকালে ওরা আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে। আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাজারে বিক্রি করার জন্য। আপনি চাইলে আমি আপনার দাসী হব। কিন্তু মরে গেলেও ওই কাফেরগুলোর সাথে যাব না।
'থামো,' গর্জে উঠল একজন। বিশালদেহী কুৎসিত চেহারার একজন ওপাশ থেকে দৌড়ে চলে এল মেয়েটার পাশে। খপ করে মুচড়ে ধরল মেয়েটার হাত ব্যথায় ককিয়ে উঠ মেয়েটা।
হাসি হাসি মুখে জেমসের দিকে ফিরে তাকাল বিশালদেহী। বিনয়ের সাথে ব্যাখ্যা করল, 'বাওয়ানা, এটা আমার ক্রীতদাসী।'
এই বলেই মেয়েটার হাত ধরে টেনে হিচড়ে হাঁটা শুরু করল দলের লোকজনের কাছে।
সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয় না জেমসের। রাইফেলের বাট দিয়ে লোকটার চোয়ালে চমৎকার একটা আঘাত করলেন। বিন্দুমাত্র
আপত্তি না করে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। মাত্র একটা আঘাতেই। নিজের প্রতি খুশি খুশি একটা ভাব চলে এল জেমসের। দারুণ কাজ।
এবার বিশালদেহীর মাথায় রাইফেলের নল ঠেকিয়ে অলস চোখে তাকালেন অপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন চেহারার প্রতিপক্ষদের দিকে।
সবার অস্ত্র ফেলে দাও। নইলে এটার মাথার খুলি উড়িয়ে দেব, নির্দয় ভাবে বললেন তিনি। সোজা তাকিয়ে আছেন প্রতিপক্ষের নেতার চোখে। কেন জানি তাঁর মনে হচ্ছে ওই ব্যাটাই পালের গোদা।
জেমসের নাটকে কাজ হলো বেশ। তাঁর গলার স্বরের মধ্যে এমন কিছু ছিল, দলের সবাই অস্ত্র, মানে বন্দুক ফেলে দিল। শুধু নেতা তার রাইফেল জেমসের এক সঙ্গীর হাতে তুলে দিল- সুন্দরভাবে। শান্তভাৰে নেতা তাকাল জেমসের সঙ্গীর দিকে। জানতে চাইল জেমস আসলে কে?
সঙ্গী জানান জেমস আসলে একজন ইংরেজ শিকারি। তথ্যটা জানা মাত্র নেতার হাবভাব বদলে গেল। চেহারা থেকে ভয়-শংকা দূর হয়ে বেশ খোশ মেজাজি একটা ভাব চলে এল। কয়েক কদম সামনে এসে বন্ধুত্বপূর্ণ একটা ভাব ধরে বলল, 'ইয়াম্বো, বাওয়ানা? (কেমন আছ, মাস্টার)?'
তারপর মুখ ফিরিয়ে দলের সবাইকে জানাল যে জেমস আসলে একজন ইংরেজ পর্তুগীজ নয়। ভয়ের কিছু নেই। সবাইকে বলল জেমসকে স্যালুট করতে।
সবাই তাই করল। ওদের চেহারা থেকে ভয় দূর হয়ে গেছে। একজন হাসিহাসি মুখে ঝুঁকে দাঁড়াল মাটি থেকে অস্ত্র তুলে নেয়ার জন্য। দৌড়ে ছুটে গেল সিমবা। জেমসের ট্র্যাকার থাবা মেরে রাইফেলটা সরিয়ে ফেলল। ধাম করে এক ঘুষি মেরে অস্ত্র লোভী লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল।
"যথেষ্ট হয়েছে।" সবার উদ্দেশে বললেন জেমস। এবার মেয়েটার মুখ থেকেই সব শুনি।'
মেয়েটা ততক্ষণে আবার জেমসের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জেমস নরম গলায় জানতে চাইলেন, 'সত্যি করে বলো তো, মেয়ে, কী
হয়েছে আসলে?'
'গতকাল সকালে...' মেয়েটা বলা শুরু করল। 'যখন মোরগ ডাকছিল, তখনও বেশ অন্ধকার। সেই সময় ওই শয়তানগুলো এসে হাজির হলো আমাদের ছোট্ট গ্রামটাতে। গ্রামটাতে মাত্র চারটে কুঁড়ে ঘর রয়েছে। আমার বাবা গোলামৰেপু পাহাড়ে গেছে তার এক বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য। প্রতিবেশি দম্পতি বিয়ার পান করতে গেছে কয়েক মাইল দূরের গ্রামটাতে। কী একটা উৎসব হচ্ছে সেখানে।
'আমরা চারজনই ছিলাম। মা, ছোট দুই ভাই আর আমি। এমন সময় শয়তানগুলো এল। আমাদের একা পেয়ে চারজনকে বেঁধে হাঁটাতে হাঁটাতে নিয়ে চলল। সেই গতকাল সকাল থেকে আমরা চারজন হেঁটেই চলেছি। হেঁটেই চলেছি। বিন্দুমাত্র বিশ্রাম না নিয়ে। আমার মা-টা যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারে। এমনিতেই মা ছিল অসুস্থ। তার উপর এই শয়তানগুলো মা-কে প্রচুর মারধর করেছে। 'আমরা অরণ্যের স্বাধীন সন্তান। ওরা আমাদের ক্রীতদাস হিসাবে বেচতে নিয়ে যাচ্ছে। যে শয়তানটাকে আপনি রাইফেলের বাট দিয়ে মেরেছেন ও বদমাশটা আবার আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমার ভাই
দুটোকেও কোথাও না কোথাও বেচে দেবে।
রাওয়ানা, আপনি বরং আমাদের গুলি করে
মেরে ফেলুন। কিন্তু এই শয়তানদের হাতে
ছেড়ে দেবেন না। আমরা অরণ্যে
স্বাধীনভাবে...'
জেমস অবশ্য সবই বুঝতে পেরেছেন বহু আগেই। চোখ গরম করে ডাকাত দলের দিকে ফিরে বললেন ওদের চারজনকে ছেড়ে দিয়ে ওরা যেন ফিরে যায় খালি হাতে। আর ভবিষ্যতে যদি জঙ্গলের ভেতর কাউকে দেখতে -পান তবে তিনি গুলি করে কুকুরের মত হত্যা করবেন তস্করদের।
সবাই তোম্বা মুখে জেমসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেখে জেমস সিদ্ধান্ত নিলেন আধুনিক রাইফেলের ছোটখাট একটা নমুনা তিনি দেখাবেন। হাতে কলমে উদাহরণ দিলে বেশ কাজ হয়। হাতের রাইফেলটা তুলে একটা মোটাসোটা গাছের গুঁড়ি লক্ষ্য করে কয়েক রাউণ্ড গুলি চালালেন। .৩০৩ বুলেটগুলো
একটার পর একটা গাছের শক্ত করুন ঘড়িতে আঘাত করে দেখার মত অবস্থা করল।
সবার পলক ফেলার আগেই রাইফেলে দ্রুত হাতে নতুন করে গুলি লোড করে নিলেন। একেবারে ওয়েস্টার্ন ছবির নায়কদের মত। ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলেন সবার
তোম্বা মুখ নরম হয়ে গেছে। ঘামে চকচক
করছে। খুশি হলেন জেমস। ব্যাটাদের ভড়কে
দিয়েছেন বেশ। নিজের নাটকে নিজেই খুশি। পরদিন সকালে মেয়েটার মায়ের অবস্থ আরও খারাপ হয়ে পড়ল। অসুখ। ও হ্যাঁ, বলে রাখা দরকার মেয়েটার নাম সোয়াসুরি কাজেই বাধ্য হয়ে নিজেদের দলের সাথেই ওদের রেখে দিলেন জেমস । সুস্থ হলে ফেরত পাঠাবেন ওদের গ্রামে।
সে যাত্রায় মহিলা আর সুস্থ হয়ে উঠল না। সব সেবা-যত্ন-চিকিৎসা বিফলে গেল । তিনদিন ভুগে মহিলা মারা গেল। সোয়াসুরি বেশ কাঁদল। শেষে জানাল সে আর নিজ গ্রামে ফিরে যাবে না। জেমসের কর্মচারীদের বউদের সাথে থাকবে যতদিন না তার বাবা গোলামবে পাহাড় থেকে ফেরত আসে। তা ছাড়া ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়ে গেছে ওই
বদমায়েশগুলো আবার ফিরে আসতে পারে। দুই ভাই ছিল না? ওদের একটা জেমসের কাছে চাকরি চাইল। টুকিটাকি কাজের জন্য। চাকরিতে নিযুক্ত হলো ছোকরা। অন্যটা ফিরে যেতে চাইল নিজ গ্রামে। লোক দিয়ে ওকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন জেমস। নিরাপদে পৌঁছে গেল ছেলেটা।
এই ঘটনার তিন সপ্তাহ পরের ঘটনা। খুব ভোর বেলা। সূর্য তখনও ওঠেনি। জেমসকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠাল তাঁর এক বালক ভৃত্য। উত্তেজিত ভাবে জানাল, মুরগির খোঁয়াড়ের ভেতরে সম্ভবত একটা চিতাবাঘ ঢুকেছে। তার নিজের কাছে সে রকমই মনে হচ্ছে। গিয়ে
দেখবে সে সাহস নেই ।
সত্যি তাই, মুরগির খোঁয়াড়ের ভেতরে প্রায় সব মোরগ আর মুরগি এক সাথে ডাকাডাকি করছে।
রাইফেলটা পাশেই ছিল। লোড করা। সব সময় তাই করেন তিনি। কখন কী কাজে লাগে। পাজামা পরা অবস্থায়ই দৌড়ে তাঁবুর বাইরে চলে এলেন। পাশেই ধোঁয়াড়।
ততক্ষণে খেয়াল করলেন সোয়ামুরি আর দুই মহিলা (যারা জেমসের কর্মচারীদের স্ত্রী) এত গণ্ডগোলের মধ্যেও জেমসের পিছন পিছন আসছে, ঘটনা কী দেখতে। মেয়েলি কৌতূহল আর কাকে বলে। ওরা উঠল কখন? মেজাজ খারাপ হলেও কিছু বললেন না। এ সময় একটু অসতর্ক হলেই বিপদ হতে পারে। চিতাটাকে দেখতে পেলেন। নিঃশব্দে নড়াচড়া করছে ওটা। খোঁয়াড়ের ভেতরে। দ্রুত রাইফেল তুলে লক্ষ্যস্থির করলেন জেমস। গুলি করলেন তৎক্ষণাৎ। পাজরে লাগল। বুলেটের ধাক্কায় মেঝেতে পড়ে গেল চিতাটা। একটা গড়ান দিয়েই উঠে দাঁড়াল। মুখোমুখি তাকিয়ে আছে ওটা জেমসের দিকে।
জেমস বুঝতে পারলেন ওটা এখন তাঁর উপর ঝাপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত। টানটান হয়ে গেছে চিতার সমস্ত পেশীগুলো। গুলি চালালেন তিনি আরেকটা। মুখের ডান দিকে ঢুকে চোয়ালটা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিল। এমনকী সেটা কাঁধের কিছু মাংসও ছিঁড়ে ফেলল।
আপাতত ওটার মরার কথা, না। কিছুই হয়নি এমন একটা ভঙ্গিতে তেড়ে এল চিতাটা
জেমসের দিকে। দ্রুত তিন নম্বর এবং শেষ কাজটা ব্ৰীচে ভরে ফেললেন জেমস।
চিতা ঝাঁপ দিল। গুলি চালালেন জেমস। একই সাথে ঘটল ঘটনা দুটো। সেই সাথে নিজেও ঝাঁপ দিয়ে সরে গেলেন এক পাশে।
গুলিটা চিতার মুখ দিয়ে ঢুকে, এক পাশ দিয়ে বিশাল এক গর্ত তৈরি করে, বের হয়ে গেল। ধপাস করে মেঝেতে পড়ল চিতাটা।
এমন সময় এক কাণ্ড হলো। সোয়াসুর দৌড়ে এল পিছন থেকে। তার হাতে একটা বর্ণা। খোঁয়াড়ের এক পাশেই দাঁড় করানো ছিল বর্শাটা। সেটা দিয়ে পুরুষালী ভঙ্গিতে আঘাত করল চিতার শরীরে। সম্ভবত উত্তেজনার জন্য মিস্ করল। পাশের মেঝেতে গাঁথল ফলাটা।
ঝট করে উঠে দাঁড়াল চিতাটা। লাফ দিয়ে পড়ল মেয়েটার উপর। তারপর সমস্ত ওজন নিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল তাকে। থাবা চালাল সোয়াসুরির ঘাড় আর বুক বরাবর।
ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে শূন্য রাইফেলটা দিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিতাটার মাথায় আঘাত করলেন জেমস। খটাস্ করে শব্দ হলো চিতার খুলির সাথে রাইফেলের সংঘর্ষে। উবু হয়ে পড়ে গেল চিতা। আবার আঘাত করলেন তিনি। যতক্ষণ না রাইফেলটা ভেঙে দু টুকরো হলো ততক্ষণ আঘাত করেই যেতে লাগলেন ।
এক সময় থামলেন। চিতাটা নিঃশব্দে পড়ে আছে। ওটার পা টেনে ধরে সোয়াসুরির শরীরের উপর থেকে নামালেন।
ততক্ষণে চারদিক লোকজনে ভরে গেছে। সবাই চলে এসেছে। হাতে অস্ত্র পাতি। বেশ হৈ-চৈ হচ্ছে। চিতাটা মারা গেছে। এখন সবাই বাহাদুরি দেখানোর জন্য ওটাকে দু- চারটে ঘা মারছে।
জেমসের পুরো মনোযোগ এখন সোয়াসুরির উপর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মারা গেছে মেয়েটা। ওর ঘাড়ে আর বুকে চিতার থাবার দাগ। মনটা খারাপ হয়ে গেল জেমসের। নিয়তি আর কাকে বলে! কেন মরতে এসেছিল বেচারি ! ডাকাত দলের হাত থেকে বাঁচিয়ে কী লাভ হলো?
কয়েক মুহূর্ত পরেই পিটপিট করে তাকাল সোয়াসুরি। জেমসকে দেখে হাসল । হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন জেমস। ওর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিলেন। তারপর দলের এক কর্মচারীর স্ত্রীর উপর সোয়াসুরির সেবার ভার দিলেন । এ মহিলা, খুবই দুয়ালু। নিজের মেয়ের মত যত্ন নিল সোয়াসুরির। মাস খানেক পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল চঞ্চল মেয়েটা ।


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন