বেঁচে থাকার যুদ্ধ
বেঁচে থাকার যুদ্ধ
মারা গেছে তার হিসেব নেই ।
কী ভয়ংকর উত্তাপ! খরতাপে বিশাল নদীটি শুকিয়ে খরখর করছে। নদীর তীরের গ্রামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। নিস্তেজ, ধুলোময় এবং বিরান। ঘাসগুলো সব পুড়ে গেছে, গত ঋতুতে জন্মানো কাটা ধানের মুড়া ছাড়া আর কিছু নেই মাঠে। তীব্র রোদে ওগুলো পুড়ে ঝলসে রয়েছে। বড়বড় তেঁতুল আর বটগাছগুলোর পাতা নেই, ছাল ছাড়ানো কংকালের মত লাগছে।
এরকম ভীতিকর পরিবেশে রিভার বেড বা নদীগর্ভের বালুগুলো আরও প্রকট হয়ে ফুট আছে। উত্তপ্ত সারফেস শীতল করতে কোথাও ছায়ামাত্র নেই। অথচ একটা সময় কত মনোরম ছিল গ্রামের দৃশ্যাবলী। কল্লোলিনী কাবেরী নদী কলকল ছলছল শব্দে গা-ভরা যৌবন নিয়ে বয়ে চলত, নদী তীরের মাঠে প্রচুর পরিমাণে জন্মাত ধান, ভুট্টা, বাজরা আর সব্জি। L
নদীর কুমবাকোনাম তীরের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল খাংগি। একটা জরুরি কাজে তারে নদীর ওপাড়ে যেতে হবে। তার বাম কোলে তার বাচ্চা। এখনও পুরোয়নি বছর। যদিও বয়সের তুলনায় শিশুটিকে বড়সড়ই দেখায়। থাংগি হাঁটার সময় বাচ্চাটা সারাক্ষণ সামনের দিকে ঝুঁকে মায়ের বাম স্তনটি মুখে পুরে চোষার চেষ্টা করছে। থাংগির পরনে শুধু শাড়ি। লাল পেড়ে সাদা শাড়িটা সে এক প্যাঁচ নিয়ে পরেছে। আঁচলটা বুকের ওপর। গরমের সদয় দক্ষিণের কর্মজীবী মহিলারা এভাবেই শাড়ি পরে। শাড়ি সরিয়ে দুধ খেতে বাচ্চার কোনই অসুবিধে হচ্ছে না।
থাংগি যাচ্ছে তার স্বামীর চাচার বাড়ি। তার স্বামীর মত এ চাচাও পেশায় একজন ক্ষুদ্র কৃষক, থাকে নদীর ওই পাড়ে। চাচা কিছু ধানের বীজ দেবে বলেছিল। ধাংগির স্বামীর জমানো বীজ এক রাতের মধ্যে সব খেয়ে সাফ করে ফেলেছে রাক্ষুসে ইঁদুরের দল। কিছুদিন পরে বর্ষা নামবে। মাটিতে বীজ পুঁততে হবে। থাংগির স্বামীর এক টুকরো জমি আছে, ওখানে সে অমানুষিক পরিশ্রম করে ধান এবং সব্জি ফলায়। গত কয়েকদিন ধরে আকাশ জুড়ে বজ্রমেঘের আনাগোনা চললেও ভয়াল উত্তাপের লৌহ বলয় ভেঙে ফেলতে পারেনি। তবে এরকম অবস্থা চিরদিন নিশ্চয় চলবে না। বৃষ্টি আসবেই।
মগজ গলানো, চামড়া পোড়ানো এই ভয়ংকর রোদে থাংগিকে চাচার বাড়ি পাঠাতে চায়নি তার স্বামী। কারণ ঝাড়া ছয় মাইল রাস্তা পার হয়ে তাকে নদীতে পৌঁছাতে হবে, তারপর নদীর অপর পাড় থেকে আরও ছয় মাইল হাঁটতে হবে। হাঁটতে তারা ভয় পায় না। কারণ জন্মের পর থেকেই হণ্টনে তারা অভ্যস্ত। কিন্তু এই উত্তাপ! তবু এ গরম সয়েই ভূমি কর্ষণ করতে হবে থাংগির স্বামীকে। এক বলদে টানা লাঙল দিয়েই সে জমি চাষ করবে। কিন্তু লাঙল দিয়ে মাটি ফাড়লেই তো হবে না, এতে বীজ রোপণ করতে হবে। না হলে সব খাটাখাটনি বৃথা। চাচা বেশ কিছুদিন ধরেই 'দিচ্ছি দেব' করেও বীজ দিচ্ছে না। শেষে থাংগিই প্রস্তাব দেয় সে নিজেই চাচার বাড়ি যাবে। তাকে দেখলে চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও বীজ না দিয়ে পারবে না চাচা। বাংগির স্বামী তার বউকে মানা করেছিল বেরুতে। কিন্তু সময়মত বীজ না পুঁতলে সবাইকে যে না খেয়ে মরতে হবে, এ কথা থাংগি মুখ ঝামটা দিয়ে মনে করিয়ে দিলে নিরীহ স্বামী যুক্তি খণ্ডন করতে না পেরে চুপ হয়ে থেকেছে। সে নিজেই হয়তো এই দুঃসাহসী অভিযানে যেত (অভিযানই তো! এমন ভীষণ রোদে একটা শকুন বা চিল পর্যন্ত উড়ছে না আকাশে। কুকুরগুলো সব জিভ বের করে হ্যা হ্যা করছে ক্লান্তিতে।)। কিন্তু মাত্র সেদিনই জ্বর থেকে উঠেছে বাংগির স্বামী থিরুঙ্গা। বেজায় দুর্বল
শরীর। কাজেই তার যাওয়ার প্রশ্নই নেই। পাংগি বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। কারণ ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়াতে পারে। দুধের বাচ্চাটা ততক্ষণে দুধ না পেলে খিদের চোটেই হয়তো পটল তুলবে।
এ বছর গরমও পড়েছে। অন্য সব বছর ফেল। গত কয়েক দিন ধরে উত্তাপ বেড়েই চলেছে। গরমের চোটে অনেক গবাদী পশু মারা গেছে, নেড়ি কুত্তাগুলো গেছে পাগল হয়ে আর কত শত পাখি যে মারা গেছে তার হিসেব নেই। এমনই গরম, পোকামাকড়ের দল পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে গেছে গা থেকে। রাস্তা এবং মাঠে পড়ে থাকে মৃত জানোয়ার। সূর্যাস্তের অনেক পরে, তখনও বাতাস গরম, তবে চামড়ায় ফোস্কা পড়া মত নয়, গ্রামবাসী মরা জানোয়ারের লাশগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।
মধ্যাহ্নে তারা কেউ মাঠে কাজ করে না, জানে কখন বিরতি দিতে হবে কর্মে, ফিরে আসে মাটির ঘরে, টিউবওয়েল থেকে স্ত্রীদের সংগ্রহ করে আনা তেতো স্বাদের পানি ঢুকঢক করে পান করে। জলতেষ্টা আর পানি শূন্যতায় গাঁয়ের লোক হয়তো বেশিরভাগই অনন্ত যাত্র করত যদি না বছর তিনেক আগে সদাশয় সরকার তাদের গায়ে দুটো টিউবওয়েল বসানোর ব্যবস্থা করত। যতই গরম পড়ক, টিউবওয়েলে পানি থাকেই, এমনকী বিরাট নদীটি শুকিয়ে কংকাল হয়ে যাওয়ার পরেও।
নদীর তীরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে থাংগি। তাকায়। সে নদীর তীর ধরে দু'মাইল রাস্তা হেঁটে এসেছে, পার হয়েছে বেড়ীবাঁধ। এ বাঁধটা একজন হৃদয়বান তামিল রাজা একশো বছর আগে তৈরি করেছিলেন। বাঁধটি এ পর্যন্ত শতাধিকবার সংস্কার এবং মেরামত করা হয়েছে। এবং এখনও নিরাপদে এবং মজবুতভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাঁধের কাজ অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলরাশি গারে ঢুকতে বাধা প্রদান। বাঁধের পেছনে রিজারভয়ার বা জলাধার রয়েছে। ওখানে খাল কেটে জলাধারের জল খালে প্রবেশ করানো হয়, এগুলোর সঙ্গে ইরিগেশন চ্যানেলের সংযোগ ঘটিয়ে গোটা গা জুড়ে কৃষি জমিতে সরবরাহ
করা হয় পানি।
তবে এ বছর একদমই বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে এবং নর-উত্তাপে খালবিল সব শুকিয়ে গেছে। বাঁধের পেছনের জলাধারটিও জনশূন্য। থকথকে কিছু কাদামাখা জল ছিল। ভীষণ দহনে তাও বাষ্প হয়ে উবে গেছে। এখন খটখটে শুকনো মাটি।
থাংগি ঠিক করল এখান থেকেই সে নদীর কোলে নেমে পড়বে। তা হলে কিছুটা সময় বাঁচবে। সাঁঝের আগেই বাড়ি ফিরতে চায় থাংগিং কে জানে ঝড়ো মেঘ থেকে যদি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়, তা হলে সে এবং বাচ্চা দু'জনেই ভিজে একসা হবে। নদীতে তখন পানি জমে যাবে। আর নদী পার হতে পারবে না সে। বেড়ীবাঁধ ঘুরে তখন যেতে হবে তাকে। অতিরিক্ত চার মাইল রাস্তা হাঁটতে হবে।
বাংগি নদীগর্ভের দিকে তাকাল। থেমে থেমে বাতাস বইছে। তীব্র আঁচ তাতে। গনগনে হাওয়া তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে শরীরে। নীচে, নদীর কোলে বাতাসে উড়ছে বালু, প্রতিটি দমকা হাওয়ায় বালুর ছোট ছোট ঢেউ "তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া আর সবকিছু নিশ্চল, স্থির। চারদিকে কোথাও প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।
গনগনে রোদে পুড়তে পুড়তে গাঁ থেকে ছ'মাইল রাস্তা ইতোমধ্যে পাড়ি দিয়েছে থাংগি। মাঝে মাঝে দানবাকৃতির গাছগুলোর সামান্য ছায়া পেয়েছে। অবশ্য আগে এ বৃক্ষরাজি ছিল পরশোষিত, এখন ভয়াল দাবদাহে পাতাগুলো পুড়ে প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে। তবু যৎসামান্য যেটুকু ছায়া বিলোচ্ছে, তার নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রখর উত্তাপ থেকে স্বল্প হলেও রেহাই মিলেছে। নগ্নপদে হাঁটছে থাংগি, গাঁয়ের মানুষ খালি পায়ে হেঁটেই অভ্যন্ত, তার পায়ের পাতা খরখরে, শক্ত পাথর কিংবা কঠিন জমিনে হাঁটার উপযুক্ত। কিন্তু মাটি এমন তেতে আছে, তাপ প্রবাহ ঢুকে যাচ্ছে শক্ত পায়ের তালু ভেদ করে। ঘুরল থাংগি। যে পথ দিয়ে হেঁটে এসেছে, তাকাল সেদিকে। গাছপালা ছাড়া যেদিকে চোখ যায় পুরোটাই ছাল ছাড়ানো ঊষর ভূমি ।
করা হয় পানি।
তবে এ বছর একদমই বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে এবং নর-উত্তাপে খালবিল সব শুকিয়ে গেছে। বাঁধের পেছনের জলাধারটিও জনশূন্য। থকথকে কিছু কাদামাখা জল ছিল। ভীষণ দহনে তাও বাষ্প হয়ে উবে গেছে। এখন খটখটে শুকনো মাটি।
থাংগি ঠিক করল এখান থেকেই সে নদীর কোলে নেমে পড়বে। তা হলে কিছুটা সময় বাঁচবে। সাঁঝের আগেই বাড়ি ফিরতে চায় থাংগিং কে জানে ঝড়ো মেঘ থেকে যদি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়, তা হলে সে এবং বাচ্চা দু'জনেই ভিজে একসা হবে। নদীতে তখন পানি জমে যাবে। আর নদী পার হতে পারবে না সে। বেড়ীবাঁধ ঘুরে তখন যেতে হবে তাকে। অতিরিক্ত চার মাইল রাস্তা হাঁটতে হবে।
বাংগি নদীগর্ভের দিকে তাকাল। থেমে থেমে বাতাস বইছে। তীব্র আঁচ তাতে। গনগনে হাওয়া তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে শরীরে। নীচে, নদীর কোলে বাতাসে উড়ছে বালু, প্রতিটি দমকা হাওয়ায় বালুর ছোট ছোট ঢেউ "তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া আর সবকিছু নিশ্চল, স্থির। চারদিকে কোথাও প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।
গনগনে রোদে পুড়তে পুড়তে গাঁ থেকে ছ'মাইল রাস্তা ইতোমধ্যে পাড়ি দিয়েছে থাংগি। মাঝে মাঝে দানবাকৃতির গাছগুলোর সামান্য ছায়া পেয়েছে। অবশ্য আগে এ বৃক্ষরাজি ছিল পরশোষিত, এখন ভয়াল দাবদাহে পাতাগুলো পুড়ে প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে। তবু যৎসামান্য যেটুকু ছায়া বিলোচ্ছে, তার নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রখর উত্তাপ থেকে স্বল্প হলেও রেহাই মিলেছে। নগ্নপদে হাঁটছে থাংগি, গাঁয়ের মানুষ খালি পায়ে হেঁটেই অভ্যন্ত, তার পায়ের পাতা খরখরে, শক্ত পাথর কিংবা কঠিন জমিনে হাঁটার উপযুক্ত। কিন্তু মাটি এমন তেতে আছে, তাপ প্রবাহ ঢুকে যাচ্ছে শক্ত পায়ের তালু ভেদ করে। ঘুরল থাংগি। যে পথ দিয়ে হেঁটে এসেছে, তাকাল সেদিকে। গাছপালা ছাড়া যেদিকে চোখ যায় পুরোটাই ছাল ছাড়ানো ঊষর ভূমি ।
ওদিক থেকে ছয় মাইল রাস্তা হেঁটে এসেছে সে, ভাবছে থাংগি। নদীর বালু এখন খুব গরম হয়ে আছে জানে সে। হয়তো দু'একটা ফোস্কাও পড়ে যাবে বালুর ওপর দিয়ে হাঁটার সময়। তবু দ্রুত হাঁটলে খুব বেশি ফোস্কা পড়ার আগেই নদীর ওপাড়ে পৌঁছে যেতে পারবে আশা করছে বাংগি ।
রেডিয়োতে সন্ধ্যার খবরে ঘোষণা করা হবে আজ ১২০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল, তবে উত্তাপের মাত্রা কীভাবে মাপা হয় জানে না। থাংগি। আর তাদের গায়ে কোন রেডিয়োও নেই। মাঝে মাঝে সে তার স্বামীর সঙ্গে যখন কুমবাকোনামের বড় বাজারে আসে নিজেদের জমিতে উৎপাদিত গাছ আলু, কুমড়ো, শশা, বেগুন ইত্যাদি বিক্রি করতে তখন রেডিয়ো শুনেছে থাংগি। তবে দাঁড়িয়ে থেকে মজা করে রেডিয়োর গান শোনার সময় কোথায় তাদের? পণ্য বিক্রি হলেই সে টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, নুন কিনে তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরতে হয়। রেডিয়োর মানুষদের সম্পর্কে ওদের আগ্রহও বিশেষ নেই। তাই রেডিয়োর খবরও শোনে না। তারা আবহাওয়া বদলের খবরের জন্য ভরসা করে গাঁয়ের বয়োবৃদ্ধদের ওপর। এই বয়সী মানুষগুলো অভিজ্ঞতা থেকেই বাতাসের গতিবিধি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্ব করতে পারে। তবে সবসময়ই যে তাদের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যায় তা-ও নয়। দেবতারা যদি তাঁদের মর্জিমাফিক বাতাসের গতি পাল্টে দেন, ঝড়-বৃষ্টি ঘটান, তীব্র রোদ বাড়ান, সাধারণ মানুষের কী-ই বা করার আছে।
খাংগি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যদেব হিংস্র আক্রোশে মেয়েটার ঘোমটা ছাড়া মাথাটি চোখ ধাধানো রশ্মির ছটায় পুড়িয়ে দিচ্ছেন, এ নিয়ে অন্তত শ'খানেকবার হলো তীব্র দাবদাহ থেকে সন্তানের মস্তক রক্ষা করতে তাকে আঁচল দিয়ে ঢেকে দিল তার
কিন্তু প্রতিবারই হাত দিয়ে শাড়ি সরিয়ে দিচ্ছে শিশু দুগ্ধপানে অসুবিধে হচ্ছিল বলে। ছেলের দিকে সস্নেহে তাকিয়ে হাসল থাংগি। চুকচুক করে তার বাদামী স্তন চুষছে ছেলে। ছেলেকে সে জান দিয়ে ভালবাসে।
সামনের দৃশ্যপটে আবার চোখ ফেরাল থাংগি। গত কয়েক বছর শুকনোর সময় বহুবার এ নদীর কোল পায়ে হেঁটে পার হয়েছে সে। ওই সময় কখনও নদী আংশিক শুদ্ধ ছিল। কখনও পুরোটাই। বালুর ওপর দিয়ে হেঁটে গেছে, কোথাও গোড়ালি সমান, আবার কোথাও উরু পর্যন্ত ডুবে থাকা সরু খালের মত পানির ধারা পার হয়েছে। কিন্তু নদীগর্ভের এমন ভয়ংকর চেহারা কোনদিন দেখেনি সে। বালুকণাগুলো এমন ঝকঝক করছে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ভয়ানক উত্তাপে জ্বলন্ত, কয়লার মতই জ্বলছে। তবু নদীগর্ভের এ চেহারা উদ্বিগ্ন করল না থাংগিকে।
বাচ্চাকে শক্ত করে কাঁখে চেপে ধরে নদীর তীর বেয়ে নামতে শুরু করল সে। পায়ের নীচের মাটি ধুলোর মত লাগছে, তবে একটু আগে হেঁটে আসা শক্ত জমিনের সমান উত্তাপ ছড়াচ্ছে না। নদীর তীর সাধারণত নানান ঝোপঝাড়, ঘাস, শ্যাওলা ইত্যাদিতে ঢাকা থাকে। কিন্তু সেগুলো এখন পুড়ে বাদামি স্তূপে পরিণত হয়েছে। থাংগির পা পড়ামাত্র ওগুলো শুঁড়িয়ে গিয়ে ধুলোয় রূপ নিচ্ছে।
বালুর কিনারে এসে দাড়াল থাংগি। তাপপ্রবাহের ঢেউয়ে এমনভাবে উড়ছে বালুকণা, যেন জ্যান্ত। বালুর উপরিভাগ উত্তাপ বিকিরণ করছে, তবে কেমন ঝাপসা লাগছে। বালুর ওপরে বয়ে যাওয়া বাতাস যেন গলিত কাচ।
সামনে কদম বাড়াল থাংগি। হাঁটা ধরল। বালু অসহ্য গরম। পদক্ষেপ দ্রুত করল ও, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওপাড়ে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু যত দ্রুত এগোতে চাইল সে, ততই বালুতে গভীরভাবে দেবে গেল পা, গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে গেল। থাংগির মনে হলো সে তার বাড়ির জ্বলন্ত চুল্লিতে পা ফেলছে। বেগে হাঁটার চেষ্টা করল বটে, আসলে দ্রুত এগোতে পারল না থাংগি এবার সে ছোট ছোট কদমে তড়িৎ পদক্ষেপ ফেলার চেষ্টা করল। তবে ফল হলো আরও খারাপ। তার মনে হচ্ছে নরকের বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে, যেন জ্বলন্ত কয়লার ওপর পা ফেলছে। সে গ্রামের মেলায় ফকির এবং সন্ন্যাসীদের লাল টকটকে গনগনে কয়লার
ওপর খালি পায়ে স্বছন্দে হাঁটতে দেখেছে। অবাক হয়ে ভেবেছে এটা কী করে সম্ভব। জ্বলন্ত কয়লার ওপর তাঁদের হাঁটতে মোটেই কষ্ট হয়নি; পায়ের পাতা পুড়ে যাওয়া দূরে থাক, ফোস্কা পর্যন্ত পড়েনি। ফকিররা বলেছেন পুরোটাই নাকি সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাসের কারণে ঘটেছে। থাংগি দেবতাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। কিন্তু দেবতারা তখন নিশ্চয় শীতল তৃণভূমিতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। থাংগির কাতর আবেদন শুনতে পেলেও তাতে কর্ণপাত করলেন না। কাজেই দেবতাদের ওপর ভরসা না করে হেঁটে চলল বাংগি । কখনও সজোর পদক্ষেপে, কখনও মন্থর গতিতে। কারণ বুঝতে পারছিল না কী করবে। দ্রুত কিংবা ধীর, যে গতিতেই হাঁটুক না কেন থাংগি, প্রতিটি কদমেই উত্তপ্ত বালু তার পা পুড়িয়ে দিচ্ছিল।
থাংগির নদীগর্তে নেমে পড়াটাকে কেউ দোষ দিতে পারবে না। সে বয়সে তরুণী আর অভিজ্ঞজ্ঞ পর্যটকদের তুলনায় তার ভবিতব্য কী হবে তা নিয়তিই বলতে পারে। অনেকেই পরোয়া না করে দূর যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে যেখানে সাহায্য না পেলে তীব্র ঠাণ্ডায় কিংবা ভীষণ গরমে কত কী অঘটন ঘটে যেতে পারে। যাত্রার শুরুতে সবাই ভাবে একটু-আধটু সমস্যা হতেই পারে এবং তা মেনে নেয়ার মানসিক প্রস্তুতিও তাদের থাকে। কিন্তু যত সময় যায়, ঠাণ্ডা, উত্তাপ কিংবা ঝড়ো বাতাসের বেগ যখন বৃদ্ধি পেতে থাকে, অভিযাত্রীর মনে ভীতির সঞ্চার হয়, এক পর্যায়ে তীব্র আতংক গ্রাস করে ফেলে তাকে। দুর্গম এ যাত্রা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও দেখা যায় ভয়াল তুষার ঝড়ের কষাঘাতে ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হয়ে হয়ে সে হাত বা পায়ের আঙুল হারিয়েছে কিংবা ভয়ংকর উত্তাপ তাকে চরম, অবসাদের সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে। থাংগির আত্মত্মবিশ্বাস ছিল সে নদীগ পার হয়ে যেতে পারবে, মনে ক্ষীণ সন্দেহ যদি জন্মেও থাকে তা সে পাত্তা দিতে চায়নি তারুণ্যের জোয়ারের শক্তিতে। এবং সে মোটেই সময় নষ্ট করতে চাইছিল না।
কিছুক্ষণ আগে নেমে আসা নদীর তীরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল খাংগি। অনুমান করল
প্রায় সিকি মাইল রাস্তা পার হয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য দোটানায় ভুগল ফিরে যাবে কি না। তা হলে নদীর তীর ঘেঁষে, বেড়ীবাধ ঘুরে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। দূরের আকাশে মুখ তুলে চাইল থাংগি। অশুভ চেহারার কালো কালো মেঘ জমেছে। নাহ্, সামনেই এগোবে পাংগি।
ওর পায়ে এখন ফোস্কা পড়তে শুরু করেছে, ফেঁটে যাওয়া চামড়া জ্বলছে। কোলের বাচ্চাটা অস্থিরভাবে নড়াচড়া করছে। তার মাথা এবং কাঁধের চামড়া ইতোমধ্যে ঝলসে গিয়ে লালচে হয়ে গেছে। কুইকুই করে কাঁদতে শুরু করেছে বাচ্চা।
হেঁটে চলল থাংগি। ফোস্কা পড়া, ভয়ানক জ্বলতে থাকা পা ফেলে হেঁটে চলেছে সে। সামনে নিষ্করুণ বালুর সমুদ্র। এই নদী জীবনদায়িনী, ভাবছে থাংগি, আবার বর্ষার সময় দু'কূল ছাপিয়ে যখন হুহুংকারে গাঁয়ে ঢুকে পড়ে তখন সে পরিণত হয় জীবনহরণকারীতে। বানের জলে সে সামনে যা পায় মানুষ, গরু, ছাগল, বাড়ি-ঘর সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবে এসবই প্রকৃতির অমোঘ বিধান বলে মেনে নিয়েছে সবাই। তাই তো কাবেরী নদী তাদের পূজা দেবী। কিন্তু বন্যার সময় ছাড়াও কাবেরী যে কত ভয়ংকর হতে পারে তা চাক্ষুষ করেনি
নদীগর্ভের মাঝামাঝি জায়গায় এসে পড়েছে ও। এখন আর ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাকে সামনেই এগোতে হবে। প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছে, গলা শুকিয়ে কাঠ।
কোথাও কোন কিছুর সাড়াশব্দ নেই। শুধু থাংগি নিজের হৃদস্পন্দন আর নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ পাচ্ছে। এমন সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে লাগল। ট্রে পেল কোথাও স্থির দৃষ্টিতে তাকাতে পারছে না সে, পা-জোড়ার ওপরেও নিয়ন্ত্রণ নেই, ওগুলো যেন নিজেদের ইচ্ছে মাফিক চলছে। আর সবচেয়ে বাজে ব্যাপার, থাংগির মনে হচ্ছে তার মাথাটা আর তার দেহের সঙ্গে নেই, উড়ে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ কীসে যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল ও। তবে সহজাত প্রবৃত্তির বশে সন্তানকে সে. শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকল। উত্তপ্ত বালুর ওপর পড়ল
শরীর। ভয়ানক ছ্যাকা খেল বাংগি, সারা শরীরে যেন জ্বলন্ত কয়লা চেপে ধরেছে। যন্ত্রণায় চিৎকার দিল সে, যুক্ত হাতটা মাটিতে ঠেকিয়ে উঁচু করল শরীর, তারপর সিধে হলো।
আর পারছে না থাংগি। পায়ের ফোস্কা ফেটে রকু পড়ছে। কী যে ভয়ংকর জ্বলুনি। তবু ইচ্ছাশক্তির সবটুকু জড় করে সে আবার হাঁটতে থাকল। শরীরের ঊর্ধ্বাংশের শাড়িটুকু সে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলল, তারপর ওটা ছুঁড়ে দিল পায়ের সামনে। তারপর লাফিয়ে খণ্ডিত শাড়ির ওপর এসে দাঁড়াল। ওখানে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। পাতলা শাড়ি ভেদ করে উত্তাপ ক্ষতবিক্ষত পায়ের পাতায় কামড় বসাচ্ছে বটে, তবে জ্বলন্ত কয়লাসম তাপ খানিকটা হলেও কম অনুভূত হচ্ছে। সামনে কদম বাড়াল থাংগি, ঘুরল, কাপড়ের টুকরোটা তুলে নিল জমিন থেকে তারপর আবার ওটা ছুঁড়ে দিল সামনে। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এল, বস্ত্রখণ্ডটি উড়িয়ে নিয়ে গেল বেশ কয়েক হাত দূরে। উন্যানের মত ছেঁড়া শাড়িটির দিকে ছুটল থাংগি। কিন্তু ওটা আবার ঝলক হাওয়ায় আরও দূরে উড়ে চলে গেল। ভয়-আতংকে, অস্থির খাংগি আবার দৌড়াল বস্ত্রখটি লক্ষ্য করে।
অকস্মাৎ শরীরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেল থাংগির। তার মাথাটা যেন সত্যি ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলো। থাংগি যেন দেখছে মাথাটা ভেসে আছে শূন্যে, জ্বলন্ত সূর্যের নিষ্ঠুর কিরণে ভাজাভাজা হচ্ছে। গোটা শরীর কেঁপে উঠল থাংগির, কাতরে উঠল সে, তারপর সে যে কাও করল কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
কেউ যদি নদীর অপর পাড়ে থাকত, সে গা শিউরানো একটি দৃশ্য দেখতে পেত এবং দৃশ্যটির কথা পরে সে কাউকে বললেও কেউ তার কথা বিশ্বাস করত না। অবশ্য অনেক দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছে বলে সে পুরোপুরি বুঝতেও পারত না কী নারকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে উত্তপ্ত নদীগর্ভে। সে শুধু উত্তাপের ঢেউয়ের মধ্যে দেখতে পেত একটি নারী তার কোল থেকে কী যেন একটা জিনিস মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে এবং ওটার ওপর উঠে
দাঁড়িয়েছে। দর্শকটি যদি বেশ কাছে থাকত তা হলে শুনতে পেত কারও প্রাণঘাতী আর্তনাদে কেঁপে উঠেছে বাতাস। তারপর শ্বাস রোধ হওয়ার ঘরঘরে শব্দ। তারপর আবার আগের মত সব সুনসান। দর্শক কাছে থাকলে বুঝতে পারত মৃত্যু ক্রন্দনটি করেছে বালুতে পড়ে থাকা জিনিসটা, যেটি এখন কুঁকড়ে-মুকড়ে স্থির হয়ে পড়ে আছে খর-জমিনে। ওটার গায়ের চামড়া ঝলসানো, ভারী পায়ের চাপে দলামোচড়া দেহ।
দর্শক যদি তাকিয়ে থাকত, দেখতে পেত মহিলা ওই জিনিসটার ওপর থেকে নেমে পড়েছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ঝুঁকে ওটাকে আবার তুলে নিয়েছে, সে দু'এক কদম এগোনোর পরে ওটাকে আবার ছুঁড়ে দিল সামনে, তারপর দ্বিতীয়বার ওটার গায়ের ওপর উঠে দাঁড়াল। এভাবে এক ডজনবার বা . তারচেয়েও বেশি সময় ধরে কাণ্ডটির পুনরাবৃত্তি করল মহিলা। এভাবে সে নদীর অপর তীর লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল। তবে দর্শক যদি তখনও নদীর তীরে থাকত মহিলা আসলে বারবার কী ছুঁড়ে দিচ্ছে এবং পরক্ষণে তার ওপর পা তুলে দাঁড়াচ্ছে দেখার জন্য, মহিলা কাছিয়ে এলে তার হাতে ধরা বিকট, বীভৎস জিনিসটা দেখার পরে সে (দর্শক) এমন জোরে চিৎকার দিত অমন চিৎকার সে জীবনেও দেয়নি। এবং মহিলা নদী তীরে পৌছানোর আগেই বমি করতে করতে সে ছুটে পালাত।
রাত হওয়ার পরেও থাংগি ফিরল না দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল তার স্বামী। অশুভ সব চিন্তায় ভীত হয়ে উঠল সে। বারবারই মনে হচ্ছিল, থাংগির কোন দুর্ঘটনা হয়েছে কিংবা সাপখোপের কামড় খেয়েছে। গায়ে বিষাক্ত গোক্ষুর আর, কেউটে সাপের অভাব নেই ।
অনেকেই সাপের কামড়ে মারাও যায়। সে পড়শীদের বাড়ি গেল। এতক্ষণেও বউকে খুঁজতে বেরোয়নি বলে পড়শীরা প্রথমে থারুঙ্গিকে একচোট বকা দিল, তারপর লণ্ঠন জ্বেলে থাংগির সন্ধানে নদীর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল।
থাংগিকে খুব বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হলো না। বালু এখন দুপুরের মত উত্তপ্তও নয় । থাংগিকে পাওয়া গেল নদীর ধারে, একটা গর্তের মধ্যে শুয়ে আছে। তার পাশে পড়ে আছে ঝলসে, কালো হয়ে যাওয়া, নাড়িভুঁড়ি বেরুনো, দলাপাকানো বিকট দর্শন মাংসের একটা দলা।
বেঁচে আছে থাংগি। তার স্বামী তাকে কোলে তুলে নিল। এক গ্রামবাসী মাংসের দলাটা কাঁধের কাপড় খুলে তাতে পেঁচিয়ে নিল। তারপর তারা ফিরে এল গাঁয়ে আলোচনা করতে করতে কী ঘটেছে। আসলে কী ঘটেছে তারা কেউই বুঝতে পারছিল না, অনুমান করতেও পারছিল না। সবাই কথা বললেও শুধু নিশ্চুপ ছিল পাংগির স্বামী। সে থাংগির মতই পাথর বনে গিয়েছিল।
থাংগি আজও বেঁচে আছে। দক্ষিণ ভারতের ওই গাঁয়ে গেলে আপনারা ওকে এখনও দেখতে পাবেন। তবে তার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। কারণ পাগল হয়ে গেছে থাংগি। তবে নির্বাক পাগল। ওই ঘটনার পর থেকে সে বাকহারা হয়ে গেছে চিরতরে। আর সেই ভয়ংকর দিনটির বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় গ্রামবাসীদের।
[গল্পটি বিশেষাদ্রির Riverbed অবলম্বনে লেখা। তবে কাহিনিটি অধিকতর রোমাঞ্চকর করে তুলতে কোথাও কোথাও কিঞ্চিৎ পরিবর্তনের স্বাধীনতা আমি নিয়েছি-লেখক]


কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন