অত্যাচারী বাদশাহ, গল্প
অত্যাচারী বাদশাহ
এক যে ছিলেন বাদশাহ। তিনি যেমনি বদরাগী তেমনি অত্যাচারী। তার কোন কিছুরই অভাব নাই। কিন্তু তবু যেন দুঃখ ঘোচেনা। মনে তার নাই। রাতে তার ঘুম নাই। এত ঐশ্বর্য্যেও তার মন ভরেনা আরো চাষ বাদশাহর মনে সুখ নাই। তাই তাঁর প্রজাদের মনেও সুখ নাই। বেগম সাহেবাও মনের দুঃখে মুখ ভার করে থাকেন। কি করে বাদশাহকে সুখী করা যায় সকলের এই চিন্তা। কিন্তু বাদশার মনে আর সুখ নাই। একদিন রাত্রে বাদশাহ সোনার পালংকে পাখীর পালকের নরম গদীতে শুয়ে ছটফট করছেন কিছুতেই তার ঘুম আসছে না। এমন সময় বাইরে চিৎকার করে কে যেন বলে উঠল- “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এই শব্দ শুনে বাদশার মেজাজ গরম হয়ে উঠল। তিনি এই বেয়াদবকে পাকড়াও করতে আদেশ দিলেন। সিপাই শাস্ত্রীরা গিয়ে একজন পাগলা ফকিরকে পাকড়াও করে নিয়ে এল। এই লোকটিই মোটা গলায় চিৎকার করছিল। “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। সমস্ত রাত এই পাগলটাকে গারদে আটকে রাখা হল।
পরের দিন সকালে বাদশাহ নিজে এই পাগলা ফরিনের বিচার আরম্ভ করলেন। বাদশাহকে দেখে ফকির কিন্তু একটুও বিচলিত হল না বা তাকে কোনরকম সম্মানও দেখালো না। বরং তাকে দেখে হো হো করে অট্টহাসি। হেসে উঠল। তার এই বেয়াদবি দেখে বাদশা বললেন, তোমার সাঙ্গা অতি কঠিন। তোমার শরীরের চামড়া খুলে তাতে লবণ মাখিয়ে কয়েদখানায় রেখে দেব। এইভাবে তোমার মৃত্যু হবে। বাদশাহর কথা শুনে ফকির একটুও বিচলিত হল না। হাসি মুখে বলল বেশ। ফকিরকে দেখে বাদশাহ একটু অবাক হলেন। আবার প্রশ্ন করলেন- আমার কথা শুনে একটুও ভয় হচ্ছে না? ফকির উত্তর দিল- বাদশাহ আমি খোদার ফকির। আমরা মরণকে ভয় করিনা। আমরা যাব খোদার বেহেস্তে। সেখানে চিরসুখ ও চিরশান্তি। সেখানে কোন দুঃখ নেই। সেখানে হাজারো দুধের সরোবর। লক্ষ লক্ষ মধুর সরবতের নহর। খোদাকে যে মানে সেই সেখানে যেতে পারে।
বাদশাহ বললেন, তুমি যদি আমাকে খোদা বলে মানো তবে আমি তোমাকে এখানেই বেহেস্তের মত সুখ দিতে পারি। ফকির বাদশার কথায় বিদ্রুপের হাসি হেসে উত্তর দিল- তুমি দুনিয়ার বাদশাহ হয়ে খোদা হবার বড়াই। করো? তোমার তো আস্পর্ধা কম নয়। ফকিরের কথা আর শেষ হল না । ইঙ্গিতে তাকে শিকলে বেঁধে কয়েদখানায় আটকানো হল। সেই দিন থেকে বাদশাহ মনস্থির করলেন তিনি দুনিয়াতেই বেহেস্ত সৃষ্টি করবেন। তাই তিনি হুকুম দিলেন, দেশের যেখানে যত হীরে মানিক, সোনা রূপা আছে সব এনে আমার মালখানায় জমা দিতে হবে। বাদশার হুকুম পেয়ে তার সিপাই শাস্ত্রীরা চারিদিকে ছুটল আদেশ তামিল করতে। কারো বাড়ীতে একদানা সোনা রূপা থাকতে পারবেনা। বাদশার মালখানা ক্রমে ক্রমে ভরে উঠতে লাগল।। হীরা জহরত মনিমুক্তা আর সোনা দানায়। বাদশাহর সোনার পুরী তৈরী হবে আরো সোনা রূপা চাই। কারো ঘরে আর সোনা রূপা নেই। সিপাইশাস্ত্রিরা খোলা তলোয়ার হাতে দিকে দিকে ছুটে চলেছে সোনা রূপার সন্ধানে।
একদিন এক দুখিনী বিধবা তার ছোট মেয়েটিকে কোলে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছিল।। মেয়েটির গলায় ছিল ছোট একটি রূপোর হাসুলি। বাদশাহর সিপাইরা জোর করে এই মেয়ের গলার হাসুলিটা কেড়ে নিয়ে গেল। এতিমের চোখের পানি তাদের মন ভিজাতে পারল না। ছোট মেয়েটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এদিকে বাদশাহর সোনার পুরী তৈরী হয়ে গেছে। বাদশাহ মহাসমারোহে চলেছেন সেই পুরীতে প্রবেশ করতে। অদ্ভুত কালো মানুষ বাদশাহর সামনে এসে বললেন বাদশা থামো? বাদশাহ তাকিয়ে দেখলেন একটি জমকালো জোয়ান মানুষ পথ আটকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মূলোর মত সাদা দাঁত আর ভাটার মত চোখ।
বাদশাহ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন কে তুমি? কালো লোকটা মোটা ভারী গলায় বলল আমি আজরাইল। খোদার হুকুম পালন করার জন্য আমি ঘুরে বেড়াই। বাদশাহ একটু ভীত হয়ে প্রশ্ন করলেন তা তুমি এখানে এসেছ কেন? বিকট রকম হাসি হেসে আজরাইল বললেন, আজ তোমার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। খোদার হুকুমে আমি তোমার জান নিতে এসেছি। বাদশাহ বললেন, কি আমার অপরাধ? আজরাইল উত্তর দিলেন তুমি মাটির মানুষ হয়ে দুনিয়ার মালিক খোদার সঙ্গে দুশমনি করতে সাহস করেছ। তোমার আস্পর্ধার শেষ নাই। এমন কি নিরীহ এতিমের উপরও তুমি অন্যায় জুলুম করেছ জানো বাদশাহ। এতিমের চোখের পানিতে খোদার আরশ কাঁপতে থাকে। খোদা নিজে তোমার বিচারের ভার নিয়েছেন। এখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। দেখতে দেখতে আজরাঈলের চেহারা আরও ভীষণ হয়ে উঠল। তিনি ভয়ংকর দুই হাতে বাদশার টুটি চেপে ধরলেন। বাদশার লাশ ঘোড়া থেকে নীচে পড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে বাদশার অমন সাধের সোনার পুরী মাটিতে ধসে পড়ল। ফকীর কারাগার থেকে বের হয়ে উচ্চ স্বরে বললেন, খোদা ভিন্ন দুনিয়ার কোন মালিক নেই। অত্যাচারীকে খোদা এমনি ভাবেই সাজা দিয়ে থাকেন।
--------------------সমাপ্ত, ---------------------------
জনাব,আপনার কাছে আর্টিক্যাল গুলো সামান্য ভালো লাগলে মন্তব্য এবং শেয়ার করে আমাকে উৎসাহিত করবেন। যাতে আমি আগামীতে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী আরো সুন্দর কিছু আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন