সততার উপহার, গল্প
সততার উপহার
অনেকদিন আগের কথা। রাজশাহী জেলার সাপাহার গ্রামে বাস করতেন আব্দুস সাত্তার। তার একটি মাত্র পুত্র সন্তান- নাম সাজু। সাত্তারের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। সাজু পড়াশুনা করে। দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করলেও সাত্তার তার ছেলের পড়াশুনা বন্ধ করেন নাই। সামনে সাজুর ম্যাট্রিক পরীক্ষা। টাকা অভাবে বোধহয় ছেলের পরীক্ষা দেওয়া হবে না। তাই তিনি তার শেষ সম্বল দু'বিঘা জমি বাধ্য হয়ে মাত্র এক হাজার টাকায় বিক্রি করে ছেলের পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন। জমিগুলো কিনলেন এক মারোয়ারী। সাজু পরীক্ষা দিলো এবং ভালভাবে পাশ করলো। জমি হারিয়েও সাত্তারের কোন দুঃখ নেই; কেননা ছেলে তার পাশ করেছে। সাত্তারের খুব ইচ্ছা ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করবে। কিন্তু কি করবে, তার কোন উপায় নেই। বাজারে তার ছোট একটা হুক্কার দোকান ছিলো। দোকানটা ছিলো তার ভাড়া করা। শেষে বাধ্য হয়ে ছেলেকে সেই দোকানেই বসিয়ে দিলেন।
একদিন সন্ধ্যালগ্নে সাত্তার বাড়ী ফিরছিলো। পথিমধ্যে সে একটা বস্তার মতো কি যেন পড়ে থাকতে দেখতে পেলো। নিকটে গিয়ে ভালো করে দেখলো সত্যি সত্যিই মুখ সেলাই করা একটা চটের বস্তা। গায়ে নাম লেখা একটা লেবেলও আছে। সে বস্তুটি টিপে দেখলো কিন্তু বুঝতে পারলোনা এর ভিতরে কি আছে। তবে লেবেল দেখে সে অনুমান করলো নিশ্চয় মূল্যবান কিছু আছে। তাই সে বস্তাটি বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে ঘরে তালা বন্ধ করে রেখে একটি জরুরী কাজে শহরের দিকে রওনা হলো। পথিমধ্যে সে একজন লোককে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখলো। কাছে এলে সে চিনতে পারলো এই সেই মারোযারী যার কাছে সে জমি বিক্রি করেছিলো। সে বললো, বাবু এতো ব্যস্ত কেন? মারোয়ারী বললো তোর শুনে কি হবে, যেখানে যাচ্ছিস যা। কিন্তু সাত্তার নাছোড় বান্দা। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, বাবু আপনি মনে হয় কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মারোয়ারী তখন বললো, তোকে বলে কি লাভ? তবুও শুনবি যখন শোন। আমার একটা বিরাট সর্বনাশ হয়ে গেছে। এইদিক দিয়ে যাবার সময় আমার এটা বস্তা হেরে গেছে। বস্তাটিতে মূল্যবান জিনিস ছিলো। সাত্তার বললো, আমি পেয়েছি বস্তাটা। মারোয়ারী আশ্চর্য হয়ে বললো সত্যিই। সাত্তার বললো, সত্যিই, আসুন আমার সাথে।
এই বলে সে বাবুকে তার বাড়ীতে নিয়ে গেলো। বাড়ীতে গিয়ে তালা খুলে বস্তাটি বের করে বাবুকে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাবু চিৎকার করে বলে উঠলেন, এই বস্তাই তো খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। বাৰু দেখলো, বস্তার সেলাই ও লেবেল ঠিকই আছে। বাবু বললো, এই বস্তাটা এখন নিয়ে যাওয়া অসুবিধা। যদি তুমি একটু কষ্ট করে বস্তাটা আমার বাসায় দিয়ে আসতে। সাত্তার বললো, ঠিক আছে বাবু, আমারও একটা কাজে ও দিকেই যেতে হবে। বস্তাটা কাধে করে মারোয়ারী বাবুর শহরের বাসায় পৌঁছে দিলো। বাবু সাত্তারকে বললো পরদিন তার বাসায় দেখা করতে। এছাড়া আর কিছুই বললো না। সাত্তার খুব অবাক হলো। যদিও সে জানেনা বস্তায় কি আছে? কিন্তু তাকে বাবু বলেছিলো বস্তায় মূল্যবান জিনিস আছে। তাহলে আমার পরিশ্রম ও সততার মূল্য কোথায়? আসলে বাবু একটা স্বার্থপর। এরূপ নানা কথা ভাবতে ভাবতে সাত্তার বাড়ী ফিরে এলো।
সাত্তার পরদিন মারোয়ারী বাবুর বাসায় গিয়ে হাজির হলো। বাবু বললেন, বাবা সাত্তার তোমার দেওয়া সেই বস্তায় আমার এক লাখ আশি হাজার টাকা ছিলো। শুধু আমার একার নয়, আরোও দু'জনের। আমরা তিনজন মিলে ব্যবসায় টাকা নিয়ে একত্রে মাল কেনার জন্য সেদিন কলিকাতা যাচ্ছিলাম। আমরা যাচ্ছিলাম গরুগাড়ী চড়ে। আমি ছিলাম গাড়ীর পিছনে আর বস্তাটা ছিলো আমার কাছে। আমি কখন যে ঘুমিয়ে গেছি জানিনা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি বস্তাটা নেই। আমারতো মাথাই খারাপ হবার যোগাড়। অন্য দু'জন তাদের টাকা দাবী করে বসলো। তারা বুঝতেই চাইলোনা যে এটা একটা এ্যাকসিডেন্ট। শেষে আমি নিরুপায় হয়ে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে বস্তার খোঁজে ছুটতে লাগলাম। পথিমধ্যে তোমার সঙ্গে দেখা। কি
চাই না চেছি। শুধু নিজের টাকা হলে না হয় হতো। তোমার মহান্তের কাছে আমি কৃ স্বীকার করছি। তুমি আমাকে অসম্মানের হাত থেকে বাঁচিয়েছ। আমি তোমার কাছে অনেক ঋণী। আমি তোমার জন্য হতে চাই। মারোয়ারা রানু সাত্তারকে আরও বললেন, তুমি যে হুকার দোকান দোকান কি তোমার না ভাড়া? জায়গা কতখানি? সাত্তার বললো, দোকানের জায়গা এরশাদ ধু বার বললো, তুমি এখানে বড় করে পাকা দোকান করলেই পারে। সাজানো, অতো টাকা সাহেবের জয়গার পরিমাণ দশ শতক।
কোথায় পাব। দোকানের ভাড়াই দিতে পারি না ঠিকমত। বাবু বললো, তুমি কোন চিন্তা করনা, ঢাকা আমি দিন। সাত্তার বলে উঠলো, বাবু। সে অবাক হলো যে, কেন বাবু তাকে এত টাকা দিবেন। বাবু বললো, আগামী দিন ইট, বালি, সিমেন্ট রঙ সবই চলে যাবে তোমার ওখানে। তুমি মিস্ত্রীদের দেখিয়ে দিও। সত্যি সত্যিই সময়মত সবকিছু হাজির হলো। সাত্তা না দেখিয়ে দিলো। আর হলো। কয়েকদিন মধ্যেই দোতলা ঘর তৈরি হলো। নীচতলা দোকানের জন্য আর উপর জন্য। সীমানা প্রাচীরও দেওয়া হলো। এরপর বাবু সাত্তারকে দুটি দলিল দিলেন। সাত্তার বললো কিসের দলিল বাবু বাবু বললো, তোমার নিকট থেকে অনেক দিন আগে কমদামে দু'বিঘা জমি কিনেছিলাম। নেই দুইবিঘা জমি তোমাকে আমি দলিল করে দিলাম। আর একটি দলিল হলো চৌধুরী সাহেবের দশ শতক দুায়গা সহ বাড়ীর দলিল। এর কিছুদিন পর বাবু সারারকে বললো, চলো কলিকাতা থেকে বেড়িয়ে আসি। কলিকাতা গিয়ে বাবু বড় একটি মেশিনারী পার্টস এর দোকানে গিয়ে কয়েক লক্ষ টাকার যন্ত্রাংশ কিনলেন। বাবু বললেন, হুক্কার ব্যবসায় বেশী লাভ নেই। এই যন্ত্রাংশগুলো তোমার জন্য কিনেছি। এখন থেকে তুমি এই ব্যবসাই করবে। পাঁচ ট্রাক বোঝাই মাল সাত্তারের দোকানে আসলো। সাত্তার মালগুলো ট্রাক থেকে নেমে নিলো। দোকানে মাল প্রায় ধরে না।
সাত্তার ব্যবসা চালাতে লাগলো। অল্পদিনের মধ্যেই সাত্তার বড় ব্যবসায়ী হয়ে গেল। বাবু একদিন সাত্তারকে ডেকে বললেন যে, “আমি কলিকাতা চলে যাচ্ছি একেবারে। আমি আমার ছেলেকে ঢাকায় বড় ব্যবসা করে দিয়েছি। তুমি আমার ছেলের সঙ্গে দেখা করিও এই ঠিকানায়। এই বলে বাবু ছাত্তারকে একটি ঠিকানা দিলেন। তিনি ছেলেকে আগেই সব বলেছিলেন। বলেছিলেন, সাত্তারের মহত্ত্ব ও বিশ্বস্ততার কথা। সাত্তার মারোয়ারী বাবুর ছেলের সঙ্গে দেখা করলো ঠিকানা মোতাবেক। বাবুর ছেলে সাত্তারকে বললো বাবা আপনার জন্য যা করেছে, তাতে আপনি হতবাক হয়েছেন, জানি। আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি আমাদের যে উপকার করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। আসলে দুনিয়ার কেউ এমন নিঃস্বার্থভাবে দান করতে পারে না। সত্য কথাটা বাবা আপনাকে আগেই বলতে পারতেন কিন্তু বললে আপনার হয়তো ক্ষতি হতো। টাকার শোক এমন শোক যা ছেলে হারানোর চেয়েও অনেক সময় বেশী হয়। মানুষ ছেলে মারা গেলেও মারা যায় না। কিন্তু অধিক টাকা হারানোর শোকে মানুষ পাগলতো হয়ই বরং অনেকক্ষেত্রে হার্ট ফেল করে মারা যায়। আপনি যদি তখন জানতেন যে কি পরিমাণ টাকা আপনার হাতছাড়া হয়ে গেল, তাহলে আপনিও হয়তো পাগল হয়ে যেতেন অথবা মারাই যেতেন। বাবা আসলে একজন নীতিবান ও বুদ্ধিমান লোক। তাই বাবা তখন আপনাকে আসল কথাটা বলেননি। এখন আপনি যে অবস্থায় আছেন তাতে সত্যি কথাটা জানলেও আপনার কোন অসুবিধা হবেনা। আসলে সে বস্তায় টাকা ছিলোনা, ডলার ছিলো। এক লক্ষ আশি হাজার ডলার যা প্রায় ষাট লক্ষ টাকার মতো। একটা বিশেষ কারণে বাবা টাকাগুলো ডলার করে নিয়েছিলেন।
বাবা কলিকাতা চলে গেছেন। যাবার সময় তিনি আপনার বাড়ীর কাছে যে বিশ বিঘা জমি ছিলো তা আপনাকে দলিল করে দিয়ে গেছেন। সাত্তার এতক্ষণ নীরব হয়ে সব শুনছিলো। সাভার এবার বললো, আমি আপনার বাবার কতখানি উপকার করেছি জানি না। তবে আমি যা করেছি তার চেয়ে অনেক বেশী আমাকে আপনার বাবা দিয়েছেন। আমাকে যদি আপনার বাবা একটি টাকাও না দিতেন তবুও আমার করার কিছুই ছিল না। আসলে আপনার বাবা একজন মহৎ ব্যক্তি। অন্য কেউ হলে একশত টাকা পকেট থেকে দিয়ে বলতো মিষ্টি খেও। আপনার বাবার জন্যই আজ আমি সামান্য সাত্তার হুক্কাওয়ালা থেকে সাত্তার চৌধুরী হয়েছি। লোকে আমাকে এখন চৌধুরী সাহেব বলে ডাকে। আমার লেখাপড়া যৎসামান্য; অথচ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হয় এখন সাত্তার চৌধুরী। আমি গ্রামের স্কুলের উন্নতির জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছি। আগামীকাল গ্রামে সভা হবে। সেখানকার প্রধান অতিথি করা হয়েছে আমাকে। সেখানে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আপনি বিশেষ অতিথি হিসাবে যাবেন, আমি খুব খুশী হবো। এসবইতো পেয়েছি আপনার বাবার জন্য। মারোয়ারী বাবুর ছেলে এতক্ষণ সাত্তার চৌধুরীর কথা শুনছিলেন। এবার তিনি বললেন, আসলে আপনি যা পেয়েছেন, তা সততার মূল্য।
--------------------সমাপ্ত, ---------------------------
জনাব,আপনার কাছে আর্টিক্যাল গুলো সামান্য ভালো লাগলে মন্তব্য এবং শেয়ার করে আমাকে উৎসাহিত করবেন। যাতে আমি আগামীতে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী আরো সুন্দর কিছু আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন