Header Ads

Header ADS

ভূতুরে বাড়ীতে রহিম বক্স




ভূতুরে বাড়ী


রহিম বক্সের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে দুলাল আর মেয়ে জরিনা। স্ত্রীসহ ওরা খানেওয়ালা মোট চারজন। আগে অবস্থা ভালো ছিল। নদী এলাকায় ছিল তাই পদ্মা নদী জমি জমা খেয়ে দেয়ে শেষে ভিটা মাটি ঘর বাড়ী পর্যন্ত শেষ করেছে। খালি হাত পা নিয়ে এসে হাকিমপুর চৌধুরীদের পোড়ো বাড়ীতে একট আশ্রয় চেয়ে নিয়েছে। না খেয়ে খেয়ে ওদের শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। পোড়ো বাড়ীর বগলে সপ্তাহে দু'দিন হাট বসে। এই হাটকে সবাই পোড়োবাড়ীর হাট বলে জানে। আশপাশ থেকে চেয়ে নেওয়া কলা গাছের খোড়, মাজি, শাক, কচু ইত্যাদি নিয়ে এসে হাটে বিক্রয় করে আর দোকানে প্রয়োজনীয় পানি এনে দিলে ওরা প্রত্যেকে আট আনা করে দেয়। ওর স্ত্রী কিছু দূরে অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে মাসে ত্রিশ টাকা এবং দুপুরে খাবার পায়। এই ভাবে তাদের দিন কাটে। চৌধুরীর পোড়ো বাড়ীতে পরিচিত কেউ থাকতে চায়না বরং অপরিচিত কেউ থাকলে দু'চারদিন থেকে ভয়ে পালিয়ে যায়। কথায় বলে না বনের বাঘে মানুষ খায়না মনের বাঘে মানুষ খায়।


কেউ দেখেছে রাতের বেলায় হাতি, কেউ দেখেছে মরা লাশের মাথা। আবার কেউ শুনেছে বিকট রকমের হাসি কান্না। এমনকি বেশী রাতে শিশুর কান্নাও শোনা গেছে। আগুন জ্বলতেও দেখেছে কেউ কেউ। কাউকে ওখানে মরে পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। হঠাৎ কেউ কেউ গভীর রাতে ঘরের ছাদের উপর মেয়ে মানুষকে বেড়াতে দেখেছে। চৌধুরী সাহেবকে সবাই বলেছে, রহিম বক্স যতদিন পারে এখানে থাকবে। তবে কোনদিন যে কি ঘটে যায়। বেশ মনে আছে একদিন গভীর রাতে রহিম বক্স ক্ষুধার জ্বালায় চৌধুরী বাড়ীতে খাবার চাইতে গিয়েছিল। কেউ কথা বলেনি, দরজাও খোলেনি। পরে নাকি ভিতর থেকে পরিচয় নিয়ে বলেছে, রহিম তুই যদি ভূত হয়ে এসে থাকিস তার কি কোন প্রমাণ আছে? তবে দিনের বেলা এসে ভাত তরকারী নিয়ে যাস। পরদিন থেকে সে প্রতিদিনই একজনের খাবার পেতে থাকে।


একদিন এক কবর থেকে শিশুর মরাদেহ শিয়াল তুলে এনে সে অন্ধকারে পোড়ো বাড়ীর এক ঘরে বসে পরম আরামে চিবুতে থাকে। হঠাৎ রহিম বক্স রাতে পায়খানা করতে উঠে শব্দ শুনতে পায়। সে পাশের ঘরে ঢুকে শিয়ালকে তাড়া করে। শিয়াল দৌড় দেয়। ভোরবেলা সে দেখতে পায় একটা বাচ্চা ছেলের পা। সে কিছু মনে করে না। দৌড়ে গিয়ে সে চৌধুরী সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসে। দিনের বেলা বলেই তিনি। আসতে সাহস পান। এসে মরা মানুষের পা দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। পরে রহিম বক্স তাকে বাসায় পৌঁছে দেয়। রহিম বক্স নিজেই ঐ পা খানা নিয়ে কবর খুঁজে বের করে সেখানে পা খানা রেখে মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। চৌধুরী সাহেব বাসায় সুস্থ হয়ে সবাইকে বলতে থাকে সত্যিকার একটা ভূতের ঠাং। চারিদিকে এ খবর ছড়ে পড়লো। এরপর থেকে হাট পর্যন্ত অল্প রাতে ভেঙ্গে যেতে লাগলো। একটা মজার ব্যাপার ঘটলো। তাহলো চৌধুরী সাহেব রহিম বক্সকে বললেন, ওয়েন আর তার বাড়ীতে না আসে। ভাতের বদলে ওকে মাসে মাসে ৫০০ শত টাকা করে পাঠিয়ে দেবেন। রহিম বক্স আসল ব্যাপারটা বলতে চাইলে চৌধুরী সাহেব কিছুতেই শুনতে চাইলেন না বরং ওকে তিনি তাড়াতাড়ি বিদায় করে দিলেন।


একদিন রাতে একদল ডাকাত এলো পোড়াবাড়ীতে। ডাকাতরা রহিম বক্সকে দেখে তাড়িয়ে না দিয়ে বরং আশ্চর্য হলো। রহিম বললো, তার বাড়ীঘর নদীর ভাঙ্গনে শেষ হয়ে গেছে। শহরে এসে কাজও পায় নাই। সবাই বলে এটা নাকি ভূতড়ে বাড়ী, তাই চৌধুরী সাহেবকে বলে এখানে থাকার হুকুম পেয়েছে। ডাকতেরা জানতে পারল যে গ্রামে কেউ তাকে ঢুকতে দেয়না। সে এটাও শুনেছে যে হাটের নাম বদলিয়ে ভূতের বাড়ীর হাট রাখা হয়েছে। ডাকাতরা রহিমকে ভালো ভাবে বললো যে, তারা মাঝে মধ্যে হঠাৎ রাতের আধারে এখানে এসে আশ্রয় নিবে। একথা অন্য কেউ জানতে পেলে রহিম বক্সের সবাইকে কচুকাটা

করা হবে। ডাকতেরা একজায়গায় ডাকাতি করে ফিরে এসে রহিমের অভাব দেখে তাকে হাজার পাঁচেক টাকা দিলো রহিম টাকা গুলো পাতিলে করে মাটিতে পুতে রাখে। একদিন এক বৃদ্ধ লোক রহিম বক্সকে ডেকে আম তলায় বসে বলতে লাগলেন। কি গো ভূতড়ে


বাড়ীতে থেকে কয়টা ভূত দেখলে? রহিম বক্স বললো বেশী না চারটা ভূত দেখেছি। বৃদ্ধ বললো পুরুষ না মহিলা, সে বললো একটা ভূত বয়স্ক পুরুষ আর একটা বয়স্ক মহিলা ভূত। এছাড়া একটা ছেলে ও একটা মেয়ে ভূত। এই ভূতেরা দিনেও থাকে আবার রাতেও থাকে। বৃদ্ধ হাসতে হাসতে বললো, তুমি দেখছি ভূতের আসল বাবা। যাক তুমি থাকতে পারবে এ বাড়ীতে। বৃদ্ধ বললো অনেক দিন আগের কথা তখন আমি ছিলাম জোয়ান মরদ। এই বাড়ীর পাশ দিয়ে একদিন যাচ্ছিলাম। এক লোক দেখি দৌড়ে যাচ্ছে। ওকে জিজ্ঞেস করলে ও বললো সামনে একটা হাতী ওঁর দোলাচ্ছে। আমি সাহস করে হাতী দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি জ্যোৎস্নারাতে একটা বাঁশের শুকনো মাথা বাতাসে উঠানামা করছে। দেখতে ঠিক হাতির গুড়ের মতই। বাঁশের গোড়ায় ঝোপ ঝাড়ে ওকে একটা আস্ত হাতী করে রেখেছে। পরদিন থেকে রটে গেল পোড়োবাড়ীতে এককালে হাতী দেখেছে। সবাই ভয়ে অস্থির। সন্ধ্যা লাগতেই সবাই ঘরে ফিরে দরজা লেগে দিতে লাগলো। আমার কথা আর কেইবা শুনবে বলো। বেশ কিছুদিন আগে চৌধুরী সাহেব এখানে কয়েকটা কলাগাছ লাগিয়ে ছিলেন। একদিন গ্রামের জসিমউদ্দিন দূরের হাট করে বাড়ী ফিরছিল। সে সামনে জ্যোৎস্নার আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেল একটা লোক হাত নেড়ে ওকে ডাকছে। ও দেখা মাত্রই ওখানে দাঁড়িয়ে গেল। সামনেও যায় না, পিছনেও যায় না। ঘেমে মরদ একেবারে সারা হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে দেখা গায়ে হাত দিতেই ও চিৎকার করে দূরে দেখিয়ে বললো-ভূত হাত দিয়ে ডাকছে। একথা বলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। লোকজন ডেকে ওকে বাড়ী পাঠিয়ে দিলাম। আমি নিজে দেখতে গেলাম কে জমিস উদ্দিনকে ডাকছে। গিয়ে দেখি ভূতটা হলো একটা কলাগাছের শুকনো পাতা বাতাসে নড়ছিল। ওটা আর দূর থেকে মনে হচ্ছিল একটা মানুষ যেন হাত নেড়ে ডাকছে।


বৃদ্ধ বললো তিনি তখন ছোট। তার এক বন্ধু শ্মশান ঘাটের পাশ দিয়ে আসছিল। সে যা দেখেছে তা বর্ণনা করতে পারছিল না। সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে আগুন জ্বলছে আর নিভছে। আর কে যেন শিষ ফোটাচ্ছে। ওর হাতে ছিল একটা বড় টর্চ লাইট। সে জ্বালিয়ে দেখে একটা কংকালের মাথা। সে টর্চটা ওখানে ফেলে এসেছে। আমি ওখানে যেতে চাইলে সে বললো খবরদার যেওনা মেরে ফেলবে। আমি ওর বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে শ্মশানের দিকে চললাম ঐ রাতেই, কেননা ভূত তো দেখতে হবেই। তাছাড়া টর্চটাও আনতে হবে। শেষে সে বললো তুমি ভালো ভালোই টর্চটা নিয়ে ফিরলে ঐ টর্চটা তোমাকে দিয়ে দিব। একথা শুনে আনন্দে গান গেয়ে ওর ভাইয়ের সাথে চললাম। ঘোর অন্ধকার শ্মশানের চারিধার। একটু দূরে দেখা গেল আগুন জ্বলছে আর নিভছে। আরো একটু কাছে যেতেই শিষ শোনা গেল, এমনকি হাড় খাওয়ার কটমট শব্দও শোনা গেল। বন্ধুর ভাই আর যাবে না সে পিছনের দিকে দৌঁড় দিল। আমি নিকটে যেতেই পায়ের সাথে টর্চলাইটা ঠোকা খেল। আমি লাইট হাতে তুলে নিলাম। আমার সাহস বেড়ে গেল। টর্চ জ্বেলে দেখি গোটা ৪/৫টা কংকালের মাথা পড়ে আছে। নিকটে গিয়ে বসে দেখলাম বেশ কিছু জোনাকি পোকা মাথার চোখের গর্তের ভিতরে ঢুকে জ্বলছে আর নিভছে। আর বাতাস এক কানের ছিদ্র দিয়ে ঢুকে অন্য কানের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় হুম হুম করে শব্দ হচ্ছে মনে হচ্ছে- যেন শিষ ফোটাচ্ছে। এটা দেখে সাহস আরো বেড়ে গেল। বেড়াতে বেড়াতে দেখি পাশে একটা শিয়াল নতুন একটা লাশের হাড্ডি চিবুচ্ছে। আমাকে দেখেই দৌড় দিল। বন্ধুর মত দুর্বল লোক হলেই বলতো কংকালটা কটমট শব্দ করে মানুষ খাচ্ছে অথবা তার দিকে আসছে। ফিরে এসে বললে কেউ বিশ্বাস করলো না। তবে আমার সাহস হলো আর লাভ হলো টর্চ লাইটটা। কেননা রাতেই ফিরে টর্চটা দেখেনোর জন্য সে নিজের টর্চ বুঝতে পারলো। অন্ততঃ আমি সত্যিই শ্মশানে গিয়েছিলাম। একদিন রাতে শ্মশানের পাশদিয়ে যাবার সময় আমার পাশদিয়ে একটা ঘোড়া লাফ দিল। দেখে মনে করলাম কারো ঘোড়া চড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর বন্ধু হলে বলতো ভূত জীন পরী ইত্যাদি। চৌধুরী বাড়ী থেকে পাওয়া মাসিক পাঁচশত টাকা আর মাঝে মাঝে ডাকাতদের বকশিশ পেয়ে রহিম


বক্সের দিন বেশ ভালো ভাবে কেটে যেতে লাগলো। ওর ছেলেরাও বড় হতে লাগলো। ঐ গ্রামের স্কুলে


ছেলেদের পড়াতে চাইলে মাস্টার মশাই পরিচয় পেয়ে যখন জানতে পারলেন সে ঐ ভূতুরে বাড়ীর ছেলে


তখন আর ভর্তি করলো না। সে দূরের এক স্কুলে ভর্তি করালো। বাগানের ফল ফলাদি বেশীর ভাগই রহিম


বক্সেরা খায়। গাছের খড়ি কাটে চৌধুরী কিছু বলে না। আজ রহিম বক্সেরা কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে


না। সরকার থেকে এ বাড়িটা দখল করে ভেঙ্গে একটা সরকারী স্কুল তৈরী করেছে। অবশ্য সরকার বাহদুর


স্কুলটির নাম চৌধুরী বাড়ী হাইস্কুল বলে নামকরণ করেছেন। চৌধুরী বংশের দু'একজন আজও বেঁচে আছে।


তবে পুরাতন লোকজন কেউ বেঁচে নেই।


জনাব আমার লেখা গুলো যদি আপনার কাছে ভালো লাগে তাহলে মন্তব্য এবং শেয়ার করুন যাতে আমি আগামী তে আরো নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারি। 

কোন মন্তব্য নেই

  [ছেলোদের পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের ২য় তলায়, তারিখ- ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং মেয়েদের পরীক্ষা মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ এর প...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.