Header Ads

Header ADS

আদর্শ করিম



 আদর্শ করিম

স্কুল বসবার দেড় ঘণ্টা পরে করিম বই নিয়ে ক্লাসে ঢুকতেই সেকেন্ড পণ্ডিত মশায় বলে উঠলেন। “স্ট্যান্ড আপ অনদি বেঞ্চ।” মোড়লদের করিমকে চেনেনা স্কুলে বা তার বস্তিতে এমন কোন লোক নেই। বেশ মোটাসোটা চেহারা রঙটিও কিছু নিন্দের নয়। লম্বায় ও ক্লাসের সকলের চেয়ে উঁচু। স্কুলের সব ছেলেই তাকে করিম ভাই বলে ডাকে। তার কথামত কাজ করে। এমন কি ফার্স্ট বয় করেলও তার অনুগত। মহিমপুর স্কুলের সঙ্গে ফুটবল খেলতে ওই দু'টো গোল দিয়ে এস. ডি. সাহেবের দেওয়া কাপ নিয়ে এসে লাইব্রেরীতে সাজিয়ে রেখেছে। সহপাঠিদের মধ্যে কাদের, লতিফ, কাসেম, জলিল আর পাড়ার কয়েকটি ছেলে নিয়ে তার একটি দলও আছে। তাদের কাজ হচ্ছে প্রতি শুক্রবারে পাড়ার রাস্তার দু'ধারে আগাছা ঝোপ জঙ্গল পরিস্কার করা। শ্মশানের হাঁড়িকুড়ি ভেঙ্গে ফেলা, গাছের ডাল আর মাটি কেটে ভাঙ্গা রাস্তায় ছোট ছোট পুল তৈরী করা। এর জন্য মোটা মোটা লাঠি, ছোট কুড়াল আর কোদাল তারা আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখে। এদের অফিস ঘর করিমদের বাড়ির পশ্চিম পাশের বারান্দা ঘরে। যখন ও সরে পাঁচ বছরের বাচ্চা তখন ওর আব্বা মারা যায়। তাই ওর আম্মা কোন কাজেই ওকে বাধা দেন না।

পন্ডিত মশায়ের তর্জনে করিম দেরিতে এসে লজ্জিত হলো আরও বেশী। পন্ডিত মশায় কারণ জিজ্ঞেস না করেই ওকে পিছনের বেঞ্চে দাঁড়াতে বললেন। ঠিক এমনি সময়ে ক্লাসে এসে ঢুকলো একটি নতুন ছেলে। আজই সবে ভর্তি হয়েছে সে। সাজ পোশাক তার বেশ জামকালো। কিন্তু চেহারা খানা ভারী ডিগডিগে। সে সালাম দিতেই পন্ডিত মশাই জিজ্ঞেস করলেন কি নাম তোমার? সে বললো বাদল রহমান। পন্ডিত মশায় আবার বললেন, থাকো কোথায়? বললো দক্ষিণ পাড়ায় ইব্রাহীম সাহেবের বাড়ী। উনি আমার ছোট চাচা। পন্ডিত মশায় বললো আচ্ছা বলতো অলুক সমাস কাকে বলে? বাদল দেরি না করেই বললো তৎপুরুষ সমাসে পূর্ব পদের বিভক্তির লুক বা লোপ হয় না তাহাকে অলুক সমাস বলে। যথাঃ অন্তে বাস করে যে = অন্তবাসী। পণ্ডিত মশাই আচ্ছা যৌগিক বাক্য কাকে বলে? বাদল বললো দুই বা ততোধিক নিরপেক্ষ বাক্য অবায় দ্বারা যুক্ত হইয়া একটি বাক্যে পরিণত হইলে তাহাকে যৌগিক বাক্য বলে। ছেলেরা এ ওর মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। পন্ডিত মশায় অতি মাত্রায় খুশী হয়ে বললেন, আচ্ছা বসোগে ঐ খানটায়। আব্বাস তার কাছেই খানিকটা জায়গা করে দিল বাদলের জন্য।

এতক্ষণে করিমের অবস্থাটা সকলে ভুলেই গিয়েছিল। পন্ডিত মশায় এইবার করিমের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন এতো দেরি কেন? তোমার পড়া হয়নি বুঝি। লজ্জায় অপমানে করিমের মুখ দিয়ে টু শব্দটি বেকল না। সোহাগ দাঁড়িয়ে জবাব দিলো এর কোন দোষ নেই স্যার। পাড়ায় প্রাণ মোড়লের ছেলের কলেরা হয়েছে। প্রতিবেশী কেউ ভয়ে ওখানে যায় না। তাদের আবার লোকজন নাই। তাই করিম ভাই সেবা শুশ্রদ্ধার জন্য ওখানেই ছিল। পন্ডিত মশায়ের চোখে মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠলো। কারণ ঐ রোগটার নামেই তিনি শিউরে ওঠেন। তাই সস্নেহে তিনি বললেন ছিঃ করিম আগে বলনি কেন? খামাকা শাস্তি পেতে হলো। বস বস। বাদল কিন্তু করিমের দিকে তাকিয়ে হাসলো। তাচ্ছিল্যের হাসি বোধ হয়। সে হাসির মানে এই যে পড়ার চেয়ে রোগীর মলমূত্র পরিষ্কার করা বড় হলো।

ষাম্মাসিক পরীক্ষার ফল বেরুতে দেখা গেল, বাদল প্রথম স্থান অধিকার করেছে আর করিম পড়েছে সকলের নীচে। সেই থেকে শিক্ষকবৃন্দগণ বাদলের প্রতি আদরের মাত্রা একটু চড়িয়ে দিলেন। আর বাদলের মনেও জন্মালো অহঙ্কার। বাদলের বাসায় গিয়ে করিম যখন বললো ভাই অমায় অঙ্কটা একটু শিখিয়ে দাও না। তখন বাদল গম্ভীরভাবে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকে পরামর্শ দিল ধারাপাত কিনে কড়াকে মুখস্থ করতে। স্পেলিং বুক ছাড়া যে ইংরাজীতে পাশ করবার কোন উপায় নাই। একথাও একদিন বুঝিয়ে দিয়েছে লিটনকে। কিন্তু মুখে গাম্ভীর্যের ভান করলেও সে করিমকে ভয় করতো খুব। তাই তার দলের বিরুদ্ধে অনেক কথাই প্রচার করতো গোপনে গোপনে। রায় পুকুরে পানা তুলতে গিয়ে কাল করিমের ডানপাটা অনেকখানি কেটে গিয়েছিল। তাই আজ আর স্কুলে বা খেলার মাঠে কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। বসে বসে ব্যা েস্তব্ধ করছিল সে।

এমন সময় পাশের ঘর থেকে যা চীৎকার করে উঠলেন খোকা আগুন। আগুন। করিম লাফিয়ে বলে উঠলো কোথায়। তার পর ছুটলো সোজা পথে। মা চেঁচিয়ে বাধা দিলেন যাসনে বাবা ব্যথা পায়ে। দূর থেকে করিম জবাব দিল মানা করতে নেই মা। হাঁপাতে হাঁপাতে বাদলের হাতটা চেপে ধরে সে বললো ছুটে এসো ভাই জলিলদের বাড়ীতে আগুন লেগেছে। হাতটা। ছাড়িয়ে সে জবাব দিল সময় নেই কালয়ে পরীক্ষা। হতাশ হয়ে সে ছুটলো খেলার মাঠে। দূর থেকে ইঙ্গিত করতেই ছুটে এলো তার দল। যখন করিম ঘটনাস্থলে পৌঁছিল তখন সকলে চিৎকার করছে। এতক্ষণে বোধ হয় আর কিছু নেই। চারপাশে আগুন জ্বলছে। করিম ব্যাপারটা মোটামুটি জেনে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পাড়লো আগুনের মধ্যে। একটু পরেই বেরিয়ে এলো বিছানা সমেত রোগীকে নিয়ে। কিন্তু রোগীর পাশেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। সারাটা গা তার পুড়ে ফোসকা পড়ে গেছে। ডান পা দিয়ে রক্ত পড়ছে ঝর বার করে। রোগীর বিশেষ কিছু হয় নাই। ভীড় ঠেলে ভিতরে এসে হেড মাস্টার মশায় চেঁচিয়ে উঠলেন এে আমাদের করিম। চোখ দিয়ে তার দু'ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। ডাক্তার এলো-করিম চোখ মেলেছে। এমন সময় বাদল কোঁচা দোলাতে দোলাতে ভীড় দেখবার জন্য সেখানে হাজির। হেড-মাস্টার মশায় বললেন, তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে বাদল?

বাদল বললঃ পড়ছিলাম স্যার, হেড মাস্টার মশায় আরো বললেন, এত বড় ব্যাপার হয়ে গেল তুমি কিছুই জানতে না এ সবের। বাদল বললো করিম প্রথমেই আমাকে বলেছিল। কিন্তু কাল যে পরীক্ষা তাই আসিনি। হেড মাস্টার মশায় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে করিমের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, একে চিনতে পারো? আমাদের করিম। ফার্স্ট না হয়েও করিমের আদর্শ আমাদের স্কুলকে গৌরবান্বিত করেছে। একদিন এই দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবে। পরীক্ষায় দুটা নম্বর বেশি পেলেই আদর্শ হওয়া যায় না। অপরের দুঃখকে আপনার করে ভাবতে পারাই প্রকৃত শিক্ষা।

জনাব আমার লেখা গুলো যদি আপনার কাছে ভালো লাগে তাহলে মন্তব্য এবং শেয়ার করুন যাতে আমি আগামী তে আরো নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারি। 

কোন মন্তব্য নেই

  [ছেলোদের পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের ২য় তলায়, তারিখ- ৯ই ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং মেয়েদের পরীক্ষা মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ এর প...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.