গানের পাখী বুলবুল
গানের পাখী বুলবুল
অনেক দিন আগে এক দেশে ছিলেন এক রাজা। তার ধন দৌলত যেমন ছিল অফুরন্ত তেমনি ছিল সৈন্য সামন্ত। সারা দুনিয়ায় তার প্রাসাদের মত এমন সুন্দর প্রাসাদ আর একটিও ছিল না। সে প্রাসাদের সাথে ছিল একমত বড় বাগান। বাগানে অনেক প্রকার ফুল ফুটতো। প্রত্যেকটি ফুলে আবার ছোট ছোট ঘন্টা বাঁধা থাকতো। বাগানে কোন মানুষ এলেই ঘন্টাগুলো আপনা থেকে বেজে উঠাটো টুন, টুন টুন। রাজার এই বাগানের কোথায় যে আরম্ভ আর কোথায় যে শেষ তা কেউ জানতো না। এমন কি বাগানের মালীরাও না। বাগানটির মাঝখানে ছিল এক সুন্দর হৃদ। সে হৃদের তীরে কতকগুলি বড় বড় ফুলের গাছ ছিল। সেখানে থাকতো একটা ছোট বুলবল। মনের আনন্দে মুক্ত বাতাসে পাখা মেলে উড়ে বেড়াতো আর গান গাইতো। বুলবুলের গানের সুর এত মিষ্টি ছিল যে, যেই শুনতো সেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতো। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণকারীরা আসতো রাজার এমন সুন্দর প্রাসাদ ও বাগান দেখার জন্য। তারা রাজার প্রাসাদ ও বাগানের প্রশংসার মুখর হয়ে উঠতো। কিন্তু সেই বুলবুলের সুমিষ্ট সুর লহরী যখন তাদের কানে ভেসে আসতো, তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলতো- বুলবুলটির গানই আমাদের বেশি ভালো লেগেছে। ক্রমে বড় বড় কবিরা বুলবুলটির সম্পর্কে কবিতা লিখলেন। লেখকেরা বুলবুলের গানের সুন্দর বর্ণনা দিয়ে অনেক বই লিখে ফেললেন। অনেক বই রাজার হাতে আসতে লাগলো। কিন্তু তিনি প্রত্যেক বইতেই বুলবুলের বর্ণনা দেখে অবাক হলেন। তিনি বুলবুলটির সম্বন্ধে কিছুই বুঝলেন না।
রাজা একদিন বলে উঠলেন, কই আমিতো বুলবুল সম্বন্ধে কিছুই জানিনা। এমন বুলবুল আমার বাগানে আছে বলে তো জানিনা। বিদেশী লেখকদের বই থেকেই আমার বাগানের বুলবুলের কথা আমার জানতে হলো। তিনি তখনি প্রধান উজিরকে ডেকে পাঠালেন। রাজা তাকে বললেন, দেখুন উজির সাহেব আমার রাজ্যে এমন পাখীর কথা আমিতো কখনো শুনিনি। আমি আদেশ দিচ্ছি আজই বিকেলের মাঝে বুলবুলকে যেন ধরে আনা হয়। আমি গান শুনবো। প্রত্যুত্তরে উজির বললো- মহারাজা আমিও কখনো এমন পার্থীর নাম শুনিনি বা দেখিনি। আচ্ছা আমি এখনি লোক লস্কর পাঠাচ্ছি। তখনি বুলবুলের খোঁজ পড়ে গেল। সৈন্য সামন্তরা ছুটলো বুলবুলের সন্ধানে। সারাদিন খুঁজে হয়রান হয়ে অবশেষে হতাশ হয়ে সৈন্যরা ফিরে আসছিল, এমন সময় রাজবাড়ীর দাসীর এক ছোট মেয়ের সাথে তাদের দেখা হলো। মেয়ে তাদের কথা শুনতে পেয়ে বললো, তোমরা বুলবুল পেলে না তোমরা আমার সাথে এসো। আমি দেখিয়ে দেব। আমি প্রতিদিন আমার রুগ্ন মায়ের জন্য খাবার নিয়ে যাবার সময় পথে বুলবুলটির সাথে দেখা পাই। ওর গান ভারী মিষ্টি। আমি প্রতিদিনই ওর গান শুনি। আনন্দের অশ্রু আমার চোখ থেকে নেমে আসে। যখনি আমি গান শুনি আমার মনে হয় যা আমাকে চুমো দেবার জন্য ডাকছেন। সবাই মেয়েটির পিছনে পিছনে চললো। হৃদের তীরে গভীর জঙ্গলের একটি পথ দিয়ে সবাই চলছে। এমন সময় একটি প্রাণ মাতানো সুর তাদের কানে ভেসে এলো। মেয়েটি তখন কয়েকটি সবুজ পাতার আড়ালে একটি ধুসর রঙের পাখীকে দেখিয়ে বললো, ঐ দেখ বুলবুল গান গাইছে। মেয়েটি বুলবুলকে লক্ষ্য করে বললো, ওগো মধুর বুলবুল আমাদের মহারাজা তোমার গান শুনতে চেয়েছেন। বুলবুল বললো- আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথেই গান গাইব। বলেই সে আবার গান শুরু করলো।
সবাই এমন মিঠে সুর শুনে চমৎকৃত হয়ে গেল। গান থামিয়ে সে আবার বললো- সবুজ বনের মাঝেই আমার গান ভালো শুনায়। তবে মহারাজ যখন বলেছেন, তখন একবার বিকেলে গিয়ে গান শুনিয়ে আসবো। সেদিন রাজপ্রাসাদ আরো সাজান হলো। হাজার হাজার সোনালী আলোয় হীরা মুক্তা জহরতে
রাজপুরী ঝলমল করতে লাগলো। বুলবুলের আসন হীরা মুক্তা আর জহরত দিয়ে সাজানো হলো। অনেক দুর্লভ পুষ্পে রাজ দরবার মোহিত হলো। ধুসর বুলবুল পাখী তার উপর উড়ে এসে বসলো। রাজার আদেশে বুলবুল গান শুরু করে দিল। বুলবুলের গান শুনে রাজার দুচোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। বুলবুলের গান ক্রমে মধুরতর হতে লাগলো। -সমস্ত রাজ দরবার স্তম্ভিত হয়ে গান শুনলো। গান শুনে রাজা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং বুলবুলকে তার গলায় মুক্তার হার ছড়া উপহার দিতে চাইলেন। কিন্তু বুলবুল অস্বীকৃতি জানিয়ে। বললো- মহারাজ আমার গানে আপনার দুচোখ বেয়ে অশ্রু নেমেছে এই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
বুলবুলকে রাজ দরবারে রাখা হলো। তাকে একটি সোনার খাঁচায় থাকতে হয়। দিনে মাত্র দুবার এবং রাতে মাত্র একবার বাহিরে যাওয়ার আদেশ পায়। কিন্তু সে সময়েও তার পায়ে রেশমী সূতা বাধা থাকে। বুলবুল এতে কোন আনন্দেই পায়না। সমস্ত শহরময় রাজার এই বুলবুলের কথা রটে গেল। এদিকে রাজা একদন্ড বুলবুলের গান না শুনে থাকতে পারেন না। একদিন প্রধান উজির এসে রাজাকে বললেন, মহারাজ বুলবুলের গান না হলে আপনার এক মুহূর্তও চলে না, তবে বুলবুলটি মরে গেলে কি উপায় হবে। রাজা তখন আৎকে উঠলেন। বুলবুলের মৃত্যুর কথা তিনি ভাবতেও পারলেন না, তাই রাজার রাজ্যের প্রধান কারীগরদের ডেকে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে বুলবুলটির অনুরূপ একটি বুলবুল তৈরি করতে বললেন। নির্দিষ্ট দিনে রাজ্যের শ্রেষ্ঠ কারীগর তার নির্মিত বুলবুলটি নিয়ে রাজ দরবারে হাজির হলো। সে বুলবুলটির ভিতরে ছিল স্প্রিং। এই নকল বুলবুলটির গায়ে হাঁরা মুক্তা বসানো থাকায় আসল বুলবুলটির চেয়েও সুন্দর লাগলো। ফলে নকল বুলবুলটি দেখে রাজা বড় খুশি হলেন। এই নকল বুলবুলটিও বনের বুলবুলের মতো মিষ্টি সুরে গান গাইতে পারতো। কিন্তু বনের বুলবুলের মত একাধিক গান গাইতে পারতো না। শুধু একটি গানই বারবার গাইতো। রাজা এবং দরবারের সবাই এই কৃত্রিম বুলবুলটির দিকে আকৃষ্ট হলো। তারা এক রকম আসল বুলবুলের কথা ভুলেই গেল।
একদিন সোনার কাঁচা ছেড়ে বনের বুলবুল সবার অগোচরে বনে উড়ে গেল। রাজ দরবারের সবাই জানলো-বনের বুলবুলের রাজার প্রতি এই অকৃতজ্ঞতার জন্য সবাই বুলবুলের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিল। ক্রমে তারা আসল বুলবুলের কথা ভুলেই গেল। দিনের পর দিন অতিবাহিত হতে লাগলো। রাজা নকল বুলবুলের গান মুখস্থ করে ফেললেন। এখন একই গান আর ভালো লাগে না। বনের পাখীর জন্যে রাজা বড় দুঃখ পেলেন এবং শিঘ্রই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একদিন নকল বুলবুলটির ভিতরের স্প্রিং গেল ছিঁড়ে। রাজা তখন কারীগর ডেকে পাঠালেন। কিন্তু সে কারীগর এই কৃত্রিম পাখিটি ভালো করতে সক্ষম হলো না।। চিরদিনের জন্যই এই কৃত্রিম পাখীটির গান থেমে গেল। রাজার অবস্থাও দিন দিন খারাপ হতে লাগলো। রাজ্যের বড় বড় হেকিম এলো কিন্তু সবাই নিরাশ হয়ে চলে গেল। রাজা বনের বুলবুলের ভাবনায় অস্থির হলেন। একদিন বিকালে হঠাৎ রাজা জানালার উপরে নুয়ে পরা একটি ডালে বুলবুলটিকে দেখতে পেলেন। রাজার চোখে এলো অশ্রু বন্যা। রাজা বুলবুলটিকে গান গাইতে বললেন। বুলবুল গান গেয়ে চললো- অতি মধুর সে সুর। গান শেষ হয়ে গেল। রাজা বললেন, তুমি আমার সব দুঃখ দূর করেছ। বল তুমি কি পুরস্কার চাও? বুলবুল বললো, মহারাজ আমিতো পুরস্কার পেয়েছি। আমি প্রথম যেদিন আপনার দরবারে গান গাই সেদিন আপনার চোখে জল এসেছিল এবং আজও আপনার চোখে জল এসেছে এটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
বুলবুল গান গেয়ে চললো। গান শুনে রাজা গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে রইলেন। তিনি যখন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন তখন তার মনে আনন্দের জোয়ার বইতে লাগলো। বুলবুলকে রাজা বললেন, তুমি আমার সাথে থাক না কেন? বুলবুল বললো, তা হতে পারে না রাজা মশায়। সবুজ বনেই আমার গান গাইতে ভালো লাগে। বিরাট প্রাসাদে আমি নীড় রচনা করে আনন্দ পাবো না। আমি নীল আকাশের বুকে সহজে আনন্দে পাখা মেলে উড়ে বেড়াই। কখনো উড়ে গিয়ে দরিদ্র জেলেদের গান শুনাই, কখনো দরিদ্র কুটির আমার গানে আনন্দ মুখর হয়ে উঠি। তারা থাকে আপনার এই হীরে জহরতে ঝলমল করা রাজপ্রাসাদ থেকে অনেক দূরে শ্যামল বনানীর মাঝখানে। আমি আপনার মুকুট থেকে, আপনার হৃদয়কে বেশী ভালোবাসি। আমি মাঝেমাঝে এসে আপনাকে গান শুনিয়ে আনন্দ দেব। যারা সুখী ও দরিদ্র আমি তাদেরই গান গাইবো। কিন্তু আপনি প্রতিজ্ঞা করেন যে আর কখনো আমার পায়ে শিকল জড়াবেন না বা বেঁধে রাখতে চেষ্টা করবেন না। রাজা রাজী হলেন। ছোট বুলবুলটি আর একটি গান গাইলো অত্যন্ত মধুর সে গান। রাজা গান শুনে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। বনের বুলবুলটি উড়িয়ে গিয়ে শ্যামল বনের মাঝখানে মিলিয়ে গেল।
জনাব আমার লেখা গুলো যদি আপনার কাছে ভালো লাগে তাহলে মন্তব্য এবং শেয়ার করুন যাতে আমি আগামী তে আরো নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারি।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন