অজান্তেই আরো একটা মাডার করলাম
অজান্তেই আরো একটা মাডার করলাম
ওয়ালাইকুম আসসালাম' বলতে বলতে সামনের হোটেলটাতে ঢুকলাম আমি। ঢোকার সাথে সাথে দুইজন পরিচিত বৃদ্ধ লোক 'বাবা, কেমন আছ?' বলতে বলতে হোটেল থেকে বেরিয়ে গেল। ঢোকার পর আমার নির্দিষ্ট টেবিলটাতে বসতে না বসতেই হোটেলের পিচ্চি ছেলেটা আমার পছন্দের দুধ-চিনি বর্ধিত লিকার কম জাতীয় এক কাপ চা সশব্দে টেবিলে রেখে অন্য কাস্টমারের দিকে এগিয়ে গেল, আমি চায়ের অর্ডার দেয়ার আগেই।
আমি একজন ক্যাডার। না, পাঠক, আমি নিজে কোন বিভ্রান্তির মধ্যে থাকা পছন্দ করি না। আশা করি আপনারাও তা পছন্দ করেন না, তাই আপনাদের খুলেই বলি । আমি কোনও বি.সি.এস ক্যাডার না । এলাকার অল্পবয়সী, কিন্তু আপনাদের দোয়ায় নাম ফাটানো এক মাস্তান । এখন পর্যন্ত
নিজ হাতে দুটি মার্ডার করার মত দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা আছে নিজের ঝুলিতে। কিছুক্ষণ আগে দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়া পরনিন্দুক বৃদ্ধ দুটির মত কিছু বৃদ্ধ ও সমবয়সী কিছু কাপুরুষ নামের আগে-পিছে ক্যাডার শব্দটা জুড়ে দিয়েছে। যদিও মাঝে মধ্যে, বিষয়টা চিন্তা করতে ভালই লাগে।
প্রত্যেকদিন সকাল দশটা বা সাড়ে দশটায় ঘুম থেকে ওঠার পর ফ্রেশ হয়ে এগারোটার মধ্যে এই হোটেলটিতে আসি। আমার ঘনিষ্ঠ দুই-তিনজন বন্ধু এসে যোগ দেয়। এখান থেকেই সারাদিনের ধান্ধা-ফিকিরের খোঁজ-খবর নিয়ে একসাথে বের হই টো-টো করতে। এসব কারণেই
অর্ডার দেয়ার আগেই চা সার্ভ করার ঘটনায় প্লিজ, আপনারা অবাক হবেন না । আমি প্রথম মার্ডারটা করি খেলার জন্য মাঠ দখল করাকে কেন্দ্র করে। দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন আমি। স্কুল ছুটির পর মাঠে গিয়ে দেখি বড় ভাইরা ক্রিকেট খেলছে। মাঠে একটি মাত্র ক্রিজ থাকায় আমরা বল, ব্যাট হাতে তাদের খেলা দেখতে লাগলাম। এরই মধ্যে এক বড় ভাই আশ্বাস দিল, এই খেলাটি শেষ হলেই তারা আমাদের খেলার জন্য মাঠ ছেড়ে দেবে। কিন্তু ওই বড় ভাইয়ের টিম খেলায় হেরে যাওয়ায় সে তার দেয়া কথা ভুলে নতুন করে খেলা শুরু করতে চাইল। তখনই তাদের সাথে শুরু হলো আমাদের কথা কাটাকাটি। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ওই বড় ভাইটা আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে যখন জোরে এক চড় বসিয়ে দিল, ওর কালো রঙের গালে, আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। হাতের ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে এলোপাতাড়ি বেশ কয়েকটি বাড়ি বসিয়ে দিলাম তার বাবরি চুল সম্বলিত মাথায় শেষ বাড়িটার আওয়াজ হলো শরবত খাওয়ার বেল ফাটানোর মত । আমি সাথে সাথে হাতের ব্যাট ফেলে দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মাঠ থেকে বেরিয়ে দৌড়ে বাড়ি চলে গেলাম ।
পরদিন বাড়ি থেকে সকালবেলা গ্রেপ্তার হলাম। শুনলাম, ওই বড় ভাই রাতে ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছে। রাতেই তার বাবা থানায় এসে খুনের মামলা করেছে। আসামী মাত্র একজন-তা আমি নিজেই। তিন বছর জেল খাটার পর বের হয়ে এলাম জামিনে।
জেল থেকে বের হওয়ার পর আমার আর লেখা পড়া করা হলো না। এলাকার গডফাদার বলে পরিচিত, আমাদের বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ওই সময় শুধু বড় মাপের একজন পরিচিত ক্যাডার ছিলেন হাশেম ভাই, উনি
আমাকে কাছে টেনে নেন। তাঁর ছত্র-ছায়ায় জুট নামানোকে কেন্দ্র করে আরেক এলাকার আমার বয়সী এক নামকরা মাস্তানকে প্রথমে কুপিয়ে ও পরে ভাইয়ের দেয়া অস্ত্র দিয়ে খবরের কাগজের ভাষায় “কুকুরের মত গুলি' করে মারি। যদিও ওই ঘটনায় প্রভাবশালী বড় ভাই আমার পক্ষে ছিল বলে কোনও মামলাই হলো না আমার বিরুদ্ধে। কিন্তু আশপাশের দু-চার এলাকার সবাই জানত কাইল্লা রফিকের প্রকৃত হত্যাকারী কে। এই ঘটনার পর থেকেই ক্যাডার তকমাটা আমার নামের সাথে একদম পাকাপাকিভাবে বসে যায়। হোটেলটায় বসে চা খেতে খেতে অ্যালবামের ছবির মত পুরানো ঘটনাগুলো কেন জানি মনে ভেলে উঠল
ইতোমধ্যে আরও তিনজন বন্ধু হোটেলে চলে এসেছে। ওদের চা খাওয়ানোর ফাকে আলোচনা করেই বুঝলাম আজকে একটু বাড়তি খাটুনি আছে। প্রথমে যেতে হবে হাশেম ভাইয়ের বাসায়। তার কাছে প্রচুর পরিমাণে কম্বল এসেছে এই তীব্র শীতে শীতার্তদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার জন্য। এই কম্বল সংগ্রহ করে ভাইয়ের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের লোকদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। তারপর সন্ধ্যার দিকে যেতে হবে সামনের মহল্লার কলেজ রোড এলাকার গলাকাটা পুকুরপাড়ের দিকে। শোনা যায়, একসময় নাকি পুকুরপাড়ের দিকে মানুষের গলাকাটা লাশ পাওয়া যেত, সেই থেকে পুকুরপাড় এলাকাটি গলাকাটা পুকুরপাড় নামে খ্যাত। এখন অবশ্য এই ধরনের ঘটনা আর ঘটে না বহু বছর ধরে, তবুও নামটা আগের মতই রয়ে গেছে। এই পুকুরপাড়ে এক প্রবাসী, সদ্য দেশে এসে ছয় শতাংশ জায়গা কিনেছে বাড়ি তৈরি করবে বলে, এই সময়ই আমরা গিয়ে নগদ মাত্র তিন লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছি এবং সে বাধ্য হয়ে দুই লাখ টাকা খুশি
মনে দিতে রাজি হয়েছে। সন্ধ্যা বেলা ওই টাকাটা এনে অর্ধেক টাকা দিতে হবে হাশেম ভাইকে, বাকিটা আমাদের। তারপর রাত নয়টার দিকে যেতে হবে অন্য ওয়ার্ডের এক বুড়ির বাসায়। দুনিয়ায় আপন বলতে বুড়ির কেউ নেই। তাকে একটি কম্বল দিতে হবে। কীসের মায়ায় যে বুড়ি এখনও বেঁচে আছে তা বুড়িও বলতে পারবে না।
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছে মার্ডার করার পর আমার ভিতরে কখনও অপরাধরোধ কাজ করেছে কিনা। আমি অবলীলায় না বলেছি। বরং দ্বিতীয় মার্ডারটা করার পর এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করেছি। জানি না অন্যদের কেমন লাগে ।
আজ চাঁদার টাকা তোলার পর ভাইকে তার টাকাটা দিয়ে আমাদের টাকা ভাগাভাগি করার পর নিজেরাই একটি ছোটখাট মদ খাওয়ার পার্টি দেয়ায় বুড়ির বাসায় আর যাওয়া হলো না। যদিও তার জন্য ভাল দেখে একটি কম্বল আর কিছু টাকা আলাদা করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছি।
দু'দিন পরের ঘটনা। আমি আমার খাটে বসে আছি। আমার সামনে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গুরুর চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আর অবাক হয়ে দেখছে। হ্যাঁ, পাঠক, আমি নিজের অজান্তে আমার জীবনের তৃতীয় মার্ডারটা করেছি এবং যার জন্য আমি কোনওরকম পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করতে পারছি না। বরং যা ইতিপূর্বে কখনও ঘটেনি বা আমি বা শুক্কুর কখনও আশা করিনি তাই-ই ঘটছে-আমার দু'চোখ বেয়ে দরদর করে পানি। পড়েই চলেছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও আটকাতে পারছি না। মিনিট পাঁচেক আগে শুকুর এসে খবর দিয়েছে, কাল রাতে বুড়ি নাকি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, বাধ্য হওয়ার একমাত্র কারণ প্রচণ্ড শীত পড়েছিল গতকাল। আমি কম্বলটা আর ভাংতি এক হাজার টাকা মুঠো করে বিছানায় বসে আছি। আর চোখ দিয়ে বিরামহীন পানি পড়েই চলেছে। আমিই হত্যাকারী। যদি দু'দিন আগেই বুড়িকে কম্বলটা সময় করে দিতাম, তবে আর যাই হোক, বুড়ি অন্তত শীতে মারা যেত না। যে যা-ই বলুক, বুড়ির হত্যাকারী আমিই।
জনাব আমার লেখা গুলো যদি আপনার কাছে ভালো লাগে তাহলে মন্তব্য এবং শেয়ার করুন যাতে আমি আগামী তে আরো নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারি।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন