সোহাগের প্রতারণা, গল্প
সোহাগের প্রতারণা
সোহাগ পিতা মাতার প্রথমে পুত্র বলেই তারা আদর করে তার নাম রেখেছে সোহাগ। সোহাগ কোন কাজ করতো না, সে ছিল আলসে কিন্তু দুষ্ট বুদ্ধিতে পটু। তার অন্য কোন ভাই বোন ছিল না। অল্প বয়সে তার মা বাবা মারা গেলে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। শেষে ঘরে কিছু না পেয়ে সে কাপড় চোপড় পুটলি করে নিয়ে রাস্তায় বের হলো। তার ইচ্ছা যে দিকে দু'চোখ যায় সে দিকে যাবে। রাস্তায় এক মিষ্টিওয়ালা তাকে ডেকে বললঃ কানে কম শোন নাকি? কিছু দূরে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো ঐ যে ও বাড়ীর লোক তোমায় ডেকে ডেকে হয়রান আর তুমি না শুনে চলে আসলে? এদিকে আর তোমাকে আসতে হবে না? মিষ্টিওয়ালা বললো তাহলে শুনেই আসি। সোহাগ বললো আরে বাবা ভার নিয়ে আবার কষ্ট করে যাবে তার চাইতে আমি পাহারা দেই তুমি চট করে শুনে এসো। মিষ্টিওয়ালা তাতেই রাজী হয়ে চলে গেল। এদিকে সোহাগ পেট ভরে মিষ্টি খেয়ে নিয়ে বাকীগুলো পোটলায় বেঁধে রওনা দিল। মিষ্টিওয়ালা এসে দেখে সর্বনাশ! সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। আসলে তো কেউ তাকে ডাকেইনি। সোহাগ অনেক দূর গিয়ে আবার বাকি মিষ্টি খেয়ে যাত্রা শুরু করলো। পকেটে একটি পয়সাও নেই। কিছুদূর গিয়ে এক দোকানে দেখে একটি ছোট ছেলে বসে আছে আর ওর বাবা ভিতর ঘরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সোহাগ দোকানে ঢুকেই মিষ্টি খাওয়া শুরু করে দিল। ছেলেটি বললো না বলেই মিষ্টি খাচ্ছো তোমার নাম কি গো? সোহাগ বললো বোলতা। ছেলেটি ওর বাবাকে ডেকে বললোঃ বাবা বোলতা মিষ্টি খাচ্ছে। ওর বাবা চোখ বন্ধ করেই বললো- বোলতা আর কত মিষ্টি খাবে থাক না।
সোহাগ চলে গেলে দোকানদার এসে দেখে অনেক মিষ্টি কমে গেছে। সে ছেলেকে বললো এত মিষ্টি বিক্রি হয়ে গেছে? ছেলে বললোঃ না বোলতা নামে একজন মানুষ খেয়ে গেল। তখন দোকানদার দেখলো সর্বনাশ কিন্তু কি করবে ততক্ষণে সোহাগ নাগালের বাইরে চলে গেছে। সোহাগ সন্ধ্যার আগে এক গ্রামে। পৌছিল। সে এক ঝোঁপের পাশে বিরাট এক মোরগ দেখলো। সে তাকে ঢিল মেরে ঘায়েল করে জবাই করলো। সোহাগ কিছুটা পালক উঠিয়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার শুরু করে দিল হৈ হৈ কে আছো দেখে যাও- একটা শিয়াল মোরগ ধরেছ। মোরগওয়ালা দৌড়ে এসে দেখে মোরগটার কিছু পালক ছেঁড়া এবং মোরগ মরে গেছে। তাকে ফিরে যেতে দেখে সোহাগ বললো আমি মরা মোরগ খাই। এই বলে কেটেকুটে পোটলায় বেঁধে এক বাড়ীতে উঠলো। সে ডেকে বাড়ীওয়ালাকে বললো এই মাংসগুলো পাক করলে সবাই খাওয়া যাবে। বাড়ীওয়ালা খুশি হয়ে পাক করে রাতের বেলা সোহাগকে খেতে দিল। সোহাগ দেখে শুধু হাড্ডি কখানা খেতে দিয়েছে। তাই সোহাগ খাওয়া দাওয়া সেরে জোরে জোরে বলতে লাগলো- খোদা তোমার কাছে হাজার শুকুর। এ রকম শকুনের মাংস যেন মাঝে মাঝে খেতে পাই। এ কথা বাড়ীওয়ালা শুনতে পেয়ে ছিঃ ছিঃ করে উঠলো। সে হাড়ী সমেত মাংস এনে দিয়ে বললো আগে, জানলে আমরা পাক করতাম না।
সোহাগ বললো- ও আপনারা বোধহয় শুকুনের মাংস খান না। এই বলে মাংস নিয়ে পরের দিন ভোরে রওনা দিল।
রাস্তায় গিয়ে দেখে এক বৃদ্ধ ঠাকুর বেশ মোটা সোটা একটা পাঠা ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছে। সোহাগ বললো ছিঃ ছিঃ ও ঠাকুর মশায় শেষে তোমার ঘাড়ে কুকুর ছানা। ঠাকুর বললো- আমাকে একজন দিল পাঠা আর তুমি বলো কুকুর ছানা। সোহাগ দেখলো কাজ হলো না। পরে সে পাট দিয়ে একগোছা দাড়ি মোছ তৈরী করে আবার ঠাকুরের সামনে গেল। বললো কে ঠাকুর নাকি তা বাবা তোমার ঘাড়ে কুকুর ছানা। দাড়ির জন্য ঠাকুর ভাবলো এ অন্য লোক। ঠাকুর দেখলো দুজন লোক পর পর একই কথা বললো। কেননা ঠাকুরও ভাল দেখতে পেত না। শেষে ঠাকুর ধেং বলে পাঁঠাকে ফেলে দিয়ে রাম রাম বলে স্নান করে চলে গেল। এদিকে সোহাগ ওটাকে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করলো দুই শত টাকায়। পথে যেতে যেতে এক নদী পড়লো। নদীর পাড়ে দেখে একটা ছোট ডিঙ্গি। এ দিকে এক বুড়ি এক মেয়েকে সংগে এনে বললো- বাবা আমাদেক একটু পার করে দেবে? সোহাগ বললো তোমার সাথে এটা কে হয়? বুড়ি জবাব দিল নাতনী । তা বাছা তোমার নাম কি? সোহাগ বললো নাতিন জামাই। সে বললো- ছোট ডিঙ্গি দু'জনের বেশি পার হওয়া যাবে না। তোমার নাতিনকে আগে রেখে এসে তোমায় নিয়ে যাব। বুড়ি রাজী হওয়াতে সোহাগ। ওপারে গিয়ে বুড়ির নাতনীকে নিয়ে চলে গেলো। এদিকে বুড়ি চিৎকার শুরু করলো ও বাবা তোমরা কে কোথায় আছো নাতিন জামাই নাতনীকে নিয়ে চলে গেল। লোকজন ছুটে এসে শুনে বুড়ীকে বললোঃ হতভাগী নাতিন জামাই নাতনীকে নিয়ে যাবেনা তো অন্য কেউ নিয়ে যাবে? পরে বুড়ি বললো- ওর নাম নাকি নাতিন জামাই। কিন্তু ততক্ষণে সোহাগ আর এক গ্রামে পৌঁছে গেছে।
এক বাড়ীতে অভাবের কথা বলে তিনশত টাকায় ওকে বিক্রি করে দিল। বাড়ীর মালিকও একজন মহিলা খুঁজছিলেন, তাই নিয়ে নিল। মেয়েটি শুধুই কাঁদে তাই সোহাগ বললো এখন তবে আসি বোন বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে। সোহাগ আবার যাত্রা শুরু করেছে। হঠাৎ দেখে রাজার একদল সৈন্য তার দিকেই আসছে। সে সামনে দেখে এক ধোপা কাপড় ধুচ্ছে। সোহাগ তাড়াতাড়ি করে বললো কিহে ধোপা রাজার কাপড়ে দাগ লাগিয়ে বসে আছ। ঐ দেখ সৈন্যরা তোমাকে বাঁধতে আসছে। এই শুনে ধোপা দিল ভোঁ দৌড়। এদিকে সোহাগ ভাল ভাল কাপড় গুলো পুটলীতে বেঁধে নিয়ে রওনা দিল। পথে দেখে এক কৃষক জমিতে হাল দিচ্ছে। সোহাগ ছালাম দিয়ে বললো চাচামিয়া কেমন আছেন? চাচীমা ভালো তো? কৃষক ভাল দেখতে পেত না। সে ভাবলো বোধ হয় আমার কোন গ্রাম্য ভাতিজা শহর থেকে আসলো। কিছুক্ষণ গল্প করার পর সোহাগ বললো ও চাচা আজকাল চোরের খুব উপদ্রব টাকা পয়সা ঠিক ভাবে রেখেছেন তো? বৃদ্ধ বললো থাকার ঘরে বাঁশের উপর পিতলের কলসে ভালভাবে রেখে দিয়েছি। চোর কেমন করে জানবে। সোহাগ বললো পানির খুব পিপাসা লেগেছে। বৃদ্ধ বললো আমার বাড়ীতে যাও। আমার বাড়ী গেলে তোমাদের চাচী পানি দেবে। সোহাগ সোজা বাড়ীতে উঠে বুড়িকে বললো ঐযে চাচা জমিতে হাল দিচ্ছে, ওখানে এক জোড়া গরু কিনছে তাই থাকার ঘরের দুই বাঁশের উপরে রাখা পিতলের কলস চাইল। এর ভিতরে টাকা পয়সা সব আছে। বুড়ী দিতে অস্বীকার করলে সে জোরে জোরে বললো চাচা দেয় না । কৃষক ভাবলো পানি দিচ্ছে না। তাই বললো আরে দিয়ে দাও। একথা শুনে বুড়ী কলসটি সোহাগকে দিল। আর কি সোহাগ দেরি করে? সে পগার পার। পরে কৃষক বাড়ী এসে শুনে হায় হায় করে। কাঁদতে লাগলো।
যেতে যেতে সোহাগের রাত হয়ে গেল। সে গাছে চড়ে বসলো। রাত কাটিয়ে পাগড়ী মাথায় তৈরী দাড়ি লাগিয়ে হাতে তসবিহ নিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে পড়লো। লোকজন আশে পাশে থেকে এসে দেখে দরবেশ হাজির হয়েছে। কেউ কেউ খাবার নিয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ পরে দরবেশ চোখ মেলালো। বললো
বাবা তোমাদের কি চাই? সবাই বললো দোয়া। তিনি বললেন যদি কেউ বিশ্বাস করে আমার পুঁটনির নীচে পাঁচ টাকা রেখে যাও তবে কালকে ভোর বেলা দশ টাকা পাবে। এই কথা শুনে কেউ পাঁচটাকা, কেউ দশ টাকা কেউবা পঁচিশ টাকা নাম সহ রাখতে শুরু করলো। সোহাগ রাতের বেলা পকেট থেকে দিয়ে টাকাগুলি দ্বিগুণ করে দিল। ভোর বেলা নাম ধরে ডেকে ডেকে দ্বিগুণ টাকা দিতে লাগলো। এ ভাবে ২/৪ দিন দেবার পর কেউ পাঁচ হাজার, কেউ দশ হাজার, কেউ আবার পঞ্চাশ হাজার পর্যন্ত রেখে গেল। অথচ পরের দিন আর দরবেশকে পাওয়া গেল না। লোকজন শুধু কেঁদেই সারা।
সোহাগ এবারে সোজা গিয়ে উঠলো রাজ বাড়ীতে। দরজার নিকটে রাজার সীল সহি করা একখানা চিঠি পড়ে গেল। ঘোড়াশালের দারোয়ানকে ভোর বেলা বললো এই দেখ রাজা আমাকে নতুন চাকুরী দিয়েছেন। এতে লিখে দিয়েছেন রাজামশায় ১নং ঘোড়াটা চাই এবং ওকে দানা খাওয়ানোর কথাও লিখেছেন। দারোয়ান লেখা পড়া জানতো না তবে রাজার সই সীল ভালো ভাবে চিনতো। তাতে বিশ্বাস করে সে ১নং ঘোড়াটি দিয়ে দিল। সোহাগ বাইরে এসে দিল চাবুকের ঘা আর বিদ্যুৎ বেগে ঘোড়া ছুটে চললো। ভোর বেলা কথা জানাজানি হয়ে গলে। দারোয়ানের ফঁসি হলো। আর সৈন্যরা দলে দলে চোর ধরার জন্য যাত্রা করল। সোহাগ পিছন দিকে চেয়ে দেখে দূরে একদল রাজার সৈন্য ছুটে তার দিকেই আসছে। সোহাগ পথিমধ্যে দেখে কয়েকজন ব্যবসায়ী আসছে। সোহাগ বললো ডাকাতে রাস্তায় সব নিয়েছে শুধু ঘোড়া আর আমি বেঁচে আছি। যদি বিশ্বাস করেন আমির ঘোড়াটা কিনে নিন তবে খেয়ে বাঁচি। ব্যবসায়ীরা দশহাজার টাকায় ঘোড়াটা কিনে নিল। আর সোহাগ গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়লো। রাজার সৈন্যরা ব্যবসায়ীদের নিকট রাজার ঘোড়া দেখে পাকড়াও করে নিয়ে চললো। রাজার দরবারে তাদের কোন কথাই তারা শুনলো না।
সোহাগ আজকাল বিরাট ধনী। চারদিকে চোরের উপদ্রবে মানুষ খেতে শুতে এমনকি ঘুমাতে পারতো। না। তাই রাজা ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে দিল যে চোরের হাত থেকে বাঁচাবার কোন যুক্তি যদি কেউ দেয় তবে তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বখশিশ দেওয়া হবে। সোহাগই শেষে রাজার ঢোল ধরলো। তাকে রাজার সামনে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলো। সোহাগ বললোঃ এখানে রাজা মশায় আর আমি ছাড়া কেউ থাকতে পারবেনা। রাজা তাতেই রাজি। সোহাগ বললো যাহোক রাজা মশায় প্রজাদের সব অর্থ আপনার নিকট জমা নিবেন। পরে সব এক ঘরে তুলে বন্ধ করবেন। বাইরে সারারাত বাতি জ্বলবে আর একটা কাঠের মূর্তি কুরসী হুকা টানবে। চোর দেখে মনে করবে যে মানুষ জেগে আছে। রাজার এই পরামর্শ পছন্দ হওয়াতে সোহাগকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দিলেন। ৪/৫ দিন একই ভাবে গেল। কিন্তু ৬/৭দিন পরেই হঠাৎ সোহাগ ডাকাতদের সঙ্গে যুক্তি করে সব অর্থই আত্মসাৎ করলো। যাবার সময় হুকাটা ভাঙ্গলো আর মূর্তি টার হাতে দিল একটা কাঁচাকলা ও একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা- রাজা মশায় যে চোরকে ধরতে চেয়েছিলেন সেই চোরেরই যুক্তি নিয়ে ঠকলেন। রাজা দেখে শুনে হার্টফেল করে মারা গেলেন। আর সব প্রজাই হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলো। এদিকে সোহাগ ডাকাদেরকে সমান ভাগ দিয়ে নিজের ভাগ নিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে অন্য দেশে চলে গেল। আর চোরের উপদ্রব রইলো না।
--------------------সমাপ্ত, ---------------------------
জনাব,আপনার কাছে আর্টিক্যাল গুলো সামান্য ভালো লাগলে মন্তব্য এবং শেয়ার করে আমাকে উৎসাহিত করবেন। যাতে আমি আগামীতে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী আরো সুন্দর কিছু আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন