ভয়ংকর
ভয়ংকর
সাংবাদিক শিকদার রাজুর দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে আনোয়ার। শিকদার রাজু সা বহুল প্রচারিত এক দৈনিক পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদক। তিনি আনোয়ারের সকালবেলার আনন্দদায়ক ঘুম নষ্ট করেছেন। ভুরু কুঁচকে বসে আছে আনোয়ার ভুরু ঠিক রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু কাজটা খুব কঠিন লাগছে।
এ মুহূর্তে শিকদার রাজুর হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। তিনি বারবার আনোয়ারের দিকে তাকাচ্ছেন এবং আস্তে আস্তে সিগারেটে টান দিচ্ছেন। তাঁর চোখে, মুখে এবং কথায় বিনয়ের ভাব স্পষ্ট। তিনি সিগারেট ধরানোর আগে আনোয়ারের অনুমতি নিয়েছেন। তাঁর পোশাক-আশাকও চোখে পড়ার মত। মাথায় কালো হ্যাট, গায়ে লাল টি-শার্ট। টি-শার্টে লেখা, 'আই এম ইন অনলাইন'। প্যান্টে পাঁচটার বেশি পকেট। একজন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই মানুষ সাধারণত এমন পোশাক পরেন না। তবে শিকদার রাজু এসব নিয়ে কখনও ভাবেন কি না, কে জানে!
সাংবাদিকদের বিষয়ে আনোয়ারের ভীতি কাজ করে। এরা অনেক সময় তিলকে তাল বানায়। এই লোকের মতলব এখনও বোঝা যাচ্ছে না। আশ্চর্যের বিষয়: তাকে বারবার সার
ডাকছে লোকটা।
আনোয়ার একটু পর বলল, 'আপনি আমাকে স্যর ডাকছেন কেন? আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড় এবং সম্মানিত মানুষ।'
রাজু শিকদার বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, 'আপনি আমার চেয়েও সম্মানিত। এ জন্যই সার ডাকছি।'
'আমি সম্মানিত!'
'অবশ্যই।' 'কীভাবে?'
শিকদার রাজু হাসলেন। ঠোঁটে বাঁকানো হাসি। স্পষ্ট গলায় বললেন, আপনার বিভিন্ন কাজ নিয়ে পত্রিকায় অনেকবার লেখালেখি হয়েছে। আপনার তোলা কিছু অতিপ্রাকৃত ছবি দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে।
আনোয়ার বিব্রত গলায় বলল, 'ছবিগুলো আমি পত্রিকায় দিতে চাইনি, আমার এক বন্ধু শওকত জামিল একটা সাপ্তাহিক পত্রিকার সহ-সম্পাদক, ও-ই কাজটা করেছে। আর লেখাগুলোও আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছাপা হয়েছে।
'আমি যতদুর জানি, আপনি দেশের রহস্যময় জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়ান। অনেক রহস্যময়, ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখিও হয়েছেন।
“হ্যাঁ, তা হয়েছি।'
'এইজন্যই বলছি, আপনি বিখ্যাত এবং সম্মানিত মানুষ। ফেসবুকে আপনাকে নিয়ে দুটো ফ্যান পেজও আছে।'
'বলেন কী!'
'হ্যাঁ, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আপনার মত রহস্যের পিছনে ছুটতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। স্যর, দয়া করে আপনার কোনও ঘটনা যদি বলতেন...'
“প্লিজ, আমাকে স্যর ডাকবেন না। নাম ধরে ডাকবেন। আর আমি চাই না। পত্রিকায় আমাকে নিয়ে লেখালিখি হোক।
সব উল্টোপাল্টা নিউজ এখন পত্রিকায়
বেশি প্রাধান্য পায়। এসব তো পত্রিকায়
লেখার বিষয় নয়।' “কিন্তু আনোয়ার ভাই, মানুষ তো এমন ঘটনা জানতে চায়।'
*ভাই, আমি এসব কাউকে জানাতে চাই না । এসব আমি নিজের আনন্দে করি। অনেক অদ্ভুত, ভয়ানক, বিচিত্র, ব্যাখ্যাহীন। জিনিস দেখেছি। আমি অজ্ঞ, তাই আমার কাছে ওগুলোর কোনও ব্যাখ্যা নেই। হয়তো আসলে তার অনেকগুলোরই কোনও না কোনও ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু ব্যাখ্যাহীনভাবে এগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত
হলে মানুষ ভুল মেসেজ পাবে।' 'ভাই, এসব কথা শুনব না। আপনার যে-কোনও একটা ঘটনা আমাকে শোনাতেই হবে।'
দ্বিধা করল আনোয়ার, কয়েক মুহূর্ত পর বলল, 'আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি বলব। তবে আপনাকে একটা কথা দিতে হবে।' 'কী কথা?'
'আমি যে ঘটনা আপনার সাথে শেয়ার করব, আপনি সে ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশ করবেন না।
শিকদার রাজু কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন, তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, 'আচ্ছা, ঠিক আছে।'
'আসলে ঘটনা মুখে বলে বেশিরভাগ সময়ই ঘটনার ভয়াবহতা ঠিক বোঝানো যায় না। অনেক মানুষ এগুলো বানোয়াট বলে মনে করে । আর সত্যি ঘটনা খুব বেশি নাটকীয়ও হয় না। খুব সাধারণ ধরনের হয় । যা হোক, আপনাকে এক বছর আগের একটা ঘটনা বলব। ঘটনাটি ঘটেছিল। কুয়াকাটায়।'
নড়েচড়ে বসল রাজু।
'একদিন খবর পেলাম কুয়াকাটায় আশ্চর্য এক জন্তুর আগমন ঘটেছে। জন্তুটাকে রাত-বিরাতে সৈকতের ঝাউবনের
মধ্যে দেখা যায়। প্রথমে শুনেছিলাম জন্তুটার নাকি তিনটা মাথা; কিন্তু পরে আবার খবর পেলাম মাথা তিনটা না, একটাই। তার মুখটা নাকি অনেকটা মানুষের মত। আমার এক দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই বরিশাল মেডিকেলে পড়ে। নাম আনিস, ওর এসব বিষয়ে খুব আগ্রহ। ও-ই আমাকে ঘটনাটা জানাল। যখনই ওর সাথে আমার ফোনে কথা হয়, ও আমাকে কুয়াকাটার ওই রহস্যময় জন্তুর কথা বলে । “আমি মনে মনে বেশ আগ্রহী হয়ে
উঠলাম। একদিন হুট করে বরিশালে গিয়ে হাজির হলাম। আনিস তো আমাকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। সামনে ওর পরী।। কিনা, ওদিকে চিন-া নেই। ওর চিন্তা আমার সাথে কুয়াকাটা যাওয়া। বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার সরাসরি বাস আছে। যদিও শেষ ২০-২৫ কি.মি. রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ। আমার মতে কেউ যদি । জীবনের প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তার কুয়াকাটার ওই রাস্তায় যাওয়া উচিত । তা হলে মৃত্যুভয় এমনভাবে জেঁকে ধরবে যে, জীবনের মায়া ফিরে আসতে বাধ্য।
“কুয়াকাটায় ওটাই আমার প্রথম যাওয়া। কুয়াকাটার একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে যা কক্সবাজারে নেই। তবে মানুষ কুয়াকাটার অবস্থা শোচনীয় করে ফেলেছে গাছপালা উজাড় করে ফেলছে। সৈকত ভয়াবহ ধরনের অপরিষ্কার। পর্যটকেরও খুব বেশি আনাগোনা নেই। সৈকতে কোথাও কোথাও ভাঙনও ধরেছে। এসব বিষয়ে কারও খুব মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না। আনিস আর আমি মোটামুটি মানের একটা হোটেলে উঠলাম । আমাদের উদ্দেশ্য আরাম আয়েশ নয়। আমরা যে কোনও মূল্যে ওই অদ্ভুত জন্তুর সাক্ষাৎ চাই । স্থানীয় অনেক মানুষের সাথে এ বিষয়ে কথা হলো। কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে খুব বেশি আগ্রহী নয় । বেশিরভাগ মানুষের মতে এটা একটা গুজব। আমি আনিসের উপর খুব চটে গেলাম। বললাম, "কোথায় তোর অদ্ভুত জন্তু, দেখা।”
"আনিস মাথা চুলকে বলল, “আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, ও নাকি দেখেছে। ভাইয়া, চলো আরেকটু খোঁজ নিই, এত সহজে নিরাশ হয়ো না।"
"যদি কিছু দেখাতে না পারিস, তবে তোর চেহারা আমি অদ্ভূত জন্তুর মত করে দেব। তখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তোকে দেখতে আসবে।"
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কোথাও আনিসকে দেখতে পেলাম না। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখলাম আনিস হন্তদন্ত হয়ে হোটেলের দিকেই আসছে। সাথে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। মানুষটার পরনে লুঙ্গি, আর শরীরের বাকি অংশ উদোম। আনিস বলল, “ভাইয়া, সেই ভয়ংকর জন্তুটার সন্ধান পেয়েছি, আজ রাতে দেখা যাবে আশা করি ।" * “তাই নাকি?”
"হ্যাঁ, ইনি কমল জোলা। এ এলাকায় সবাই ওঁকে চেনে। উনিই আমাদেরকে আজ রাতে ওই জঙ দেখাবেন।”
'আমি কমল জোলার দিকে তাকিয়ে বললাম, “সত্যিই এমন কোনও জন্তু আছে?”
"কমল মাথা নাড়ল।
"আপনি নিজে দেখেছেন?
'কমল আবার মাথা নাড়ল।
“কেমন দেখতে?” “কুচকুচা কালা, মানুষের লাহান মুখ, দেখলে ডর লাগে।”
* “কত বড়?”
“বিরাট, মেলা বড়,” লোকটা হাত দিয়ে সাইজ দেখাল । ভাব দেখে মনে হলো হাতির চেয়েও বড়।
* “আমরা কোথায় ওটা দেখতে
পাব?"
* “ঝাউবনে। রাইতে বের হয়, তয় সবদিন দেহা যায় না।”
* "আজ রাতে যাওয়া যাবে?
“হ, আমি আপনাগো লইয়া যামু।” “আচ্ছা, রাতে চলে আসবেন । আপনার কষ্টের জন্য আপনাকে টাকা দেয়া হবে।"
“লোকটা হাসল। তার হাসি সুন্দর।
'সারাদিন আমরা অনেক জায়গা ঘুরে
দেখলাম। বেশ মজায় কাটল দিনটা।
"রাত আটটার দিকে কমল এসে হাজির হলো। সে কালো রঙের একটা জামা আর নতুন লুঙ্গি পরে এসেছে। দেখে মনে হচ্ছে কমল তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাকটা পরেছে।
কমল আমাদের সাথে হোটেলে রাতের খাবার খেল। একটু বিশ্রামের পর আমরা বেরিয়ে পড়লাম । আমি আর আনিস কাঁধে দুটো ব্যাগ ঝুলালাম। জানি, হয়তো কিছুই দেখা যাবে না। গালগল্প আর বাস্তবতা এক নয়। তবুও এতদূর যখন এসেছি, দেখার চেষ্টা করাই উচিত। তা ছাড়া, রাতের বেলা ঝাউবনে যাওয়াটা এমনিতেও বেশ মজার হবে।
আনিস, কমল, এবং আমি সৈকতে হাঁটছি। সৈকতে তেমন কোনও ভিড় নেই। আকাশে সুন্দর চাঁদ উঠেছে। সমুদ্রও খেপেছে বেশ। পরিবেশটাই বেশ ভুতুড়ে করে ফেলেছে ঝড়ো বাতাস। কমল আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রায় এক কিলো পথ হাঁটলাম। এই জায়গাটা অন্য জায়গা থেকে অনেক বেশি। নির্জন। কমলের ইঙ্গিতে আমরা ঝাউবনে ঢুকলাম। লুকিয়ে থাকলাম একটা গাছের আড়ালে। কমল বলল, এখানেই জন্তুটাকে অনেক দেখেছে। আশপাশে বেশ কিছু বড় গর্ত চোখে পড়ল। আমরা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বসে রইলাম।
রাত গভীর হচ্ছে। আশপাশের পাতা নড়ছে, বিচিত্র শব্দ । কিন্তু কোনও কিছু চোখ পড়ছে না। মশার কামড় ইতিমধ্যে আমাদের অস্থির করে তুলেছে। আনিস মুখটা হাসি হাসি রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে তার মনেও শঙ্কা। তবে কমল খুব উত্তেজিত ও সতর্ক হয়ে আছে। আরও কিছু সময় পার হওয়ার পর হঠাৎ কমল লাফিয়ে উঠল। আমাদের আরও নীরব হতে ইঙ্গিত করল। দৃষ্টি তার সামনে নিবন্ধ। কিছু একটার পায়ের আওয়াজ পেলাম। সামনের দিকে দেখার চেষ্টা করলাম। কিছু একটা আসছে। কী সেটা? সত্যিই কোনও ভয়ংকর জন্তু?
'কমল সামনে কিছু একটার দিকে আঙুল তাক করল। আমরা একটা প্রাণী দেখতে পেলাম। বুকে ভর দিয়ে এগিয়ে আসছে, বিরাট। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবে ওর আগমনে জায়গাটা আরও নীরব হয়ে গেছে। তখন আরও দুটো প্রাণী গর্ত থেকে বেরুল। এই দুটো আকারে আগেরটার চেয়ে ছোট। তিনটে প্রাণী চারদিকে এলোমেলোভাবে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল।
'কুয়াকাটায় এমন জন্তু। আসলেই বেশ বিচিত্র ব্যাপার। এখন প্রাণীগুলোর মুখটা দেখা দরকার। আমি সাহস করে সামনে। এগুতে চাইতেই কমল বাধা দিল। আমার হাতে পাওয়ারফুল টর্চ। আলো ফেললাম জন্তুগুলোর মুখে।
'এগুলো হঠাৎ আলো দেখে চমকে উঠেছে। ভয় পেয়ে উল্টোদিকে ছুটতে শুরু করল। আমরা ওগুলোর মুখের দিকে চাইলাম। সাধারণ সরীসৃপের মুখ, মানুষের মুখ নয়।
'প্রচণ্ড আশাভঙ্গ হলো আমার। তবে আনিস আর কমলের মুখে বিজয়ীর হাসি
দেখলাম। 'আমি বললাম, “জন্তুটা তো গুইসাপ
প্রজাতির, আকারে বেশ বড়, সন্দেহ নেই। তবে মুখ তো মানুষের মত নয়।” 'আনিস বলল, “ভাইয়া, মানুষের মত
মুখ না, তাতে কী, বেশ ইন্টারেস্টিং না?” "আনিস, আমি কিন্তু এমন ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখে সময় নষ্ট করি না। এখানে আসা ফালতু সময় নষ্ট মনে হচ্ছে এখন।”
“কমল আমাদের কথা শুনছিল। হঠাৎ বলল, “আপনারা কী দ্যাখতে চান?” 'আনিস ফট করে বলল, "ভূত, আমার এই ভাইয়া ভূত দেখতে চায়।”
"কমল হাসল। তার হাসি দেখে মনে হলো ভূত দেখা কোনও বিষয়ই না। “ভূত কি না জানি না, তবে আপনাগো একটা জিনিস দেখাতেই পারি, যদি আপনাগো সাহসে কুলায়।”
'আমি মনে মনে একটুও উৎসাহ বোধ করলাম না। ওটাও কোনও বোগাস জিনিস হবে।
'আনিস বলল, “আমাদের সাহস আছে।” * “তা হলে কাল রাতে আপনাগো নিয়া যাব।”
আমি বললাম, “কী দেখাতে নিয়ে যাবেন? আসলেই কি কিছু দেখা যাবে? আমি আর খামোকা এখানে সময় নষ্ট করতে রাজি নই। ঢাকায় অনেক কাজ ফেলে এসেছি।”
“কমল কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল।। বলল, “আপনাগো সাহস থাকলে কাল আমার সাথে যাবেন। আপনাগো কিছু
দেখাব। তবে কোনও বিপদ হইলে আমার দোষ নাই,
"কোথায় যেতে হবে আমাদের?" “এহান থেকে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরে এক গ্রামে যাইতে হবে। ওইহানে একখান পুরানো স্কুল আছে। বহুদিনের পুরানো। মানুষ ওইহানে যাইতে ভয় পায় । কাল পূর্ণিমা, কালকে অনেক কিছু দেহা যাইব
"কী দেখা যাবে?” * “রাতের বেলা তাদের নাম আমি নিম্ন না। তবে এরা রক্ত চায়...” কমল থেমে
গেল হঠাৎ।
"কী, থেমে গেলেন কেন?” আপনারা যাবেন কি না বলেন?”
• “যাব “আমি যদি আপনাদের সত্যি কিছু
দেখাইতে পারি, আমারে কিন্তু বেশি টাকা
দেওন লাগব।”
লাগব
"হ্যা, দেব। অবশ্যই।" "কম কইরা বিশ হাজার টাকা দেওন
“এত কেন?”
"আমি নিম্ন দশ হাজার, আর অন্য দশ হাজার লাগব অন্য কাজে। পরে বলব। আর যদি ওই টাকা না লাগে, আবার ফেরত দিয়া দিমু
'লোকটা রহস্য করছে মনে হলো আমার। আনিসকে একটু সরিয়ে নিয়ে আলাপ করলাম। ও বলল, লোকটা স্থানীয়, সবাই ওকে বিশ্বাস করে। টাকা মেরে দেবে না।
“ঠিক আছে, দেব টাকা,” আনিসকে বললাম ।
*আবার চলে এলাম কমলের সামনে। “টাকা হোটেল থেকে দিয়ে দেব। এবার চলুন ফেরা যাক।” * “আপনারা মহুয়া খাইবেন?” হঠাৎ জানতে চাইল লোকটা।
"মহুয়া কী?” “খুব মজার জিনিস । কাল আপনাগো খাওয়ামু।”
“মদ জাতীয় কিছু?” "একে মদ বলবেন না, সুধা বলেন। কুয়াকাটার বিখ্যাত জিনিস মহুয়া । কাল ওই জিনিস খাওয়ানোর পর আপনাগো ওই স্কুলে লইয়া যামু । মহুয়া খাইলে বুকে সাহস পাইবেন। বড় সুস্বাদু জিনিস।"
* "মহুয়া আমরা খাব। তবে সাহস বাড়ানোর জন্য নয়। আমাদের এমনিতেই সাহস আছে, কমল।”
'কমল হেসে বলল, "কাল দেহা যাইব, তবে আমি আবারও বলতাছি, আপনাগো বিপদ হইতে পারে। ভাইবা দেহেন, যাইবেন কি না। ” "আমরা যাব, কমল।”
"আমার সাহসের কোনও অভাব নেই এ কথা আমি জোর গলায় বলতে পারি । অনেক বিপদেও আমি মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারি। শিগব নামক অপদেবতা একবার আমার ধৈর্য ও সাহসের চরম পরীক্ষা নিয়েছিল। তাই কমলের কথায় আমি এতটুকু বিচলিত হলাম না।
“আমরা হোটেলে ফিরে এলাম । কমল অগ্রিম দশ হাজার টাকা নিয়ে চলে গেল । ভাবলাম, হয়তো কুয়াকাটা আসাটা পুরোপু- রি ব্যর্থই হলো। আমি কমলের কথায় খুব বেশি ভরসা পাইনি। লোকটা হয়তো টাকার লোভে কাল আবারও ফালতু কিছু দেখাবে । ‘সকালে আমরা ঘুম থেকে আগে ভাগেই উঠে পড়লাম। উদ্দেশ্য সানরাইজ দেখা। আর ওই স্কুলটা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেয়াও দরকার। যদি দেখি ওটা একটা ফালতু জায়গা তবে আজই চলে যাব। এখানে আর বেশি দিন থাকতে ইচ্ছা করছে না।
*আমরা সানরাইজ ভাল করে দেখার জন্য জিপ জোগাড় করলাম। জিপ আমাদের ক্রমশ পুবদিকে নিয়ে গেল। জিপের ড্রাইভারের সাথে স্কুলের ব্যাপারে অনেক কথা হলো। লোকটা হাসিখুশি, নাম লোকমান। আমরা রাতে ওই স্কুলটায় যাব শুনে লোকমান কেমন যেন চমকে উঠল। বলল, "সার, ওই স্কুলের নাম আরাকান প্রাইমারি স্কুল। অনেক পুরনো স্কুল। এখন কেউ ওখানে যায় না। ভয়ানক জায়গা। ওখানে যাবেন না, সার। প্রতি বছরই আশপাশের গ্রাম থেকে অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়। তাদের অনেকেরই বিকৃত লাশ ওই স্কুলে পাওয়া গেছে। গত দুই বছরে প্রায় বিশ-পঁচিশটা লাশ হয়ে ফিরেছে। বেশির ভাগই ছোট বাচ্চাদের লাশ। এসব কারণে বর্তমানে ওই স্কুলের আশপাশে কোনও জনবসতি নেই। ওখানে ভয়ংকর কিছু থাকে, স্যর! ভয়ংকর কিছু।" • “ভয়ংকর কিছু মানে কী? ভূত?”
“সেটা জানি না। কেউ বলে ভূত, কেউ বলে জিন, কেউ বলে অতৃপ্ত আত্মা। আশপাশের গ্রামের মানুষ শান্তিতে থাকার উদ্দেশে ওখানে হাঁস-মুরগি-পাঁঠা বলি দেয়। এরপর থেকে মানুষ নিখোঁজ হওয়া কমেছে। লাশও তেমন পাওয়া যায় না। তবুও ওখানে দিনের বেলায়ও যেতে চায় না কেউ। আর আপনারা রাতে যেতে চান!"
কীভাবে বলি দেয়া হয়?”
"হাঁস, মুরগি, পাঁঠা ওখানে জবাই হয়। এরপর স্কুল আর এর আশপাশে ওই রক্ত ছড়িয়ে দিতে হয়। অনেক সময় হাড়বিহীন মাংসও টুকরো টুকরো করে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। এভাবেই নাকি ওনারা খুশি হন।"
• "আজব সব পদ্ধতি।"
• "হ্যাঁ। বিভিন্ন গ্রামের ওঝা, গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে এসব পদ্ধতি বের করেছেন। প্রায় সব পরিবারই এখন বলি দিচ্ছে। তবুও সবার মধ্যেই চাপা ভয় কাজ করে।"
'মানুষের নিরাপদ থাকার কী অসীম চেষ্টা। আমি এমন অনেক দেখেছি। তবে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত কিছু বিশ্বাস করি না।
*সূর্যোদয় দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল। সত্যিই অসাধারণ দৃশ্য। আমরা সূর্য ওঠা দেখে জীপ নিয়ে শুটকি পল্লীর দিকে চলে গেলাম। শুঁটকি পল্লী থেকে আনিস এক গাদা শুঁটকি কিনল। আমি শুধু মন দিয়ে শুঁটকি বানানো দেখলাম ।
এই মানুষগুলো আসলে অমানুষিক পরিশ্রম করে। দেখে খুব খারাপ লাগল । সাড়ে এগারোটায় নামলাম উন্মত্ত সমুদ্রে। আনিস কয়েকবার বীরত্ব দেখাতে গিয়ে পেট ভরে সমুদ্রের পানি খেল।
রাতের খাবার আমরা সাড়ে সাতটার মধ্যে শেষ করলাম। অর্ডারমাফিক খাবার রূমেই দিয়ে গেল। কমল এল আটটার দিকে। সরাসরি আমাদের রূমেই এল। হাতে কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট। বুঝতে পারলাম, কমল মহুয়া নিয়ে এসেছে।
'কমল গলা নামিয়ে বলল, “স্যর, এক নম্বর জিনিস। এইহানে সবাই এক নম্বর জিনিস দিতে পারে না। আমি বহুত কষ্টে জোগাড় করছি। এক্কেবারে খাঁটি মহুয়া পানি মেশানো নাই।”
'আমরা কমলের আনা খাঁটি মহুয়া খেলাম। সঠিক স্বাদ পাওয়ার জন্য ডাইরেক্ট খেয়ে ফেললাম। তবে পরিমাণে খুব বেশি নয়। আমার তেমন কিছু হলো না। শুধু শরীরটা একটু হালকা লাগতে লাগল। আর মনের ভিতর একটা ফুরফুরে ভাব চলে এল। আনিসের প্রতিক্রিয়া ভাল করে বুঝতে পারলাম না। মহুয়া খাওয়ার পর ও কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল। আমি আর কমল বেরুনোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় আনিস বলল, “আমি যাব না, আমার শরীর ভাল লাগছে না।”
"আমি অবাক হলাম। আসলেই কি ওর শরীর খারাপ লাগছে, নাকি ভয় পাচ্ছে? যা হোক, আমাকে তো যেতেই হবে। তাই আনিসের সাথে কথা না বাড়িয়ে কমলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস। মহুয়া খাওয়ার কারণে কি না জানি না, আমার মধ্যে ভয়ের অনুভূতিই নেই ।
“একটা ইজিবাইক আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। এটা আমাদের প্রায় গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। তবু আমাদের বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হবে। ইজিবাইক স্টার্ট দিতেই দেখলাম কেউ একজন রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম আনিস দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, "আনিস, তুই
“একা একা ভাল লাগছিল না, তাই চলে এলাম।" বলেই ইজিবাইকে উঠে বসল। গায়ের চাদরটা শরীরের সাথে ভালভাবে জড়িয়ে নিল। ওকে দেখে আমি মনে অন্যরকম সাহস পেলাম। অন্যদিকে কমলের উপর মেজাজটা খুব খারাপ হয়ে আছে। যাচ্ছি একটা অ্যাডভেঞ্চারে, কিন্তু কমলকে দেখে মনে হচ্ছে যেন বাজারে যাচ্ছে। ওর হাতে একটা বড়সড় সাইজের
মুরগি। "আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “মুরগি এনেছেন কেন?”
""আমার নিজের মুরগি। ওই স্কুল ঘুইরা আইসা আমি নিজ হাতে পাক কই আপনাগো খাওয়ামু।”
“তা মুরগিটা হোটেলে বা পরিচিত কোনও দোকানে রেখে আসতে পারতেন, সাথে নিয়ে এলেন কেন?” 'কমল অপ্রস্তুতভাবে হাসল। পুরোটা
• রাস্তা আমরা সবাই চুপ করে থাকলাম ।
কিছুক্ষণ পর ইজিবাইক থামল।
'এখন আমাদের পায়ে হেঁটে বাকি পথ যেতে হবে। আশপাশে কোনও জনবসতি চোখে পড়ল না। কিছু দেখতে পাব কি না জানি না, তবে পরিবেশটা গা ছমছমে। আনিস পুরো পথে কোনও কথা বলেনি। এবার হঠাৎ করে বলল, “সামনে ডানের রাস্তায় নামতে হবে।”
'কমল ও আমি দু'জনেই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম । আনিস সামনে হাঁটতে শুরু করল। ও কি মহুয়া খেয়ে মাতাল হয়ে গেল? এই অন্ধকারে কোনও ভয়ভীতি ছাড়া এগিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, জায়গাটা ও চেনে। কমলের মুরগি কক কক করে ডেকে চলেছে। দূর থেকে ভেসে এল ছাগলের করুণ ম্যা-ম্যা 'রাস্তাটা খুব নির্জন, রাতের
আওয়াজ।
ঝোপঝাড়ের সাধারণ শব্দগুলোও নেই। 'আমরা স্কুলের মাঠে চলে এলাম। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। তবু জায়গাটা কেমন অতিরিক্ত অন্ধকার এবং ঘোলাটে। মুরগিটা ডাকা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার সাহসও হঠাৎ করে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মনে হচ্ছে, কেউ একজন আমার কানের কাছে বলছে: চলে যাও, চলে যাও.... 'কমল বলল, "সার, আরও সামনে যাইবেন? নাকি ফেরত যাইবেন।”
'আমার হাতে বড় টর্চ। আমি সেটা হাত বদল করে বললাম, "সামনে যাব এখনও তো কিছুই দেখতে পেলাম না।”
'কমল নিতান্ত অনিচ্ছায় মাথা নাড়ল। 'আমি আরেকটু এগোতেই বড় কোনও প্রাণীর ডানা ঝাপটানোর শব্দ পেলাম। দুটো বড় কুৎসিত পাখি সোজা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মনে হলো বিশাল ডানা যেন পুরো আকাশ ঢেকে দিয়েছে। লম্বা ঠোঁট দিয়ে আমার চোখ গলিয়ে দিতে চাইল। আমিও সরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আমার গাল থেকে মাংস তুলে নিল। "কমল বলল, "সার, শকুন, শকুন।
| শুইয়া পড়েন। গুইয়া পড়েন।” "আমি দেরি না করে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। বিকট ওঁয়া-ওয়া শব্দ করছে শকুনগুলো, মাথার উপর ঘুরছে। আবার নেমে এল। নব ও ঠোঁট দিয়ে আমার পিঠের মাংস তুলে নিতে চাইল। ভয়ানক বাধার, ভয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম ।
'কমল আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এল। এমনসময় শকুনগুলো চলে গেল। আমাকে ধরে তুলল কমল। উঠে বসলাম, “ঠিক আছি।
'আসলে আমি ঠিক নেই। আমার মাথা কাজ করছে না। শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। আশপাশে চেয়ে দেখলাম, টর্চটা কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়েছে। অনেক চেষ্টার পরও সেটা জ্বলল না। আমি আনিসকে খুঁজতে লাগলাম।"
"বেশ খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আছে আনিস। আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম, সাড়া দিল না। বুঝতে পারছি এখানে অশুভ কিছু আছে এবং যে কোনসময় ভয়ংকর কিছু ঘটবে। দ্রুত এখান থেকে চলে যেতে চাইছি। কিন্তু আনিস কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মত দাড়িয়ে আছে। ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। কমলকে দেখলাম একটা ঝোপের ভিতর গিয়ে
"আনিসের হাত ধরলাম। বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল আমার। আনিসের হাতটা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। মৃত মানুষের হাতও হয়তো এত ঠাণ্ডা নয়। আর হাতটা লোমে ঢাকা। আনিসের হাতে এত লোম।
ছিল না।
"ও আমার দিকে তাকাল। আবছা আলোতেই বুঝলাম ওর দৃষ্টি অন্যরকম। আমি নিজের ভয়টা গোপন করে বললাম, "আনিস, চলো, আমরা এখন চলে যাব।"
“আনিস কিছু বলল না। পিছনে শব্দ শুনে তাকাতেই দেখলাম কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলাম নিশ্চয়ই কমল। কিন্তু ভাল করে লক্ষ করলাম। আমার পিছনে আরেকজন আনিস দাঁড়িয়ে আছে। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি নিশ্চয়ই ভুল দেখছি। আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। সামনে দাঁড়ানো আনিসের হাত ছেড়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু ও আমার হাত ছাড়ল না। এবার পিছনে দাড়ানো আনিস আমার অন্য হাত চেপে ধরল। দুই আনিসের মুখ থেকে অদ্ভুত শব্দ বেরুচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনও পশুর চাপা হুংকার ।
“তখন আরও ভয়ংকর কাণ্ড ঘটল, আমার ডান ও বাম পাশ থেকে আরও দু'জন আনিস এসে হাজির হলো। ওরা চারজন কিছু না বলে চক্রাকারে আমাকে ঘিরে ফেলল। এমন সময় শকুনদুটোও শব্দ করতে করতে আকাশ থেকে নেমে এল, দূর থেকে দেখতে লাগল আমাকে।
'আমি জানি কী ঘটতে চলেছে। চোখ বন্ধ করলাম। একটু পর চোখ মেলে মনে হলো অনেক নীচে নেমে এসেছে চাঁদটা। এক মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবী যেন থমকে গেল । এরপর চোখের পলকে ওরা চারজন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদের গলার ভয়ানক আওয়াজ শুনে মনে হলো, এবার মরতেই হবে আমাকে। দু'জন আমার দু'হাত কামড়ে ধরল, অন্য দু'জন দুই পায়ের গোড়ালি ।
'বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম। এই অসম্ভব যন্ত্রণার মধ্যে আমি কতক্ষণ ছিলাম, জানি না। ওই মুহূর্তে আমার অতি প্রিয় একটি মুখ চোখের সামনে
ভেসে উঠল। নিজের ভুলে যাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। বুঝতে পারছি, আর কয়েক মুহূর্ত, তারপর সব শেষ। এমনসময় কেউ একজন এল। হ্যাঁ, কমল এসেছে। আমি ছটফট করতে করতে দেখলাম, কমল চারটে ছাগল নিয়ে আসছে দড়িতে বেঁধে। এরপর দেরি না করে ছুরি দিয়ে জবাই করতে লাগল ছাগলগুলোকে। চিৎকার করতে করতে ওগুলোর মাথা আলাদা করে দিচ্ছে। চারদিকে ছিটিয়ে পড়ছে রক্ত কমল গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু
করল, “রক্ত আনছি, রক্ত আনছি, ছাইড়া
দেন, মাফ কইরা দেন!” এরপর সব দ্রুত ঘটল। ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। শীতল বাতাস আমার গায়ে এসে লাগল। উঠে দাঁড়াতে পারছি না, কমল এসে ধরল আমাকে, বলল, "সার, উঠেন। তাড়াতাড়ি যাইতে হইব। ওরা আপনারে মাইরা ফেলব।”-
'আমি ওর কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ফিসফিস করে বললাম, "আনিস কই? এদের মধ্যে কে আনিস?" “উনার কথা ভুইলা যান, উনারে
ভূতে ধরছে। চলেন তাড়াতাড়ি।” 'আমার মাথা ভোঁতা হয়ে গেল । পিছন ফিরে দেখলাম, পুরো মাঠে অসংখ্য ছায়া। তারা মাঝে মাঝে ভয়ংকর শব্দ করছে পুরো এলাকাটা থরথর করে কাঁপছে। "সার, পিছনে
"কমল বলল, তাকাইয়েন না। হাঁটতে থাহেন।” "আমি আর কমল হাঁটতে শুরু করলাম। পুরো আকাশ হঠাৎ করেই বেশ আলোকিত হয়ে গেল ।
'আমরা হাঁটছি। ইজিবাইক আমাদের যেখানে নামিয়ে দিয়েছিল, সেখানে এসে থামলাম। কোনও ইজিবাইক ভ্যান চোখে পড়ল না। এত রাতে কারও থাকারও কথা নয়। আমরা আবার হাটতে লাগলাম। ক্লান্তিতে বুজে আসতে চাইছে চোখ। শরীর অসাড় হয়ে পড়েছে, তবু পা টেনে চলেছি। দূর থেকে একটা আলোর রেখা দেখলাম। একটা ইজিবাইক আসছে।
'আমরা ওটাকে থামালাম। এত রাতে ড্রাইভারের যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না, আর আমার শরীরে রক্ত দেখে লোকটা আরও
চমকে গেছে।
'কিন্তু কমল লোকটাকে রাজি করিয়ে ফেলল। জখম যতটা খারাপ ভেবেছি, ততটা হয়নি। হোটেলের কাছাকাছি এসে একটা ডিসপেনসারি খোলা পেলাম শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ড্রেসিং করিয়ে হোটেলে ফিরলাম। সঙ্গে কমলও। আনোয়ার থামল।
শিকদার রাজু বলল, 'ভাই, কাহিনি কি
এখানেই শেষ? আনিসের কী হলো? আমি হোটেলে এসে আনিসকে ঘুমন্ত দেখলাম। ঘুম ভাঙতেই আমাকে দেখে চমকে উঠল আনিস। জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে আমার। কমল সব খুলে বলল । আনিস অবাক হয়ে বলল, “কী
বলছেন এসব? আমি তো রূম থেকে বেরই
হইনি।”
'ক্লান্ত গলায় বললাম, “আনিস ওরা এসেছিল তোমার রূপ ধরে।” 'আনিস বলল, "ওরা কারা?”
"ওরা ভয়ংকর...” বলেই আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ হয়ে গেল
আপনাআপনি।
কুয়াকাটা থাকার ইচ্ছা উবে গেল। পরদিন সকালে আমরা রওনা দিলাম । আমার প্রচণ্ড জ্বর এসেছে, শরীরেও বড় ব্যথা। কমল রাতে হোটেলেই ছিল।
সকালে কমলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “আপনি না থাকলে আমি বেঁচে ফিরতাম না।”
“স্যর, আমি জানতাম ওইহানে বিপদ হইতে পারে । তাই আগেই কয়েকটা ছাগল নিয়ে রাখছিলাম। রক্ত পাইলেই
ঊনারা খুশি হন। "আমি কমলের হাতে সব মিলে আরও পনেরো হাজার টাকা গুঁজে দিলাম। আগেই দিয়েছিলাম দশ হাজার।
"কিন্তু কমল এত টাকা নিল না। বলল, “আমারে তো বিশ হাজার দেওনের কথা। আমি বেশি নিমু না, সার। আপনাগো আমার খুউব ভালা লাগছে। আবার কুয়াকাটা আইলে দেহা কইরেন কমলের কথাবার্তায় বুক নড়ে উঠল
আমার। এর মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আমাদের মধ্যে নেই।' শিকদার রাজু বললেন, কমলের সাথে
আর যোগাযোগ হয়নি?'
আনোয়ার মাথা নিচু করে বলল, 'না তবে কয়েক মাস আগে এক পত্রিকায় ছোট করে একটা খবর ছেপে ছিল। সেই খবরে কমলের নাম ছিল
'কী ছাপা হয়?'
*আরাকান প্রাইমারি স্কুল থেকে কমল নামের এক ব্যক্তির বিকৃত লাশ উদ্ধার হয়েছে।'
'বলেন কী! কমল মারা গেছে?' 'হ্যাঁ। ওরা বড্ড ভয়ংকর, ওরাই কমলকে মেরে ফেলেছে শিকদার রাজু লক্ষ করলেন, আনোয়ারের মুখ গম্ভীর।
পরের শুক্রবার একটি দৈনিক পত্রিকায় 'চিত্র-বিচিত্র' পাতায় 'ওরা ভয়ংকর' নামে একটি ফিচার ছাপা হলো। সেখানে জানোয়ারের কুয়াকাটার ঘটনাগুলোকে অনেক বাড়িয়ে, রসকস মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ছবি হিসেবে ইন্টারনেট থেকে নেয়া এক এলিয়েনের ছবি দেওয়া হয়েছে ফিচারে আনোয়ারের নাম-ঠিকানাও প্রকাশ
করা হয়েছে। পত্রিকাটা হাতে নিয়ে হতাশ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আনোয়ার। শিকদার রাজু কথা রাখেননি।
জনাব গল্প গুলো পড়ে যদি ভালো লাগে তাহলে মন্তব্য এবং শেয়ার করুন।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন