তাঁতীর চালাকি, গল্প
তাঁতীর চালাকি
এক তাঁতী আর ছিল তার বৌ। তাঁতী বৌ বাড়ী বসে বসে কাপড় বুনতো। তাঁতী সেগুলো মাথায় বয়ে হাটে যেত বেচতে। বৌ ছিল ভারী লোভী। তাঁতী বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেই তার আনন্দের সীমা থাকে না। ফাকি দিয়ে দিরাই মন্ডা তৈরী করে সে মনের আনন্দে খেতো। বেচারা কিছুই জানতে পারতোনা। এমনি করে দিন যায়। তারপর একদিন সে সব কিছু টের পেয়ে গেল। বৌকে ডেকে বললো- কাল আমি দূরের এক হাটে যাবো। ফিরতে অনেক রাত্রী হবে। খুব ভোরে উঠে আমাকে চারটে ভাত রেঁধে দিও। তাঁতী বৌ মনে মনে ভারী খুশি হলো। সত্যি সে খুব ভোরে উঠে ভাত দিল। তার স্বামী খেয়ে দেয়ে হাটের নাম করে বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেল। হাটে সে গেল সত্যি কিন্তু দূরের হাটে গেল না। কাছেই এক হাটে কাপড় গুলো রাতারাতি বিক্রি করে চুপি চুপি বাড়ী ফিরে এলো। বাড়া এসে ধরে ঢুকে তক্তপোষের নিচে লুকিয়ে রইল।
এদিকে তাঁতী বৌ বসেছে পিঠে ভাজতে। চাল কলা গুড়া সব একত্র করে নিয়ে এক একটা পিঠে তৈরী হয়। আর এমনি সে টুপ করে মুখে পুরে দেয়। এমনি করে সে সবগুলো পিঠেই সাবাড় করে ফেললো। বাঁকি রইলো মোটে খান কয়েক পিঠে। ব্যাপার দেখে তাঁতীতো অবাক। বেচারা তখন না পারে কইতে না পারে সইতে। বৌ এর মা ছিল এক বুড়ি, পাশের বাড়ীতে সে থাকতো। চারখানা পিঠে সে মাকে পাঠিয়ে দিল। পাঁচখানা গুনে গুনে লুকিয়ে রাখলো নিজে। পরে খাবে বলে। তারপর বেশী রইলো দু'খানা। সেই দু'খানা রেখে দিল তাঁতীর জন্য। তাঁতী কিছু তক্তপোষের তলায় থেকে সব কিছু দেখে রাখলো। তারপর মনে মনে এক ফন্দি আটলো। সন্ধ্যা হলে সন্ধ্যাবার্তী জ্বালাতে বৌ বাইরে গেল। আর সেই ফাঁকে তাঁতী বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে এসে উঠোন থেকেই বৌকে ডেকে বললো বড্ড খাটুনী খেটেছি আজ দূরের হাটে গিয়ে, শিঘ্রই যা হোক কিছু খেতে দাও আমাকে। ক্ষিধের জ্বালায় পিত্তি জ্বলে গেল। বৌ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো দু'খানা পিঠে নিয়ে। এসে বললো আ-হা-হা তা কি আর আমি জানিনে, এতো খাটুনি কি গায়ে সয়। এই নাও দু'খানা পিঠে খাও। ততক্ষণে আমি ভাত বেড়ে আনছি। তাঁতী দু'খানা পিঠে সামনে রেখে চোখ বুজে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর আঙ্গুলে গুণতে গুণতে বলতে লাগলো- স্যান স্যান কুঁড়িখানা চারেক খেলো বুড়ি। দেখছি পাজিপুথি ঘেটে ন খান গেছে তোমার পেটে। আর পাঁচখান আছে তোমার ঘরে। দু'খানা এনেছো আমার তরে। অর্থাৎ গণনা করে দেখলুম পিঠে মোট তৈরী হয়েছে বিশখানা । চারখানা খেয়েছে তাঁতী বৌয়ের মা। সেই বুড়ি। ন খান খেয়েছে বৌ নিজে। পাঁচ খানা রেখেছে লুকিয়ে আবার খাবে বলে। আর মাত্র দু'খানা এনেছে তাতীর জন্য।
স্বামীর মুখের ছড়া শুনে বৌতো অবাক, লজ্জায় সে মরে গেলে। মুখে কিছুই বললো না। পরের দিন বৌ পাড়াময় বলে বেড়াতে লাগলো তাঁতীর গোণাপড়ার কথা। দেখতে দেখতে দেশময় সে কথা জানাজানি হয়ে গেল। সবাই জানলো তাঁতী খুব ভালো গণনা শিখেছে। গুণে সব কিছু সে বলে দিত পারে। দিন এমনি করে কাটছে। হঠাৎ দেশের বাদশাহর ঘোড়া হারিয়ে গেল। নানান জায়গায় খুঁজেও তার কোন সন্ধান মিললো না। অবশেষে বাদশাহর লোকজন এসে হাজির হলো তাঁতীর বাড়ী। বললো আমাদের রাজার ঘোড়া হারিয়ে গেছে। আজকে তুমি পাজিপুথি দেখে রাখবে। তারপর কাল দরবারে গিয়ে ঘোড়ার খোঁজ দিয়ে আসবে। যদি সন্ধান দিতে না পারো তো বুঝতেই পারছো। গদানটি কাটা যাবে। আর যদি পারো তো সারাজীবন তোমার সুখেই কাটবে। বলেই তারা চলে গেল। তাঁতী এখন বৌয়ের উপর রেগে আগুন। বললো তোর জন্যই আমার এ বিপদ। পিঠে গণনা আর ঘোড়া গণনা কি এক হলো? আমি যে শুধু পিঠে গণনাই শিখেছি। ঘোড়ার গণনাতো শিখিনি। বৌ দেখলো সত্যিই তো পিঠের কথা না হয় গুণে বলতে পেরেছে। কিন্তু ঘোড়ার গণনা পারবে কি করে। তাঁতী আর তার বৌ দু'জনায় বসে ভাবতে লাগলো। ভেবে কোনই ফল হলোনা। অবশেষে সে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যাবে ঠিক করলো। শেষ রাতের অন্ধকারে তারা বেরিয়ে পড়লো।
রাতের অন্ধকার থাকতেই তাকে এদেশ ছেড়ে অন্যদেশে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। প্রাণপণে সে ছুটতে লাগলো। এ গা ছেড়ে আর এক গাঁয়। তারপর আরেক গাঁয় এমনি করে পাঁচ সাতটি গ্রাম পার হয়ে সামনে পড়লো এক বাগান বাড়ী। বাগান বাড়ীর পাশেই মাঠ, সে মাঠেই বাজার ঘোড়া দিব্যি ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। তাই না দেখে তাঁতীর আর পালিয়ে যেতে হলো না। সে ফিরে চললো রাজার বাড়ীর দিকে। রাজার বাড়ীতে যখন পৌছিলো তখন দরবার বসেছে। দরবারে ঢুকেই সে বলে উঠলো, এলেম বাদশা নামদারের ঠাঁই। সত্য যা জানি বলে যাই। বাড়ী থেকে পালিয়ে যেতে বাগবাড়ীর পুর্বের ক্ষেত্রে দেখে এলাম এক তেজী ঘোড়া, কপালে তার সাদা ডোড়া। যদি সে ঘোড়া পেতে চাও, তাড়াতাড়ি লোক পাঠাও।' তাতীর মুখে একথা শুনে বাদশাহর লোক লস্কর ছুটলো সেই ঘোড়ার সন্ধানে। গিয়ে দেখলো সত্যিই ঘোড়াটা সেখানে রয়েছে। আরামে মাঠের ঘাস খেয়ে দিব্যি এক গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। ঘোড়া নিয়ে এলো তারা বাদশাহর কাছে। আর তাঁতীকে ডেকে বাদশাহ বললেন, আজ থেকে আর তোমার যাওয়া পড়ার ভাবনা ভাবতে হবে না। তুমি আমার দরবারে হাজির থাকবে আর কোথাও চুরি হলে সন্ধান দিবে। বাদশাহর দেশে সবাই সুখ সাচ্ছন্দে আছে। কাজেই চুরি ডাকাতি কখনো হয় না। তাই তাঁতী আর তাঁতী বৌ- এর বাঁকি দিনগুলো বেশ সুখেই কাটাতে লাগলো।
--------------------সমাপ্ত, ---------------------------
জনাব,আপনার কাছে আর্টিক্যাল গুলো সামান্য ভালো লাগলে মন্তব্য এবং শেয়ার করে আমাকে উৎসাহিত করবেন। যাতে আমি আগামীতে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী আরো সুন্দর কিছু আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি।



কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন